মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এখন পর্যন্ত পাঁচ জামায়াত নেতার প্রাণদণ্ড কার্যকর করার মধ্য দিয়ে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের প্রধান বলয় নিশ্চিহ্ন হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, আরও অনেকে বিচার এখনও বাকি থাকলেও শনিবার মীর কাসেমের ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে শীর্ষ রাজাকারদের যুগের অবসান ঘটলো।
চিহ্নিত মানবতাবিরোধী অপরাধী ও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, দলটির অন্য তিন প্রধান নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী ও কাদের মোল্লার ফাঁসির দণ্ড কার্যকরের পর জামায়াত কার্যত এখন নেতৃত্ব শূন্য। ফলে দলটির নেতৃত্বে আসছেন এখন দ্বিতীয় সারির নেতারা।আর এই বলয়ের নিউক্লিয়াস গোলাম আযমও মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের চিহ্নিত আসামি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তারও অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ফাঁসির দণ্ড সমান শাস্তি পাওনা ছিল তারও। কিন্তু বয়স বিবেচনায় নিয়ে তাকে নব্বই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে ট্রাইব্যুনাল। সেই দণ্ড মাথায় নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার। এছাড়াও এ কে এম ইউসুফ নামের অপর এক মানবতাবিরোধী আসামি বিচার চলাকালেই মারা গেছেন।
তবে এই দলের একজন নেতা দণ্ড মাথায় নিয়ে এখনও বেঁচে আছেন। তিনি জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। দীর্ঘ সময় ধরে দেশজুড়ে ওয়াজ নসিহত করে বেড়ালেও তার আসল চেহারা প্রকাশ হয়ে যায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা ও ধর্ষণের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তারও মৃত্যুদণ্ড হয়। তবে আপিল বিভাগ সাজা কমিয়ে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে। সেই সাজা এখন ভোগ করছেন জামায়াতের এই নায়েবে আমির। তবে সাজা কমায় সাঈদীর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়টি পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে বিভিন্ন বাহিনী গঠন করে স্বাধীনতাকামীদের অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা, গণহত্যা, লুট, ধর্ষণ, জোর করে ধর্মান্তরিতকরণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এই ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম বলেন, সব মানবতাবিরোধী অপরাধী সমান অপরাধ করেছে। তবে জামায়াতের এই নেতৃত্বস্থানীয়রা পুরো সময়জুড়ে অপরাধ পরিচালনাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিল এবং নিজেরাও অপরাধ করেছে। এই বিবেচনায় তারা শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের সংগঠন জামায়াতে ইসলামীও যুদ্ধাপরাধে জড়িত সংগঠন হিসেবে আদালতে অভিযুক্ত। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এই অপরাধীরা তাদের সংগঠনকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছে। এই বিচারের মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পাশাপাশি শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের যুগের অবসান ঘটলো। তিনি আরও বলেন, এদেশে গোলাম আযমের বিচার হবে এবং তাকে কারাগারে নেওয়া হবে সেটা কেউ একসময় ভাবতেও পারেনি। কিন্তু পরবর্তীতে বিচারের মধ্য দিয়ে সে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং তাদের ‘নিউক্লিয়াস’কে বিচারের মুখোমুখি করার মধ্য দিয়ে প্রধান বলয়কে ধাক্কা দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
তদন্ত অফিসের প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা মূল বিচার কাজ শেষ হয়েছে এমনটা বলতে চাই না। তবে চিহ্নিত কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যারা সামনের সারির নেতা তাদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। আমরা সমান গুরুত্ব দিয়ে সব মামলা পরিচালনা করে থাকি। তবে এই যুদ্ধাপরাধীরা যেহেতু জামায়াতের মত অপরাধী সংগঠনের শীর্ষনেতা সেহেতু এটা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল।
জামায়াতের বর্তমান পরিস্থিতিকে একটা যুগের অবসান হিসেবে দেখছেন প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শীর্ষ এই মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশ রাজাকারমুক্ত হওয়া পথে এগিয়ে চলেছে। একটি কালো অধ্যায়ের অবসান হলো। জামায়াতের নেতৃত্বস্থানীয়দের মধ্যে যারা একাত্তরে অপরাধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল তাদের মধ্যে এটিএম আজহার ও আব্দুস সোবহানের মতো আরও বেশকিছু নেতাদের মামলা আপিল বিভাগে রয়েছে।
/ইউআই/টিএন/আপ-এমও/








