ওয়াসার ভেঙে দেওয়া বাড়ি এখন বহুতল ভবন

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ১৭:০০, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:২৩, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০

ইব্রাহীমপুর খালের জন্য কেনা জমি দখল

রাজধানীর ইব্রাহীমপুর খাল খনন প্রকল্পের অধিগ্রহণকৃত জমি কিনে বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় মালয়েশিয়া প্রবাসী হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে। তার বাড়িটি ঢাকা ওয়াসার ইব্রাহীমপুর খালের ওপর রয়েছে। ওয়াসা বলছে, অধিগ্রহণকৃত ভূমি বিক্রির কোনও সুযোগ নেই। এ অবস্থায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে বাড়িটি একবার ভেঙেও দেওয়া হয়। কিন্তু কিছু দিন পর আবারও সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়। ফলে খালের পানি প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটছে। এতে এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।




জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৯৯১ সালের ২ নভেম্বর ইব্রাহীমপুর খাল খনন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৩.৬৯৮০ একর ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। পরের বছরের ১০ নভেম্বর অধিগ্রহণকৃত ভূমি ওয়াসার অনুকূলে দখল হস্তান্তর করা হয়। এ অবস্থায় অধিগ্রহণকৃত ভূমির অ্যালাইনমেন্ট আংশিক সংশোধন করার জন্য জনৈক হেলাল উদ্দিন আবেদন করলে তা ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। পরে কেন্দ্রীয় ভূমি বরাদ্দ কমিটিতে ১৯৯৩ সালের ২ নভেম্বর তা অনুমোদিত হয়।
২০০৮ সালের ৮ জুন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর তৎকালীন জেলা প্রশাসক কামাল উদ্দিনের পাঠানো এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসার অনুকূলে ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন ইব্রাহীমপুর মৌজায় ‘ইব্রাহীমপুর খাল খনন প্রকল্পের’ জন্য ভূমি অধিগ্রহণ প্রস্তাব যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রেরণ করা হলে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন কেন্দ্রীয় ভূমি বরাদ্দ কমিটির ১৯৯১ সালের ২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ৩৭তম সভায় ভূমি অধিগ্রহণ প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়। এরপর এসএ কেস নং ২৯/৯১-৯২ রুজু করে ১৯৮৯ সালের সম্পত্তি জরুরি অধিগ্রহণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারামতে অধিগ্রহণের সকল আনুষঙ্গিক কার্যক্রম গ্রহণ করে সরেজমিন পরিমাপ করে জমির দখল প্রত্যাশী সংস্থা ঢাকা ওয়াসার নিকট ১৯৯২ সালের ১০ নভেম্বর হস্তান্তর করা হয়।

ইব্রাহীমপুর খালের জন্য কেনা জমি দখল
কিন্তু সংশোধিত নকশা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পৌঁছার আগেই ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) কেসের চূড়ান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। আর এ কারণে সংশোধিত নকশা অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তাছাড়া প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সংশোধিত প্রস্তাবের বিষয়ে প্রত্যাশী সংস্থার পক্ষ থেকে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়নি। তাছাড়া জমি অধিগ্রহণের সকল আনুষ্ঠানিকতা চূড়ান্ত করে জমির দখল হস্তান্তর, ক্ষতিপূরণ প্রদান, খাল খননসহ সকল কার্যক্রম সমাপ্ত হওয়ায় আবেদনকারীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংশোধিত নকশা মোতাবেক নতুন করে অধিগ্রহণ কার্যক্রম গ্রহণের আর কোনও সুযোগ ছিল না বলেও জেলা প্রশাসক তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন।
জেলা প্রশাসকের অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দরখাস্তকারী নালিশি সম্পত্তি খরিদ করেন ২০০৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। তিনি অধিগ্রহণের প্রায় ১৪ বছর পর জমিটি খরিদ করেন, যা বিধিসম্মত নয়। অধিগৃহীত ভূমি খরিদ করার আইনগত কোনও সুযোগ নেই। সরকারি খাল হতে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের লক্ষ্যে গঠিত টাস্কফোর্স অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে খালের সীমানা পিলার স্থাপন করেছে, যা নালিশি সম্পত্তি ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) কেসের অ্যালাইনমেন্টের আওতাভুক্ত।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আবেদনকারী কেন্দ্রীয় ভূমি বরাদ্দ কমিটির ১৯৯৩ সালের ২ নভেম্বর অনুমোদিত সংশোধিত নকশা অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করায় মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে। আলোচ্য ভূমি দখল যথাযথভাবে প্রত্যাশী সংস্থা ঢাকা ওয়াসা বরাবর হস্তান্তর করা হয়েছে এবং প্রকল্পটির কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে। নালিশি সম্পত্তির মালিক এবং দখলদার ঢাকা ওয়াসা।
ওয়াসার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জমি অধিগ্রহণের পর কিছু কিছু জমির মালিক তাদের ক্ষতিপূরণের টাকা গ্রহণ করেছেন। এমনকি ইব্রাহীমপুর মৌজার সি এস ২৬৭ দাগের অন্যান্য মালিকগণের মধ্যে জনৈক হাবিবুল্লাহ ১৯৯৪ সালের ২ এপ্রিল অধিগ্রহণকৃত ০.৩৯০০ একর জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ ৮ লাখ ৯৬ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। এছাড়া দরখাস্তকারীর জমির আপস্ট্রিমের জমির মালিক তার ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করেছেন। তবে শুধু খালের অ্যালাইনমেন্টের মধ্যবর্তী অংশের দরখাস্তকারী জমির ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করেনি।

ইব্রাহীমপুর খালের জন্য কেনা জমি দখল

ওয়াসা বলছে, যেহেতু অধিগ্রহণ কার্যক্রম চূড়ান্ত করে অধিগ্রহণকৃত ভূমির ওপর খালটি পুনঃখনন ও উন্নয়ন করা হয়েছে সেহেতু বর্তমান আবেদনকারীর আবেদনে মোতাবেক ১৯৯৩ সালের সংশোধিত নকশা অনুযায়ী নতুনভাবে ইব্রাহীমপুর মৌজার সিএস ২৬৭ নং দাগের জমির অধিগ্রহণ কার্যক্রম গ্রহণ করার সুযোগ নেই।
সরেজমিন দেখা গেছে, ইব্রাহীমপুর খালের ওপর হেলাল উদ্দিনের বাড়ির পিলার রয়েছে। তার ওপরে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। আর বাড়ির নিচ দিয়েই খালের পানি এখনো বহমান রয়েছে। ধীরে ধীরে ইট পথর ফেলে খালটির বাকি অংশ ভরাট করার চেষ্টা করা চলছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন বর্ষার সময় বাড়িটির কারণে খালের প্রবাহ বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাড়ির মালিক হেলাল উদ্দিনের বড় ভাই বিল্লাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৯৯৩ সালের সংশোধিত অ্যালাইনমেন্ট আমরা বাস্তবায়নের দাবি করেছি। কিন্তু তখন ওয়াসার লোকজন নানা অভিযোগে আমার বাড়ি ভেঙে দেয়। খালের ওপর আমরা বাড়ি নির্মাণ করিনি। আমাদের বাড়ির ওপর খাল নির্মাণ করা হয়েছে। আমাদের কাছে কাগজপত্র রয়েছে।’
জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার পরিচালক (টেকনিক্যাল) এ কে এম শহিদ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যতদূর মনে পড়ে ওই বাড়িটিতে আমরা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে ভেঙে দিয়েছি। বাড়িটি অধিগ্রহণকৃত এলাকায় পড়েছে।’ তিনি আরও বলেন, এখন কেউ ওটা নিয়ে কোনও অভিযোগ করেনি। সে কারণে বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে তা সঠিকভাবে বলতে পারছি না। তবে খালের ওপর বাড়ি নির্মাণের কোনও সুযোগ নেই। অধিগ্রহণকৃত জমিও ক্রয় বিক্রয়ের সুযোগ নেই। খালের ওপর বাড়ি নির্মাণ করা হলে তা উচ্ছেদ করা হবে। আমি বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত খোঁজ খবর নিচ্ছি।

 

 
/এমআর/এমওএফ/

লাইভ

টপ
X