যেভাবে আপাতত দরজা খুললো পেঁয়াজ রফতানির

Send
রঞ্জন বসু, দিল্লি
প্রকাশিত : ১৮:১০, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪৮, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০

ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সদর দফতর ’উদ্যোগ ভবন’গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকালে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ ইমরান যখন দারুণ হাসি মুখে জানালেন, দুর্গাপূজার উপহার হিসেবে ইলিশের প্রথম চালান আটটি ট্রাকে করে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে, তখন তার ঘুণাক্ষরেও জানা ছিল না সে দিনই ভারত সরকারের হুকুমে তার দেশে পেঁয়াজ রফতানি অবিলম্বে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী তিন-চারদিন মাননীয় হাই কমিশনারের নাওয়া-খাওয়া প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে গিয়েছিল বললেও কিছুই বলা হয় না।

সেদিন থেকেই তিনি কথা বলতে শুরু করেন ভারত সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে, বিশেষত ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে। কোনও আগাম হুঁশিয়ারি না দিয়ে ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেওয়ায় তার দেশ যে প্রবল অসুবিধায় পড়েছে এবং ভারত সরকারও তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে, সেটাই তিনি মনে করিয়ে দেন তাদের।

বস্তুত ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিজিএফটি (ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড) বা বৈদেশিক বাণিজ্য বিভাগের ওই বিজ্ঞপ্তিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কম অবাক হয়নি। বিদেশে রফতানি বন্ধ করার আগে ডিজিএফটি তাদের সঙ্গে পরামর্শ দূরে থাক, এমন একটা সিদ্ধান্ত যে নেওয়া হচ্ছে সেটাও সাউথ ব্লককে (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) জানায়নি। পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা পর্যন্ত এ কারণে ঘনিষ্ঠ বৃত্তে তার অসন্তোষ গোপন করেননি।

তবে ডিজিএফটি এরপর অনানুষ্ঠানিকভাবে যে ব্যাখ্যা দেয় সেটা এরকম−তাদের ওপর নির্দেশ আছে দেশের প্রধান কয়েকটি পাইকারি বাজারে ও দশ-বারোটি মেট্রো শহরের খুচরা বাজারে পেঁয়াজের দাম একটা নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে রফতানি বন্ধ করতে হবে। তাদের মনিটরিং শাখা যখন পেঁয়াজের দামে সেই ঊর্ধ্বগতি রিপোর্ট করেছে, তখনই নিয়মমাফিক তারা সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে মাত্র। আর এটা আসলে একটা রুটিন পদক্ষেপ।

কিন্তু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বিশেষত ভারত-বাংলাদেশের মতো দুটো দেশের সম্পর্ক যে এই আমলাতান্ত্রিক নিগড়ে বাঁধা পড়তে পারে না, দিল্লিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই বোধোদয়টা তখনও হয়নি।ভারতীয় পেঁয়াজ

এদিকে পেঁয়াজ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা তোলার দাবিতে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) থেকেই শুরু হয়ে যায় মহারাষ্ট্রের পেঁয়াজ চাষিদের আন্দোলন। নাসিকের কাছে লাসালগাঁও মান্ডির সামনে তারা শুরু করে দেন অবস্থান বিক্ষোভ। রাজ্যের প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও এনসিপি দলের নেতা শারদ পাওয়ার কৃষকদের দাবিকে সমর্থন জানান। তিনি বলেন 'পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়ে আমরা পাকিস্তানের সুবিধা করে দিচ্ছি না তো?'

সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য ঢাকার দিক থেকেও প্রয়োগ করা হতে থাকে কূটনৈতিক চাপ। দিল্লিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের কূটনৈতিক তৎপরতা তো প্রথম থেকেই চলছিল। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসে একটি ‘কূটনৈতিক নোট’ পাঠিয়ে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়। মুখ খোলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে মোমেন ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমও।

এই সম্মিলিত চাপের মুখে ভারতকে যে একটা কিছু করতেই হবে, অন্তত বাংলাদেশের জন্য কিছু একটা ছাড় দিতে হবে, সেটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। এই পটভূমিতে রফতানি নিয়ে জট খুলতেই শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দিল্লির উদ্যোগ ভবনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সদর দফতরে ডিজিএফটি-র শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনীতিকরা।দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ ইমরান  ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর

শুক্রবার দিনভর সেই বৈঠকে আলোচনা হয় ভারতের 'ফেস সেভিং' বা কূটনৈতিক মুখরক্ষা এখন কীভাবে হতে পারে, মূলত সেটা নিয়েই। তিন-চারদিনের মাথায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়াটা সম্ভব নয়, এটা বোঝাই যাচ্ছিল। নেপাল-শ্রীলঙ্কাকে বাইরে রেখে শুধু বাংলাদেশের জন্য কোনও আলাদা ব্যবস্থা করাও ছিল অসুবিধাজনক। এই পরিস্থিতিতে পরিত্রাণের পথ দেখায় বৈদেশিক বাণিজের ক্ষেত্রে ভারতের 'হ্যান্ডবুক অব প্রসিডিওরস' (পদ্ধতি-সংক্রান্ত পুস্তিকা)।

ওই হ্যান্ডবুকের অনুচ্ছেদ ৯.১২ (বি)-তে লেখা আছে, 'যদি বৈদেশিক বাণিজ্য সংক্রান্ত নীতিমালা রফতানিকারকদের প্রতিকূলে সংশোধন করা হয়, তাহলে ওই তারিখের ভেতর যেসব চালান ইতোমধ্যেই শুল্ক বিভাগের কাছে পরিদর্শনের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে তার ওপর সেই সংশোধিত নীতিমালা প্রযোজ্য হবে না।'

সোজা কথায় বললে, হিলি বা বেনাপোল বন্দরে পেঁয়াজের যেসব ট্রাক ১৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই কাস্টমসের ইন্সপেকশনের জন্য দেওয়া হয়েছে, সেগুলো এই নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় পাবে। ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব ইনডাইরেক্ট ট্যাক্স ও কাস্টমস (সিবিআইসি) ১৫ সেপ্টেম্বর ডিজিএফটি-কে যে রিপোর্ট পাঠিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে এরকম বেশ কিছু পেঁয়াজবাহী ট্রাক তাদের পর্যবেক্ষণের আওতায় আছে। যদিও সেই সব চালানের মোট পরিমাণটা এখনও স্পষ্ট নয়।

যাই হোক, বৈঠকের পর শুক্রবার বিকাল ৫টা নাগাদ ভারতের সহকারী ডিজিএফটি (রফতানি) নীতিশ সুরি সংশ্লিষ্ট সব মহলে তার সহকর্মী গগনদীপ সিং-কে একটি ইমেইল পাঠিয়ে এই বিষয়টি 'ক্ল্যারিফাই' করে দেন (নীতিশ সুরি-র ওই ইমেইলটির একটি প্রতিলিপি বাংলা ট্রিবিউনের হাতেও এসেছে)। হ্যান্ডবুকের ৯.১২ (বি) অনুচ্ছেদ হুবহু উদ্ধৃত করে তিনি ওই ইমেইলে যা লেখেন, তার অর্থ দাঁড়ায় আপাতত বেশ কিছু পেঁয়াজের চালান ভারত থেকে বাংলাদেশে যেতে পারবে।

শুক্রবার বেশি রাতে দিল্লিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি উচ্চপদস্থ সূত্র এই প্রতিবেদককে বলেন, 'নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ক্ষেত্রে যে ক্ল্যারিফিকেশন বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে সেটা অত্যন্ত টেকনিক্যাল, কোনও সন্দেহ নেই। তারপরেও আমরা যেটা বুঝতে পারছি, রফতানির জন্য যে পেঁয়াজগুলো পাইপলাইনে আছে সেটা অন্তত বাংলাদেশে যেতে পারবে।'

ফলে এখনকার মতো দিল্লিতে সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ ইমরান, পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমায় হাঁফ ছেড়েছে বাংলাদেশের আমজনতাও।

তবে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নিতে ভারত সরকারের আরও উঁচু পর্যায়ে বৈঠকের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আভাস মিলেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের মধ্যেও অচিরেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে এবং গত বছরের মতো বেশ কয়েক মাস নয়, এই নিষেধাজ্ঞা সম্ভবত কয়েক দিন বা বড়জোর কয়েক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হবে না।    

আরও পড়ুন- 

ভারতে আটকে পড়া পেঁয়াজ আসা শুরু

নষ্টের আশঙ্কায় আগের এলসির পেঁয়াজে ছাড় দিলো ভারত

পেঁয়াজ আসার খবরেই দাম কমলো কেজিতে ১০-১৫ টাকা

এক রাতের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ-তিনগুণ হয় কী করে? 

পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুতপ্ত: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

/এফএস/এমএমজে/

লাইভ

টপ
X