গত ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরে কয়েকবার হাম-রুবেলা কর্মসূচি স্থগিত করা হয় করোনা মহামারির কারণে। কিন্তু সরকার ১২ ডিসেম্বর দেশজুড়ে আবার হাম-রুবেলা কর্মসূচির ঘোষণা দিলেও তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। দাবি আদায়ের লক্ষে এখন পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন স্বাস্থ্য সহকারীরা। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের চিন্তা, টিকা আদৌ খাওয়ানো হবে কিনা।
প্রসঙ্গত, বেতন বৈষম্য নিরসনসহ নিয়োগবিধি সংশোধন, পদোন্নতিসহ বিভিন্ন দাবিতে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বিভাগীয় মাঠ কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্টেন্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ হেলথ বিভাগীয় পরিদর্শক সমিতির ডাকে গত ২৬ নভেম্বর থেকে ২৬ হাজার কর্মী অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি পালন করছেন।
তাদের কর্মবিরতির কারণে গত ৫ ডিসেম্বর থেকে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এবারও তাদের একটি অংশ অস্বীকৃতি জানিয়েছে টিকাদানে। এতে সমস্যা হতে পারে বলে মন্তব্য করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা।
এদিকে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা করে (৯ ডিসেম্বর) বলেন, “অতীতে বেশ কয়েকবার দেশব্যাপী হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন পরিচালিত হওয়া সত্ত্বেও বিগত কয়েক বছরে দেশে হাম ও রুবেলা রোগের প্রকোপ ও আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। এই পরিস্থিতি উত্তোরণকল্পে এবং ২০২৩ সাল নাগাদ দেশ থেকে হাম-রুবেলা দূরীকরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে ১২ ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের ২৪ জানুয়ারি সারাদেশে হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন-২০২০ পরিচালনা করা হবে।”
এই ক্যাম্পেইনের আওতায় দেশজুড়ে ৯ মাস থেকে ১০ বছরের নিচের প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। সারাদেশের কয়েক জায়গায় কথা বলে জানা গেছে, এই টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে শঙ্কা ও সংশয় রয়েছে। যেমনটা দেখা গেছে মাগুরাতে। সেখানে ১০৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী কর্মবিরতিতে থাকায় এ কর্মসূচির সফলতা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
মাগুরার স্বাস্থ্য সহকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন দাবিতে তারা গত ২৬ নভেম্বর থেকে কর্মবিরতি পালন করছেন আর দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা কাজে ফিরে যাবেন না।
মাগুরা জেলা হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সোহেল রানা বলেন, সব টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যই নির্ভর করে স্বাস্থ্য সহকারীদের ভূমিকায়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও আমাদের দাবি মানা হচ্ছে না, এ দাবিগুলো না মানা পর্যন্ত আমরা কাজে ফিরবো না।
মাগুরার সিভিল সার্জন প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, আশা করছি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এবং স্বাস্থ্য সহকারীরা এ কর্মসূচিতে অংশ নেবে। তারপরও আমরা বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছি। কোনও সমস্যা হবে না।
কাউকে জিম্মি নয়, অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন মন্তব্য করেন লক্ষ্মীপুর স্বাস্থ্য সহকারীদের দাবি আদায়ের আহবায়ক নাজমুল হোসেন। তিনি বলেন, আমরা ৪ দফা দাবি আদায়ের জন্য এই আন্দোলন করছি।
আর দাবি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ বা মৌখিক আশ্বাস না দিলে স্বাস্থ্য সহকারীরা আন্দোলন অব্যাহত রাখবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, কাজের কোনও স্বীকৃতি নেই, সে অনুযায়ী বেতনও আপগ্রেড হচ্ছে না। ভেটেনারি ফিল্ড অ্যাসিসট্যান্টরা পশুপাখিদের টিকা দিলেও তাদের টেকনিক্যাল পদে স্বীকৃতি ও বেতন আপগ্রেড করা হয়েছে বলে দাবি করেন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য সহকারী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহনাজ বেগম। তিনি বলেন, বেতন স্কেলও আপগ্রেড করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বারবার তা ভঙ্গ করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলনের কারণে সারা দেশে এক লাখ ২০ হাজার আউটরিচ কেন্দ্র বন্ধ আছে। যেখানে মাসে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়।
এদিকে, হবিগঞ্জে আন্দোলনরত হেলথ ওয়ার্কাররা হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি থেকে সরে এসেছেন। তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের ওপর সবকিছু নির্ভর করছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বিভাগীয় মাঠ কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আসাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগামীকাল থেকে ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা রয়েছে। তবে আমরা কর্মবিরতিতেই রয়েছি। চলবে এটা।
তাহলে সরকার যে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির ঘোষণা দিলো তার কী হবে জানতে চাইলে আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু আমাদের সঙ্গে লিয়াজোঁ না করে দিয়েছি। আমরা এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
আসাদুজ্জামান বলেন, ২৬ নভেম্বর থেকে কর্মবিরতি চলছে। সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে আছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ একবারও বলেনি, ‘তোমরা কাজে ফিরে যাও, বিষয়টি আমরা দেখছি। তারা যদি কোনও আশ্বাস দিতেন আমরা কাজে ফিরে যেতাম। এখনও বলি, আজকে রাতেও যদি কোনও ঘোষণা আসে তাহলে কালকেই আমরা কাজে ফিরে যাবো।’
আগামীকালকের টিকাদান কর্মসূচির কী হবে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডা. শামসুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কাল থেকে সিটি করপোরেশনে কর্মসূচি শুরু হবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কর্মীরা তো আন্দোলনরত, এমনটা জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরশু থেকে প্রশিক্ষণ হবে।
কিন্তু আন্দোলনরত কর্মীরা তাদের দাবি মানা না হলে কর্মসূচি প্রত্যাহার করবেন না জানালে ডা. শামসুল হক বলেন, দাবি মেনে নেওয়ার কাজ আমরা না, এটা সরকারের বিষয়। আমার কাজ প্রোগ্রাম রেডি করা, আমি প্রোগ্রাম রেডি করেছি। প্রোগ্রাম কাদের দিয়ে করবেন প্রশ্ন করলে ডা. শামসুল হক বলেন, দেখা যাক। আমাদেরও একটা প্ল্যান মাথায় আছে। তারা যদি কর্মসূচি প্রত্যাহার না করে তাহলে সরকারও নিশ্চয়ই একটা সিদ্ধান্ত দেবে আমাকে। তারা (আন্দোলনরত কর্মচারী) যদি অফিস না করে বেতন পায় তার জন্য প্রশাসন রয়েছে, প্রশাসন দায়িত্ব নেবে এবং নিয়েছেও।








