‘বারবার ঘুরেফিরে হলি আর্টিজানের কথা মাথায় আসছিল। সেখানে তো কেউ জীবন নিয়ে বেঁচে আসতে পারেনি। তাদের মতো অবস্থার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। মনে হচ্ছিল হলি আর্টিজানের মতোই হবে। প্রাণ নিয়ে ফেরার আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। দেশবাসীর আশীর্বাদে জীবন নিয়ে ফিরতে পেরেছি।’
সিলেটের জঙ্গি আস্তানা আতিয়া মহলে প্রায় ২৭ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বাংলা ট্রিবিউনের কাছে এভাবেই বর্ণনা করছিলেন সিলেট ফায়ার সার্ভিসের কর্মী উজ্জ্বল চক্রবর্তী (৩৭) ও তার স্ত্রী স্কুল শিক্ষক কান্তা ভট্টাচার্য। সেনাবাহিনীর সহায়তায় শনিবার (২৫ মার্চ) সকাল সোয়া ১০টায় তারা বের হয়ে আসতে সক্ষম হন আতিয়া মহল থেকে।
উজ্জল চক্রবর্তী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। শুক্রবার ভোরে আমার স্ত্রী কান্তা ঘুম থেকে ওঠে সোয়া ৬টার দিকে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েই ও পুলিশ দেখতে পায়। সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও ও ঘুম থেকে ডেকে তুলে। আমিও উঠেই বাইরে তাকিয়ে দেখতে পাই অনেক পুলিশ।’
বাড়ির চারপাশে পুলিশের আনাগোনা দেখে উজ্জ্বল চক্রবর্তী দ্রুত ফোন দেন তার পরিচিত এক পুলিশকে। নিজের অফিস ফায়ার সার্ভিসেও ফোন করে পরিস্থিতি বুঝতে চেষ্টা করেন। জানতে পারেন, আতিয়া মহলের নিচতলার একটি বাসায় জঙ্গিরা আস্তানা গড়েছে। উজ্জ্বল বলেন, ‘আমরা ছিলাম আতিয়া মহলের চতুর্থ তলায়। তখন বের হওয়ার কোনও সুযোগ ছিল না। পুলিশ সবাইকে ঘরের ভেতরে থাকতে বলছিল। আমি আমার স্বজনদের সঙ্গেও কথা বলি। তারা সবাই কান্নাকাটি করতে থাকে। এসময় ফ্ল্যাটের দরজাটা ভালো করে ভেতর থেকে আটকে দিয়ে আমি আর আমার স্ত্রী বাথরুমে গিয়ে আশ্রয় নেই।’
এর মধ্যে শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে এক বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে আতিয়া মহল। তাতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে উজ্জ্বল ও তার স্ত্রীর মধ্যেও। উজ্জ্বল বলেন, ‘ওই বিস্ফোরণের শব্দে আরও ভয় পেয়ে যাই। কিছুক্ষণ গুলির শব্দও হয়। আবার নীরব। এর মধ্যে হ্যান্ডমাইক দিয়ে জঙ্গি মর্জিনার নাম ধরে পুলিশ কথা বলে। তবে জঙ্গিদের কোনও কথা শুনতে পাইনি। এভাবে দিন চলে যায়। সারাদিন অনেকের সঙ্গেই ফোনে কথা বলেছি। মোবাইলের চার্জও শেষ হয়ে আসছিল। রাত হয়ে গেলে ভেবেছি, রাতেই সব শেষ হয়ে যাবে।’
রাতের বিভীষিকার কথা বলতে গিয়ে উজ্জ্বল বলেন, ‘শুক্রবার রাতে বাড়িটির ভেতরে কোনও আলো ছিল না। আমরাও বাথরুমেই চুপ করে ছিলাম। গভীর রাতে একবার মনে হচ্ছিল আমাদের ফ্ল্যাটের সামনে কেউ হাঁটতেছে। কিন্তু কোনও কথা বলেনি। জঙ্গিরা রাতে হাঁটাহাঁটি করেছে বিভিন্ন ফ্ল্যাটের সামনে দিয়ে। তখন মনে হচ্ছিল, এই বুঝি দরজা ভেঙে ফেলবে।’
জঙ্গি আস্তানায় অবরুদ্ধ রাতটিকে নিজের জীবনের দীর্ঘতম রাত হিসেবে অভিহিত করলেন উজ্জ্বল। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার রাত যেন শেষই হতে চাচ্ছিল না। আমরা বাঁচার আসা ছেড়েই দিয়েছিলাম। শনিবার সকালে আমার বাড়িওয়ালার মোবাইল থেকে একটা ফোন আসে। আমি রিসিভ করার পর তিনি কথা বলে একজন সেনাকর্মকর্তার কাছে ফোনটি দেন। তখন জানতে পারি, সেনাবাহিনী আসছে। সারাদিন-সারারাতের ভয় আর আতঙ্কের পর তখন একটু সাহস ফিরে পাই। ফোন দেই পাশের ফ্ল্যাটের পরিচিত একজনকে। তিনিও জানান যে তাদের সঙ্গেও কথা হয়েছে সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তার। বুঝতে পারি, এ যাত্রায় হয়তো বেঁচে যাব।’
অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে উজ্জ্বল বলেন, ‘ফোনে ওই সেনাকর্মকর্তা আমাদের বলেছিলেন, তারা দরজা নক করলেই আমরা খালি হাতে বাসা থেকে বের হয়ে আসি। শনিবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে আমাদের দরজায় শব্দ হয়। বুঝতে পারছিলাম না জঙ্গি নাকি সেনাবাহিনী— কারা এসেছে দরজায়। তবু আমি সাহস করে দরজা খুললাম। দরজা খুলেই দেখতে পাই সেনাসদস্যদের। হাত ওপরে তুলে তাদের সঙ্গে বের হয়ে যাই। পাশের বাসার ছাদ থেকে আমাদের নামানো হয়। আমাদের নিয়ে রাখা হয় পাশের একটি বাড়িতে। শনিবার রাতে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেয় সেনাবাহিনী।’
উজ্জ্বল চক্রবর্তী বলেন, ‘বাড়িটিতে অসংখ্য ফ্ল্যাট। কে কোন বাসায় থাকে, তা বলা মুশকিল। জঙ্গিরা যে ফ্ল্যাটে থাকত, তা নিচতলার একেবারে কর্নারের একটি ফ্ল্যাট। সেখানে কেউ যেত না। কেউ কথাও বলত না। তাই তাদের কখনও দেখছি বলে মনে পড়ে না।’
আরও পড়ুন-
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আতিয়া মহলে কমান্ডো অভিযান
জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে র্যাবের গোয়েন্দা প্রধান আজাদ
লাশ শনাক্ত করতে সিলেটের পথে জঙ্গি মনজিয়ারার পরিবার
ফ্রিজ ও মোটরসাইকেল দিয়ে বিস্ফোরক ডিভাইস বানিয়েছিল জঙ্গিরা
/এআরআর/টিআর/








