টিকিটের সঙ্গে করোনার রিপোর্ট নিয়েও সংশয়

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১১:০০, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৫, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০

করোনা টেস্টের রিপোর্ট নিতে প্রবাসীরা‘টিকিট পাওয়ার সঙ্গে টেনশন হচ্ছে করোনার রিপোর্ট নিয়েও। কোথা থেকে কী হয়ে যায়, কোন বিষয়ে আটকে যাই। এই চিন্তায় খাওয়া-ঘুম সব গেছে। ওখানে না পৌঁছানো পর্যন্ত টেনশন থেকে মুক্তি পাবো না।’ এসব কথা বলছিলেন করোনার টেস্ট করতে আসা সৌদি প্রবাসীরা। তবে কেবল তারাই নন, অন্যান্য দেশ থেকেও যারা এসেছিলেন তারাও একইরকম কথা বলছেন। রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) মহাখালীতে অবস্থিত ডিএনসিসি আইসোলেশন সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটের সামনে ও ভেতরে মানুষের জটলা। কেউ এসেছেন করোনা পরীক্ষা করাতে, কেউ রিপোর্ট নিতে, কেউবা আবার এসেছেন পুরো প্রক্রিয়া জানার জন্য।

প্রবাসীরা বলছেন, ‘টিকিট কখন পাওয়া যাবে তার নিশ্চয়তা নেই। আবার টিকিট পাওয়ার পর করোনার নমুনা পরীক্ষা করাতে হবে। পরীক্ষার পর রিপোর্ট পাওয়ায় আবার ৪৮ ঘণ্টার বাধ্যবাধকতা।’ সবকিছু মিলিয়ে একটা ধোঁয়াশা আর সংশয়ে দিন কাটছে তাদের।

করোনাকালে সৌদি আরব থেকে ছুটিতে দেশে এসে আটকা পড়েছেন প্রায় ২৮ হাজার কর্মী। এছাড়া দেশে করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার অনেক আগে এসেও আটকা পড়েছেন অনেকেই। তবে সেই সংখ্যা জানা যায়নি। ছুটিতে আসা এসব প্রবাসী কর্মীর অনেকেরই রিটার্ন টিকিট কাটা ছিল। কিন্তু চাহিদার তুলনায় ফ্লাইট কম থাকায় টিকিট নিয়ে শুরু হয়েছে সংকট। ইকামা ও ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সৌদি সরকারের বর্ধিত সর্বশেষ সময়সীমা ৩০ সেপ্টেম্বর। এই সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে না গেলে কাজ হারাবেন অনেক প্রবাসী। তবে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে সেই সময়সীমা আরও ২৪ দিন বাড়িয়েছে সৌদি সরকার। কিন্তু টিকিটের অনিশ্চয়তায় উৎকণ্ঠায় দিন পার করেছেন প্রবাসীরা। আর এর সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট।

প্রসঙ্গত, সৌদি আরবের নিয়ম অনুসারে, করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে করোনা পরীক্ষার নমুনা জমা দেওয়ার ৪৯ ঘণ্টার মধ্যে আগ্রহীদের সৌদি আরবে পৌঁছাতে হবে। রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি করোনা নমুনা সংগ্রহ কেন্দ্রেই সৌদি আরবগামীদের পরীক্ষা করতে হবে। মহাখালীর আন্তঃজেলা বাসস্ট্যান্ডের কাছে ডিএনসিসি মার্কেটে এই নমুনা সংগ্রহ বুথ সকাল ৯টা থেকে খোলা থাকে। করোনা পরীক্ষার জন্য এক হাজার ৫০০ টাকা দিতে হবে একজন প্রবাসীকে। ৪৮ ঘণ্টার সময় গণনা শুরু হবে নমুনা সংগ্রহের সময় থেকে।

তবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শনিবার জানিয়েছেন, সৌদি যেতে টিকিটের কোনও সমস্যা হবে না। সবাই যেতে পারবেন সফর মাস শেষ হওয়ার আগেই। নিজের টিকিটটা আগে সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সবাই একসঙ্গে টিকিট কাটার চেষ্টা করছেন বলে ভিড় হচ্ছে বা মনে হচ্ছে টিকিটের সংকট হচ্ছে, যা সত্য নয়। প্রয়োজনে ফ্লাইট সংখ্যাও বাড়ানো হবে। অযথা হইচই বা তাড়াহুড়োর কোনও প্রয়োজন নেই।

এদিকে টিকিটের খোঁজে গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ করছেন প্রবাসীরা। শনিবারও অষ্টম দিনের মতো কাওরান বাজারে সৌদি এয়ারলাইন্সের অফিসের সামনে ভিড় জমান প্রবাসীরা। এর আগে শুক্রবার রাতে ফ্লাইটের তিন ঘণ্টা আগে করোনা সনদ পেয়ে দেশ ছেড়েছেন ৩০২ জন প্রবাসী। তার আগে সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ২৫২ জন প্রবাসী সৌদি আরব যান।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আব্দুল বাতেন সৌদি আরবে থাকেন ১৮ বছর ধরে। গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে এসেছেন ছয় মাসের ছুটিতে। কিন্তু তিনি সেদেশে ফিরে যেতে পারেননি করোনা পরিস্থিতির কারণে। তবে অনেক ঝক্কির পর টিকিট পেয়েছেন তিনি। প্রবাসীদের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্ধারিত ডিএনসিসি মার্কেটে স্থাপিত করোনার নমুনা পরীক্ষা করাতে এসে আটকে গেছেন, ভুলে টিকিট আনেননি সঙ্গে করে। অথচ আগামীকাল রাত ১২টা ৩০-এ তার ফ্লাইট।

তবে তাকে আশ্বাস দিয়ে কর্তৃপক্ষ বলেছে, টিকিটের কপি যদি তাদের দেখানো যায় তাহলে আজই তার পরীক্ষা করানো হবে। এখন তিনি ইমোতে টিকিটের কপি পাঠানোর জন্য বলেছেন স্ত্রীকে, কপি পাঠানোর পর সেটা দেখিয়ে তিনি করোনার পরীক্ষা করাবেন। আব্দুল বাতেন বলেন, ‘সব নিয়ে এসেছি, কিন্তু টিকিট আনতে ভুলে গেছি। এত ঝামেলার পর সব মনেও থাকে না। কী যে আছে কপালে! সবকিছু ঠিকমতো হবে কিনা, সংশয় নিয়ে সময় কাটছে।’

আব্দুল বাতেনের সঙ্গে যখন কথা হয় তখন পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন মাদারীপুরের হেকমত উল্লাহ। মার্কেটের সামনে বসে আছেন তিনি। কেন বসে আছেন প্রশ্নে জানান, তার ভাতিজা রহমত সৌদি প্রবাসী। সে ভেতরে গেছে করোনার পরীক্ষার জন্য। হেকমত উল্লাহ বলেন, ‘পোলাডা সৌদি যাইতে পারবো, কী পারবো না­–গত সপ্তাহ থেকে এই দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম হইছে। এখন পরীক্ষা করতে গেছে, সেইটা কী আসে…। এক করোনাতে সব আউলায়ে দিছে।’

নমুনা দিতে আসা প্রবাসীরা বলছেন, ৪৮ ঘণ্টার বদলে যদি আরেকটু সময় বাড়িয়ে দেওয়া যেতো তাহলে সংশয় এবং ভোগান্তি দুটোই কমতো।

প্রবাসীদের কয়েকজনআইসোলেশন সেন্টারের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জোবায়দুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ২০ জুলাই থেকে এখানে করোনা টেস্ট করা শুরু হওয়ার পর নিয়মিতভাবে ৭০০ থেকে ৯০০, সর্বোচ্চ এক হাজার নমুনা পেয়েছি। কিন্তু এরপর সরকার যখন বিশেষ উদ্যোগ নিলো সৌদি আরবের ফ্লাইট এবং টিকিটের বিষয়ে, তখন যাত্রীর সংখ্যা বেড়ে গেলো। গত তিন দিন ধরে এখানে এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার যাত্রী পাচ্ছি প্রতিদিন।’

তিনি বলেন, ‘এয়ারলাইন্সগুলোর রিকোয়ারমেন্ট হলো, যাত্রীরা ৭২ ঘণ্টা আগে টেস্ট করে আসবে। আমরাও ৭২ ঘণ্টার আগে নমুনা সংগ্রহ করে ২৪ ঘণ্টার ভেতরে ফলাফল দিয়ে দিচ্ছিলাম। যাতে করে যাত্রীর হাতে দুই দিন অথবা একদিন করে সময় থাকে ব্যক্তিগত প্রস্তুতির জন্য। কিন্তু এখন এমন হচ্ছে যে, তারা আজ সকালে টিকিট পাওয়ার পর আমাদের এখানে ছুটে আসছে টেস্ট করতে, কারণ আজ তার সন্ধ্যায় ফ্লাইট।’ এই মানুষগুলোর জন্য দুটো এক্সপ্রেস কাউন্টার করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে ১৭টি বুথ রয়েছে বর্তমানে। আরও তিনটি বুথ রয়েছে, যেগুলো সেট করা হয়নি। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে সেগুলোও সেট করা হবে। একইসঙ্গে সৌদি আরবসহ শর্ট নোটিসে যারা যাচ্ছেন, আলাদা করে তাদের স্যাম্পল নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে ল্যাবে পাঠানো হচ্ছে, রিপোর্ট‍ রেডি করা হচ্ছে। তাদের জন্য দুটো এক্সপ্রেস কাউন্টার করা হয়েছে। আমরা প্রায়োরিটি সেভাবেই সেট করছি যাতে করে এনোমনি হওয়ার কোনও সুযোগ নেই।’

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জোবায়দুর রহমান বলেন, ‘এখানে মিলিটারি পারসন এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের সবাই রাত্রি পর্যন্ত কাজ করছেন এবং সারারাত ধরে ল্যাব চালু রয়েছে। রিপোর্ট তৈরি, আপলোড–এই কাজগুলো করা হচ্ছে। শেষ দুই দিন এমন একজনও নেই যিনি যেতে পারেননি বা সমস্যা কিংবা অসুবিধা তৈরি হয়েছে। সময় স্বল্পতার জন্য অনেকের সমস্যা হচ্ছে। সেটা তার টিকিট পেতে দেরি হয়েছে বলে, কিন্তু আমরা সেই স্বল্প সময়ের ভেতরেই তার পরীক্ষা করে রিপোর্ট দিয়েছি।’

/এমএএ/এমএমজে/

লাইভ

টপ