অ্যান্টিবডি টেস্ট এখন সময়ের দাবি

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১২:০০, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০৮, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০

করোনা টেস্টের জন্য উপচেপড়া ভিড়

দেশে যে হারে করোনার নমুনা পরীক্ষা দরকার, সে হারে হচ্ছে না। নমুনা পরীক্ষার জন্য খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে বারবার সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। তারপরও নমুনা পরীক্ষার হার বাড়ছে না। তবে শুধু নমুনা পরীক্ষা নয়, ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য এখনই অ্যান্টিবডি টেস্ট করা দরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নমুনা পরীক্ষা, মহামারির প্রকৃত চিত্র জানতে, এমনকি ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন কার্যক্রমের জন্যও এখনই অ্যান্টিবডি টেস্ট জরুরি হয়ে পড়েছে।

আর জাতীয় পরামর্শক কমিটি বলছে, এখন সেরো সার্ভিলেন্স নিয়ে কাজ করার সময় এসে গেছে, যার জন্য অ্যান্টিবডি টেস্ট চালু করা প্রয়োজন। তবে করোনার অ্যান্টিবডি টেস্টের অনুমোদন এই মুহূর্তে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

র‌্যাপিড টেস্টের যৌক্তিকতা তুলে ধরে এই টেস্ট কী ধরনের হতে পারে সে বিষয়ে গত ৭ জুন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠায় স্বাস্থ্য অধিদফতর। গত ৯ জুলাই এ বিষয়ে একটি খসড়া নীতিমালা করে সেটি মন্ত্রণালয়ে পাঠায় অধিদফতর। এর পরিপ্রেক্ষিতে তার ১০ দিন পর অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলীকে প্রধান করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কোভিড-১৯ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা সম্প্রসারণ নীতিমালা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটি করে। এরপর সেটি কমিটির মতামতের জন্য পাঠায় এবং তাদের মতামতের জন্য ১০ কার্যদিবস ঠিক করে দেয়।

বিশেষজ্ঞ কমিটি গত ৪ আগস্ট তাদের মতামত মন্ত্রণালয়ে পাঠায় এবং তারা এ বিষয়ক প্রেজেন্টেশন দেয় ১৮ আগস্ট। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে আরও সুবিন্যস্ত ও পরিমার্জিত করে দিতে বলা হলে সেটি গত ২৩ আগস্ট জমা দেওয়ার পর ৩১ আগস্ট মন্ত্রণালয় আবার স্বাস্থ্য অধিদফতরে পাঠায়। এদিকে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরও তাদের এই সংক্রান্ত কাজ শেষ করেছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর সে অনুযায়ী অ্যান্টিবডি-অ্যান্টিজেন কিট কেনার জন্য স্পেসিফিকেশন দেবে।

তবে অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয় থেকে ফেরত পাঠানো র‌্যাপিড টেস্টের নীতিমালা অধিদফতরেই রয়েছে। খুব শিগগিরই সেটা একটা ছকে ফেলে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি এত জরুরি অথচ খুব ধীর, শম্ভুক গতিতে চলছে। অথচ সব দেশ টেস্ট করে কত এগিয়ে যাচ্ছে।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভায় অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি টেস্ট নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বর্তমানে পিসিআর টেস্টের মাধ্যমে তুলনামূলক কম কোভিড-১৯ পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করে পরামর্শক কমিটি। তারা জানিয়েছে, নমুনা পরীক্ষার পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারলে আরও বেশি রোগী শনাক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য কমিটি অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি পরীক্ষার জন্য একাধিকবার পরামর্শ দিয়েছে। কমিটি মনে করছে, এখন সেরো সার্ভিল্যান্স নিয়ে কাজ করার সময় এসে গেছে, যার জন্য অ্যান্টিবডি টেস্ট চালু করাও প্রয়োজন।

এর আগে গত ৩ জুন কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি করোনা শনাক্তে র‌্যাপিড টেস্টের জন্য সুপারিশ করে। তারা আরটি পিসিআর (রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ পলিমারেজ রিঅ্যাকশন) পরীক্ষার সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করার পক্ষেও মত দিয়েছেন।

কোভিড-১৯ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা সম্প্রসারণ নীতিমালা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহামারির সময়ে ইনফেকশন কতজনের হয়েছে সেটা অ্যান্টিবডি টেস্ট ছাড়া বলা যায় না। তাই এ সময়ে অ্যান্টিবডি টেস্ট খুব জরুরি, নয়তো পরিসংখ্যান সঠিক হবে না। আসলে দেশে কতজন সংক্রমিত হয়েছে, আবার কতজনের শরীরে অ্যান্টিবডি গ্রো করেছে কিন্তু পোস্ট কোভিড সিন্ড্রোমে মারা গেছেন, সেটা জানার জন্য হলেও অ্যান্টিবডি টেস্ট দরকার।’ আবার ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্যও অ্যান্টিবডি টেস্ট শুরু করা দরকার বলে মত দেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বলেন, ‘ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য যাদের তালিকা করা হবে তাদের মধ্যেও অ্যান্টিবডি টেস্ট করা জরুরি হবে। কারণ, অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গেলে তাদের ভ্যাকসিন দেওয়া অর্থহীন। তবে অত্যন্ত দুর্ভাগ্য যে এখনও দেশে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা শুরু করা গেলো না। অথচ অ্যান্টিবডি পরীক্ষা ছাড়া ভ্যাকসিন নীতিমালা করা খুব কঠিন হয়ে যাবে।’

এখনই অ্যান্টিবডি টেস্ট দরকার মন্তব্য করে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘টেস্ট করে যদি কারও মধ্যে অ্যান্টিবডি পাওয়া যায় তাহলে তাকে আর এই ভ্যাকসিন দেওয়ার দরকার নেই। তাই এখনই এ সম্পর্কিত পলিসি এবং গাইডলাইন তৈরি করা দরকার। তাতে কারা প্রথমে ভ্যাকসিন পাবেন সেটা আইডেন্টিফাই করে নেওয়া দরকার এবং পরের ধাপ নির্ধারণ করতে হবে গাইডলাইনের মাধ্যমে।’

ভ্যাকসিন নীতিমালাতে অ্যান্টিবডি টেস্ট ম্যান্ডেটরি মন্তব্য করে ডা. এম আর খান শিশু হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. ফরহাদ মঞ্জুর বলেন, ‘যাদের শরীরে অ্যান্টিবডি নেই ভ্যাকসিন তাদের দরকার। যাদের শরীরে ইতোমধ্যেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গেছে তারা প্রতিমাসে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করিয়ে যখন শরীরে অ্যান্টিবডি থাকবে না তখন ভ্যাকসিন দেবে। কারণ চীনের সর্বশেষ এক জার্নালে জানা গেছে, কারও শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হলে সেটা চার মাস পর্যন্ত থাকে।’

অধ্যাপক ডা. ফরহাদ মঞ্জুর আরও বলেন, ‘অ্যান্টিবডি চেক করা ছাড়া গণহারে ভ্যাকসিন দিলে শতকরা ৬০ শতাংশের বেশি ভ্যাকসিনের অপচয় হবে বলে আমার ধারণা। অ্যান্টিবডি টেস্ট সব সময়ই জরুরি ছিল, আর ভ্যাকসিন দেওয়ার আগে এটা খুব বেশি জরুরি। আমরা ১৭ কোটি ভ্যাকসিন পাবো না, বড়জোর কয়েক লাখ ভ্যাকসিন পাবো। আমরা হুজুগে জাতি, ভ্যাকসিন আসছে শুনলেই সেটা পাওয়ার বিষয়ে একটা বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হবে। কারও শরীরে অ্যান্টিবডি থাকুক বা না থাকুক।’

/এমএএ/এমএমজে/

লাইভ

টপ
X