এক রাতের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ-তিনগুণ হয় কী করে?

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৩:০০, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫০, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২০

পেঁযাজভারত সরকার পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করেছে-কি করেনি, তখনও বিষয়টি জানে না সরকার। এটি সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাতের ঘটনা। অথচ রাজধানীর পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে মহল্লার খুচরা দোকানদার পর্যন্ত এই সময়টুকুর মধ্যে কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৪০ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি শুরু করে দিয়েছে। যে যেভাবে পেরেছে সেভাবেই দাম বাড়িয়ে বিক্রি করেছে। এক রাতের ব্যবধানে পরের দিন মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দেশের বাজারে ৪০ টাকা কেজি দরের দেশি পেঁয়াজের দাম আরও বাড়িয়ে কেউ ১০০ আবার কেউ তা ১১০ টাকা দরেও বিক্রি করেছে। এভাবেই চলছে এই দুই দিন। অথচ সরকার বলেছে, দেশে পেঁয়াজের কোনও সংকটও নেই। সরবরাহেও কোনও সমস্যা হয়নি। বাড়তি চাহিদাও সৃষ্টি হয়নি। এরপরও কোনোরকমের একটি ঘোষণা শুনেই দেশের হাজার হাজার অসাধু ব্যবসায়ী এ পণ্যটির দাম বাড়িয়ে দেশের বাজারকে অস্থির করে তুলেছে, মানুষের সাধারণ জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে, সরকারকে পুরো মাত্রায় বিব্রত করেছে।

জানা গেছে, সোমবার সন্ধ্যায় ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। অভ্যন্তরীণ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে ভারত। এই সুযোগটিই গ্রহণ করে দেশের অসাধু ব্যবসায়ীরা। তবে আগামী এক মাসের মধ্যে দেশের পেঁয়াজের বাজার স্বাভাবিক হবে বলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেছেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ মজুত রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিও হচ্ছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করা হচ্ছে।

এতকিছুর পরেও মনে স্বস্তি আসেনি দেশবাসীর। তাদের উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠা, গত বছর একই পরিস্থিতিতে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৩০০ টাকায় কিনতে হয়েছে। এ বছর কত হবে সেই শঙ্কা কাজ করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানীতে বসবাসকারী বেসরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ হাসান আলী বলেন, ‘সরকারের লাগাম ছাড়া নীতির কারণে এগুলো হচ্ছে। পেঁয়াজ নিয়ে গতবছরের রেশ না পার হতেই এ বছরও একই অভিযোগ, একই পদ্ধতিতে দাম বৃদ্ধি এবং একই ব্যাখ্যা। একই অস্থিরতা। আমার তো মনে হয় এগুলো পুরোটাই পূর্বপরিকল্পিত। তা না হলে এক রাতের ব্যবধানে এভাবে দাম বাড়ে কীভাবে?’

জানতে চাইলে মাতুয়াইলের আমান সিটি এলাকার দোতলা মসজিদের ইমাম মাওলানা সরওয়ার হোসেন বলেন, ‘এটি মানুষের ওপর এক ধরনের জুলুম। যা কোনও ধর্মই সমর্থন করে না। কোনও কারণ ছাড়াই এক রাতের ব্যবধানে ৪০ টাকার পেঁয়াজ হয়ে গেলো ১২০ টাকা। এ ধরনের ব্যবসা রসুল (স.) করতে বলেননি। এটি অন্যায়। এটি মানুষের প্রতি অবিচার।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২৫ লাখ মেট্রিক টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের পরিমাণ ২৫ লাখ ৫৭ হাজার টন। যেহেতু পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য, তাই প্রতিবছরই উৎপাদিত পেঁয়াজের ২৫ শতাংশ পচে যায়। পচে যাওয়া পেঁয়াজ বাদে রয়ে গেছে ১৯ লাখ ১১ হাজার মেট্রিক টন। এখানেই তৈরি হয় ঘাটতি। আর এই ঘাটতির পরিমাণ ছয় লাখ টন। চাহিদার বিপরীতে এই ছয় লাখ টন পেঁয়াজের ঘাটতি মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রতিবছর আমদানিও হয় আট থেকে ১০ লাখ টন। যা চাহিদা বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত। আমদানি নির্ভর এই ছয় লাখ টন পেঁয়াজ দেশে উৎপাদিত ১৯ লাখ টন পেঁয়াজেকে প্রভাবিত করে। আমদানিতে সামান্য কোনও ত্রুটি দেখা দিলেই ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেয়। এরা সারাবছরই এর অপেক্ষায় থাকে ‘কখন সমস্যা হবে’ এই আশায়। আর এতেই অস্থির হয়ে ওঠে দেশের পেঁয়াজের বাজার।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ২৫ শতাংশ বাদ দিয়ে পেঁয়াজের উৎপাদন ১৭ থেকে ১৮ লাখ মেট্রিক টনে স্থিতিশীল থাকলেও এ বছর পেঁয়াজের উৎপাদন অতীতের রেকর্ড ভেঙেছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন হয় সাত লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন। ১০ বছরের ব্যবধানে উৎপাদন বেড়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৩৮ হাজার টনে। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে ২৫ লাখ ৫৭ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরের উৎপাদন হয়েছে ২৫ লাখ ৫৭ হাজার মেট্রিক টন, যা থেকে পচে যাওয়ার কারণে ২৫ শতাংশ বাদ দিয়ে ১৯ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়েছে। এ হিসাবে ১০ বছরের ব্যবধানে উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে ১৩৬ শতাংশ বা ২ দশমিক ৩৬ গুণ। এ সময়ে হেক্টরপ্রতি ফলন ছয় দশমিক ৮১ টন থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৭৬ টন হয়েছে। কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। ফলে চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পেঁয়াজের আমদানি।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে ৯ লাখ ৫৩ হাজার টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমদানি করা হয়েছে ১০ লাখ ৯১ হাজার মেট্রিক টন। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমদানি করা হয়েছে চার লাখ ৫৯ হাজার মেট্রিক টন। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জুলাইতে আমদানি হয়েছে এক লাখ তিন হাজার ৬০৯ মেট্রিক টন এবং আগস্টে আমদানি হয়েছে ৮০ হাজার ৯৫৩ মেট্রিক টন।

এদিকে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘দেশে বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ মজুত রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হচ্ছে। ভারত থেকে এলসি’র মাধ্যমে কেনা পেঁয়াজ যেগুলো সীমান্ত পার হওয়ার অপেক্ষায় আছে, সেগুলো দু’একদিনের মধ্যে বাংলাদেশে চলে আসবে। মিয়ানমার, তুরস্ক ও মিসর থেকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিরি) মাধ্যমে পেঁয়াজ আমদানি করা হচ্ছে। অল্পদিনের মধ্যে এগুলো দেশে পৌঁছাবে। টিসিবি এবার বড় ধরনের পেঁয়াজের মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। যা আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে কেনা হয়েছে। এত কিছুর পরেও পেঁয়াজের দাম বাড়ার কোনও কারণ নেই। ক্রেতাদেরও অস্থির হওয়ারও কারণ নেই। এটি মূলত অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি। এক মাসের মধ্যে পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক হবে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শ্যামবাজারের আড়তদার হাজী মাজেদ বলেন, ‘এসব কারসাজির সঙ্গে আমরা জড়িত নই। আমরা কমিশনে বিক্রি করি। বিক্রি করলে কমিশন পাই, না করলে পাই না। এগুলো আমদানিকারকদের কারসাজি। তারাই দাম বাড়িয়ে পেঁয়াজ বিক্রির রেট নির্ধারণ করে, এ কারণেই আড়তে দাম বাড়ে। যা পাড়া মহল্লার দোকান পর্যন্ত গড়ায়।’

এদিকে সরকার পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে ইতোমধ্যেই বাজার মনিটরিং জোরদার করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, দেশের আট বিভাগীয় কমিশনার, দেশের ৬৪ জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। পেঁয়াজের উৎপাদন, মজুত, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য ফরিদপুর, পাবনা, রাজবাড়ী ও নাটোর এই তিন জেলার জেলা প্রশাসকের কাছে বাণিজ্য সচিব ডিও লেটার দিয়েছেন। পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানিকারকদের এলসি খোলাসহ সার্বিক সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি করা পেঁয়াজের ওপর থেকে পাঁচ শতাংশ আমদানি শুল্ক আপাতত প্রত্যাহারের জন্য এনবিআর চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পেঁয়াজের উৎপাদন, মজুত ও মূল্য পরিস্থিতি সংক্রান্ত তথ্য জোগাড় করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তিন জন যুগ্ম-সচিবকে পাবনা, নাটোর, রাজবাড়ী ও ফরিদপুরে পাঠানো হয়েছে।

/এফএস/এমএমজে/

লাইভ

টপ