‘মোদি সরকার মুখে এক, কাজে আরেক’

Send
রঞ্জন বসু, দিল্লি প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২১:৫৪, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:০৪, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০

ভারতীয় পেঁয়াজভারত সরকার সম্প্রতি বিদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা কৃষি খাতে মোদি সরকারের সংস্কার নীতির পুরোপুরি বিরুদ্ধে এবং ওই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মত প্রকাশ করেছেন দেশের দুজন অত্যন্ত সিনিয়র গবেষক, যারা উভয়েই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সচিব ছিলেন। ভারতের সাবেক কৃষি সচিব সিরাজ হুসেইন ও সাবেক গ্রামোন্নয়ন সচিব যুগল মহাপাত্র তাদের এই যৌথ প্রতিবেদনে পরিষ্কার বলেছেন, ‘১৫ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্টে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিল পাস করানোর সময় সরকার যে কৃষি খাতকে শৃঙ্খলমুক্ত করার কথা বলেছে, ঠিক তার আগের দিনই পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে তারা বাস্তবে ঠিক উল্টো কাজ করেছে।’
সিরাজ হুসেইন ও যুগল মহাপাত্র দুজনেই ভারত সরকারের শীর্ষ স্তরের আমলা ছিলেন, কৃষি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে তাদের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। এই মুহূর্তে তারা দেশের নামি অর্থনৈতিক থিংকট্যাংক ইকরিয়েরের সঙ্গে যুক্ত। তাদের সমালোচনা দিল্লিতে সরকারকে যথেষ্ট অস্বস্তিতে ফেলেছে।
এই প্রতিবেদনে তারা বলেছেন, করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেই গত জুন মাসে ভারত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য অর্ডিন্যান্স পাস করে, যাতে বলা হয়েছিল খুব অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ছাড়া (যেমন যুদ্ধ, খরা, সাংঘাতিক চড়া মূল্যবৃদ্ধি কিংবা বিরাট প্রাকৃতিক বিপর্যয়) সরকার বিভিন্ন কৃষিপণ্যের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে যাবে না। এসব কৃষিপণ্যেরই অন্যতম পেঁয়াজ। আর স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সরকারের নীতি হবে এই ধরনের ক্ষেত্রে ‘হস্তক্ষেপ না করা’।
এই গুরুত্বপূর্ণ অর্ডিন্যান্সটি পার্লামেন্টে বিল হিসেবে অনুমোদিত হয়ে ভারতের আইনে পরিণত হয় ১৫ সেপ্টেম্বর। কাকতালীয়ভাবে ঠিক তার আগের দিনই ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজিএফটির হুকুমে বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি রাতারাতি বন্ধ হয়ে যায়। যে সিদ্ধান্তের ধাক্কায় এরইমধ্যে সীমান্তে শত শত ট্রাকভর্তি পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে এবং দুদেশেই ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

সিরাজ হুসেইন
রিপোর্টের অন্যতম প্রণেতা সিরাজ হুসেইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন, ‘এটা ঠিকই যে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজধানী দিল্লির খুচরো বাজারে পেঁয়াজের কেজি ২৫ রুপি থেকে বেড়ে ৪১ রুপি হয়েছিল, অর্থাৎ প্রায় ৬৪ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু আমাদের গবেষণা বলছে, যেদিন রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয় (১৪ সেপ্টেম্বর), সেদিন দিল্লির বাজারে পেঁয়াজের যা দাম ছিল, তা তার আগেকার বারো মাসের গড় দামের তুলনায় অনেকটাই কম!’
‘ফলে সরকারের নতুন অর্ডিন্যান্স বা আইন অনুসারেই তখন বিদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার কোনও যুক্তিই থাকতে পারে না’, বলছিলেন তিনি।

ভারতে পেঁয়াজের প্রধান পাইকারি বাজার হলো মহারাষ্ট্রে নাসিকের কাছে লাসালগাঁওতে। নিষেধাজ্ঞা জারির দিন সেখানে পেঁয়াজের পাইকারি দর ছিল কেজিতে ১৮.৬৭ রুপি। অথচ এর আগের বারো মাসে (সেপ্টেম্বর ২০১৯ থেকে আগস্ট ২০২০) নাসিকের পাইকারি বাজারে রাজ্যের পেঁয়াজ চাষিরা গড় দাম পেয়েছেন কেজিপ্রতি ২১.০৫ রুপি।
সরকারি অর্ডিন্যান্স (এখন বিল) অনুসারে, কোনও কৃষিপণ্যর দাম পূর্ববর্তী বারো মাসের চেয়ে অন্তত ৫০ শতাংশ বাড়লে তখনই সরকারের হস্তক্ষেপের প্রশ্ন আসবে। কিন্তু এখানে সেটা না হওয়া সত্ত্বেও (উল্টে দাম কমেছে) পেঁয়াজ রফতানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
‘এ কারণেই আমরা লক্ষ করেছি সরকার এই পদক্ষেপ নেওয়ার সময় নিজেদেরই জারি করা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য অর্ডিন্যান্স প্রয়োগ করেনি; বরং তিন দশকের পুরনো, ১৯৯২ সালের বৈদেশিক বাণিজ্য আইনটি কাজে লাগিয়েছে’, এই প্রতিবেদককে বলছিলেন রিপোর্টের সহ-প্রণেতা যুগল মহাপাত্র।

যুগল মহাপাত্র
ভারত সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে কাজ করে আসা এই দুজন অভিজ্ঞ সাবেক কর্মকর্তা তাই মনে করছেন, পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার সিদ্ধান্তে সরকারের ‘স্ববিরোধিতা আর বিভ্রান্তির ছাপ তাই একেবারে স্পষ্ট’।
মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজ চাষিদের লাগাতার আন্দোলনের জেরে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করার জন্য সরকারের ওপর চাপ রয়েছে আগে থেকেই, এখন সিরাজ হুসেইন ও যুগল মহাপাত্রর রিপোর্ট সেটাকেই আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

/এমআর/এমওএফ/

লাইভ

টপ
X