আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে এনসিটিবি, তৎপর গোয়েন্দারা

পিস স্কুলে শিশুশিক্ষার্থীর পিঠে আরবি-ইংরেজির বোঝা

সালমান তারেক শাকিল
২৯ জানুয়ারি ২০১৬, ১৯:১৫আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০১৬, ২১:১২

পিস স্কুলের লোগো ও পাঠ্যবই পিস টিভির লোগো ব্যবহার নিয়ে একবার অভিযোগ উঠেছিল, এবার প্রশ্ন উঠেছে পিস স্কুলের কারিকুলাম নিয়ে। স্কুলটির সারাদেশে ১৪টি শাখায় প্লে গ্রুপ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিশুশিক্ষার্থী রয়েছে। তাদেরকে বাড়তি সিলেবাস হিসেবে আরবি ও ইংরেজি ভাষায় পাঠ্যবই পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। কিন্তু বোর্ডের অনুমোদনের বাইরে যেকোনও ভাষার বই পড়ানো বেআইনি বলে জানিয়েছেন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড(এনসিটিবি)কর্তৃপক্ষ এবং যারা ন্যাশনাল কারিকুলাম অনুসরণ করেন, তারা বোর্ডের বাইরে কোনও পাঠ্যবই যুক্ত করতে পারেন না। তবে, পিস স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা এক্সট্রা কারিকুলামের অংশ হিসেবেই আরবি-ইংরেজি ভাষার কিছু বই পাঠ্য করেছেন।
এদিকে, পিস স্কুলের নেপথ্যে জামায়াত-শিবির জড়িত রয়েছে কিনা তা অনুসন্ধানের নির্দেশ দেওয়ার পর এবার প্রতিষ্ঠানটির এক্সট্রা কারিকুলামের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এ নির্দেশ গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে পিস স্কুলের পেছনে জামায়াত-শিবিরের যুক্ত থাকার বিষয়টি উঠে আসলেও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি সরকার।
তবে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে- মূলত এই স্কুলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সরকার প্রথমে নিশ্চিত হয়েছে। তাদের আয়ের একটি অংশ অনুদান হিসেবে জামায়াত-শিবিরে জমা হয়। চলতি সপ্তাহে পিস স্কুলের কারিকুলাম নিয়ে প্রতিবেদন জমা হবে। এরপরই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সূত্রের আরও দাবি, ইতোমধ্যে পিস স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। এছাড়া গোয়েন্দারা যে তদন্ত করছেন তা স্বীকার করে স্কুলের একাডেমিক কমিটির চেয়ারম্যান ড. আকতারুজ্জামান বলেন, এটা ভালোই হয়েছে। খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এতে সামান্য অসুবিধা হলেও প্রতিষ্ঠানের লাভ।

তদন্তের বিষয়ে উত্তরা ক্যাম্পাসের অধ্যক্ষ ড. আবদুর রহিম বলেন, অনেক গোয়েন্দা সংস্থা খোঁজ নিচ্ছেন। আমিও কাগজপত্র দিয়ে সহায়তা করছি। এটা তো প্রতিষ্ঠান। লুকোচুরির কিছু নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ত্রি-ভাষিক চেইন স্কুল পিস স্কুল। সারাদেশে প্রতিষ্ঠানটির ১৪টি শাখা রয়েছে। এগুলো হচ্ছে, ঢাকার উত্তরা, চিটাগাং, খুলনা, বগুড়া, নোয়াখালী, ফেনী, দিনাজপুর, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী, মিরপুর-ঢাকা, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও কুষ্টিয়া ক্যাম্পাস।

উত্তরা ক্যাম্পাসের অধ্যক্ষ ড. মুহাম্মদ আবদুর রহিম মুকুল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এই ১৪টি ক্যম্পাসেই একই সিলেবাস পাঠ্যক্রম হিসেবে আছে।

ড. আবদুর রহিম একটি সিলেবাস তালিকা দেন। ওই তালিকায় দেখা গেছে, প্লে গ্রুপে দুটি, নার্সারিতে দুটি এবং কেজি ক্লাসে দুটি আরবি ভাষার পাঠ্যবই রয়েছে। এর মধ্যে ড. আবদুর রহিম রচিত আরবি ভাষার বইও আছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন- আমরা চাই, একজন শিশু শুরুতেই আরবি ভাষাটা শিখুক। মক্তবে যেতে হবে না, আমরা এ সুযোগটা স্কুলেই রেখেছি। তারা এখানেই সব শিখতে পারবে।

আরবির মতো ইংরেজি ভাষা শিখতেও শিশুদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে অনেক বই। এরমধ্যে শুধু কেজি ক্লাসে ইংরেজি ভাষার ৬টি বই। প্লে ক্লাসে আছে তিনটি এবং নার্সারিতে আছে চারটি ইংরেজি শেখার বই।

এনসিটিবির নিয়মে ন্যাশনাল কারিকুলামের ক্লাস ওয়ানে পাঠ্যবই আছে তিনটি। এর মধ্যে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত। এর বাইরে পিস স্কুলের এই ক্লাসের শিশুশিক্ষার্থীদের জন্য আরবি শেখার একটি, ইংরেজি শিখতে চারটি এবং কম্পিউটার শিখতে সিসটেক-প্রকাশিত বাড়তি একটি কম্পিউটার বিষয়ক বই রেখেছেন। একইভাবে ক্লাস টু-এ এনসিটিবির তালিকার বাইরে এক্সট্রা কারিকুলামের সুযোগ নিয়ে বাড়তি ৫টি বই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যথারীতি আরবি ভাষায় রয়েছে একটি বই। পাশাপাশি সিসটেক প্রকাশিত কম্পিউটার বই তো রয়েছেই।

ক্লাস থ্রিতে বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ইউপিএল প্রকাশিত দুটি ইংরেজি বই। ইসলাম নিয়ে বোর্ডের পাঠ্যবই থাকলেও আরবি ভাষায় একটি বই পড়ানো হচ্ছে পিসের শিক্ষার্থীদের। ‘আমার বাংলা’ বই থাকলেও বাড়তি যুক্ত করা হয়েছে এসএম ফজলুর রহমান রচিত ছড়ায় ছবিতে বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি-৩। যথারীতি সিসটেক প্রকাশিত কম্পিউটার বুক-থ্রি।

একইভাবে ক্লাস ফোর থেকে ক্লাস এইট পর্যন্ত এনসিটিবির বাইরে এক্সট্রা কারিকুলামের অংশ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে চার থেকে ৬টি বাড়তি বই।

বাড়তি সিলেবাসের বিষয়ে জানতে চাইলে কথা হয় পিস স্কুলগুলোর একাডেমিক কমিটির চেয়ারম্যান এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমেস্ট্রি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আকরামুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ক্লাস ওয়ানের নিচে প্লে, নার্সারি ও কেজিতে পড়ানোর জন্য বোর্ডের তো কোনও বই নেই। ক্লাস ওয়ান থেকে বোর্ডের সিলেবাস শুরু হয়। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের আরও দক্ষ করতে আমরা বাড়তি কিছু বই পড়াই।

নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আকরামুজ্জামান বলেন, এটা তো খারাপ কিছু নয়। আমরা তো সুনির্দিষ্ট আদর্শের কোনও বই পড়াচ্ছি না। এতে অসুবিধা কি? একাডেমিক কার্যক্রম তো খারাপ কিছু নয়। বাংলা বা ইংরেজিতে বাড়তি যে বই সেগুলো তো ছাত্রদের স্ট্রঙ্গার করতেই পড়ানো হচ্ছে।

তবে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান মিয়া ইনামুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এনসিটিবি আইন অনুযায়ী এবং ১৫-এর-১ ধারা অনুযায়ী বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া কোনও ধরনের বই পড়ানোর সুযোগ নেই। যদি কেউ এমন করে থাকেন তাহলে সেটি বেআইনি। কোনও প্রতিষ্ঠান এটি করে থাকলে এনসিটিবি আইনি ব্যবস্থা নেবে।

/এমএনএইচ/এএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে