তিল ধারণের ঠাঁই নেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। কোথাও কোনও বেড খালি নেই, এমনকি ফ্লোরও না। হাঁটার পথটুকু ফাঁকা নেই কোনও ফ্লোরে। অথচ গরমের এই সময়টাতে এত পুড়ে যাওয়া রোগী সাধারণত থাকে না। এসব রোগীর অধিকাংশই বিদুৎস্পৃষ্ট বলে জানালেন বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা। বার্ন ইউনিটে বিদুৎস্পৃষ্ট রোগী আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে, এমন তথ্যে বিস্ময় প্রকাশ করলেন বিদ্যুৎ বিভাগের ডিজি।
বুধবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেল, পাঁচতলায় হাঁটার মতো অবস্থা নেই। লিফট থেকে নেমে ভেতরে যেতে হয় খুব সতর্কতার সঙ্গে। ইউনিটের চার ও পাঁচতলায় পুরুষ রোগীর সংখ্যা বেশি। কথা বলে জানা গেল, অধিকাংশই ইলেক্ট্রিক বার্ন।
সুনামগঞ্জের আবু তাহের এসেছেন ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে। তার ভাই এলাকায় বিদ্যুতের কাজ করতেন। কাজ করতে গিয়ে তারের সঙ্গে রড জড়িয়ে বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে বাম পা কেটে ফেলতে হয়েছে তার। ডান পা নিয়েও চিকিৎসকরা রয়েছেন শঙ্কায়, এখনও তারা কিছুই বলতে পারছেন না।
আরও পড়ুন:
কার হাতে জামায়াতের পরবর্তী নেতৃত্ব
এদিকে, একই ঘটনা দিনাজপুরের রহিমেরও। তিনিও বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে এসেছেন এই বার্ন ইউনিটে।
এ প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন বার্ন ইউনিটের সহকারী অধ্যাপক তানভীর আহমেদ। বললেন, গত রবিবারে আউটডোরে বসেছিলাম রোগী ভর্তির সময়ে। এই প্রথম আমি রিফিউজ করতে বাধ্য হয়েছি। রোগীকে বলেছি, আপনি পাঁচতলায় গিয়ে আগে দেখেন, যদি একটু খানি জায়গাও খালি পান, আপনাকে ভর্তি করে নেব। পরে ওই রোগী পাঁচতলা থেকে ঘুরে এসে আমাকে বললেন, আমার তো আর জায়গা নেই, কোথায় ভর্তি হব?
অধ্যাপক তানভীর আহমেদ বলেন, তিনতলায় আগে অনেক ভেতরে রোগী থাকত। কিন্তু এখন লিফটের সামনেও চলে এসেছে। দু’তলায় রয়েছে এইচডিইউ এবং আইসিইউ। সেখানে এখন একটা বেডও খালি থাকছে না। কোনও রকমে একটা বিছানা খালি হলে সেখানে রোগীরা চলে আসছেন কিংবা অপেক্ষমাণ রয়েছেন।
সাধারণত শীতকালে পুড়ে যাওয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ে জানিয়ে ডা. তানভীর আহমেদ আরও বলেন, ওই সময় এর বেশি শিকার হন সাধারণত নারীরা। একইসঙ্গে শিশুরা। বারবার খাবার গরম করা, একটু আগুনের পাশে বসে ওম নেওয়া, গরম পানিসহ নানা কারণে নারী এবং শিশুর সংখ্যা বাড়ে। আর গরমের সময়ে বার্ন কমে যায়। কিন্তু চলতি বছরে আমরা এর ব্যতিক্রম দেখছি।
ইলেক্ট্রিক বার্নের জন্য ইলেক্ট্রিক ডিপার্টমেন্টের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, তাদের অবহেলাতেই এই বার্নগুলো বেশি হচ্ছে বলে মন্তব্য করলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সহকারী অধ্যাপক। তিনি বলেন, বৈদ্যুতিক তারের ওপরে নিরাপদ লেয়ার থাকে না, অনিরাপদ অবস্থাতেই এসব তারের কাজ করেন শ্রমিকরা। আর প্রচুর অবৈধ বিদ্যুৎ-সংযোগের কাজ চলে। যেগুলো বন্ধ করার দায়িত্ব তাদের হলেও সেই কাজটা তারা করে না, এসব কারণেই এসব মানুষ ভুগছেন।
আরও পড়ুন:
রাজধানীসহ সারাদেশে বজ্রাঘাতে নিহত ২৯
গরমের এই সময়টাতে এত পোড়া রোগীর ভর্তিকে অস্বাভাবিক বলছেন বার্ন ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা। বার্ন ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, এই সময়ে এত পোড়া রোগী আমি আর দেখিনি, এটা আমার কাছে অস্বাভাবিক ব্যাপার। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, অসাবধনতা বোধ হয় বেড়ে গেছে। মানুষের আগুনে পোড়ার যে সব কারণ রয়েছে, যেগুলোতে মানুষ বোধ হয় সচেতন থাকছে না খুব একটা। আরেকটি বিষয় হলো বৈদ্যুতিক সার্কিটে পোড়া। আর বর্তমান সময়ে ভয়াবহভাবে বেড়েছে গ্যাস লিক হওয়া। এটা এত বেশি হচ্ছে যে, আমার মনে হচ্ছে, একসঙ্গে অনেক দিনের পুরনো গ্যাসের সিস্টেম খারাপ হয়ে গেছে। এদিকে সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়া দরকার বলে আমি মনে করি।
ডা. সামন্ত লাল বলেন, আরেকটি বিষয় হলো, ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোয় পোড়া রোগীদের চিকিৎসা না থাকায় এই হাসপাতারের ওপর অনেক বেশি চাপ পড়ছে। এ জন্য অল্প কিছু বার্ন হলেও ঢাকার বাইরের হাসপাতাল থেকে চিকিৎসকরা রোগীদের এখানে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এটাও একটা কারণ। আর এগুলোর সমাধান করতে হলে ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, সেখানে বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করে মানুষের কনফিডেন্ট লেভেলে নিয়ে যেতে হবে। আরও বেশি করে চিকিৎসক ও নার্স তৈরি করতে হবে। তাহলে মানুষ কষ্ট করে আর ঢাকায় আসবে না।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের ডিজি মোহাম্মদ হুসেইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি খুবই অবাক হয়েছি আপনার কথা শুনে। এতদিন জানতাম, বার্ন ইউনিটে স্বামীর এসিড ছোড়ায় আক্রান্ত নারীরাই এখানে বেশি থাকেন। বিদ্যুৎপৃষ্ট এত মানুষ বার্ন ইউনিটে ভর্তি, এমন কথা প্রথম শুনলাম।
আরও পড়ুন: ফেসবুক লাইভে যা বললেন মেয়র আনিসুল হক
বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক ও রোগীদের বক্তব্য জানাতেই তিনি বলেন, আমরা গ্রামে-গঞ্জে ম্যাসিভ বিদ্যুতায়নের কাজ করছি। মানুষ এখন বিদ্যুতের সুবিধা পাচ্ছে। গ্রামের সহজসরল মানুষ বিদ্যুতের তারকে সাধারণ তার হিসেবেই বিবেচনা করেন। নতুন বিদ্যুৎ কানেকশনের ফলে তারা সুইচের ব্যবহারওটা ঠিকমতো জানেন না, এসব কারণেই হয়তো এসব দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে।
তবে, দুঘর্টনা এড়াতে আমরা চিন্তা-ভাবনা করছি, ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দুঘর্টনার কারণে একটু কস্টলি হলেও ইনসুলেটেড তার ব্যবহার করব।তিনি বলেন, এখন ব্যবহার হচ্ছে খোলা তার, যেটাতে হাত লাগলেই মানুষ বিদ্যুতপৃষ্ট হয়। যদিত ইনসুলেটেড ক্যাবল ব্যবহার করি, তাহলে হয়তো বিদ্যুৎপৃষ্ট মানুষের সংখ্যা কমে যাবে। কেউ যদি হাতও দেন তাহলেও দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকবে না।
/এমএনএইচ/আপ- এপিএইচ/








