ফরহাদ মজহার স্বেচ্ছায় ঢাকায় ফিরেছেন বলে জানিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহিদুল হক। বৃহস্পতিবার দুপুরে পুলিশ সদর দফতরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা জানান।
আইজিপি বলেন, ‘এটা অপহরণ নয়। সরকারকে বিব্রত করার জন্য এরকম করা হয়েছে।’
শহিদুল হক বলেন, ‘ফরহাদ মজহারকে নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি ও বিবৃতির মাধ্যমে সরকার, প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উদ্দেশ্যমূলক। সরকারকে বিব্রত ও বিপাকে ফেলার জন্য এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে পুলিশের তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে। এবং আমরা শতভাগ স্বচ্ছতা নিয়ে এ ঘটনার তদন্ত করছি।’
খুলনা নিউমার্কেটে ছিলেন ফরহাদ মজহার
আইজিপি বলেন, ‘৩ জুলাই ঘটনার দিন বিকাল ৪টা ২১ মিনিট থেকে ৬টা ২৮ মিনিট পর্যন্ত তিনি খুলনা নিউমার্কেটে ছিলেন।’
প্রত্যেকটি মাইক্রোবাস চেক করা হয়েছে
পুলিশ মহাপরিদর্শক বলেন, ‘ফরহাদ মজহার একজন বিশিষ্ট ব্যাক্তি ও বুদ্ধিজীবী। ওই দিন সকালে যখন অপহরণের অভিযোগ থানায় আসে। তখনই পুলিশ তাকে উদ্ধারে তৎপর হয়ে ওঠে। মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং করে তার অবস্থান এলাকার তথ্য জানার পর প্রত্যেকটি মাইক্রোবাস চেক করা হয়েছে।’
আইজিপি বলেন, ‘কিন্তু একটি মহল সরকার, প্রধানমন্ত্রী এবং প্রতিবেশী একটি দেশের বিরুদ্ধে তাকে অপহরণের মিথ্যা অভিযোগ তোলে। আমরা মনে করেছি তদন্তের পরেই এ বিষয়ে জনগণকে জানানো উচিত।’
১০ বার মোবাইল ফোনে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন
আইজিপি বলেন, ‘অপহরণ ঘটনার পর থেকে উদ্ধার হওয়ার আগ পর্যন্ত উনি (ফরহাদ মজহার) ১০ বার মোবাইল ফোনে তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তার অন্য আরেকটি নাম্বার থেকে তিনি অপর এক নারীর সঙ্গে ছয়বার কথা বলেছেন। যার সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন—দিনি ভাটারায় থাকেন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম চলে যান। ওই নারী ফরহাদ মজহারের এনজিওতে চাকরি করতেন। অপহরণ ঘটনার আগের দিনও ওই নারীর সঙ্গে তিনি মোবাইল ফোনে কথা বলেছেন। কথা বলার পর ফরহাদ মজহার অনেকটা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। ঘটনার আগে পরে যেহেতু ওই নারীর প্রসঙ্গ ছিল, সেহেতু তার বক্তব্য নেওয়াও পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ওই নারী ইতোমধ্যে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।’ ফরহাদ মজহারে খুলনায় পৌঁছানোর পর রকেট সার্ভিসের মাধ্যমে একবার ১৩ হাজার ও আরেকবার ২ হাজার টাকা ওই নারীর জন্য পাঠিয়েছেন বলে জানান আইজিপি।
ফরহাদ মজহারের মোবাইল ফোনে দুইটি সিম ছিল
আইজিপি জানান, ‘ফরহাদ মজহারের মোবাইল ফোনে দুইটি সিম ছিল। একটি দিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে এবং আরেকটি দিয়ে অন্য মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতেন।’ ফরহাদ মজহারকে উদ্ধারের পরে আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলতে না দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভিকটিম যেহেতু নিজেই বাদী এবং এক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি নিতে হয়। সে কারণে কথা বলার সুযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি।’
প্রেস ব্রিফিংয়ে আইজিপি বলেন, ‘ঘটনার দিন মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় তিনি তাকে নিয়ে ফেসবুকে অপহরণ স্ট্যাটাস বন্ধ করার জন্য তার স্ত্রীকে অনুরোধ করেন এবং বলেন তাকে অপহরণকারীরা ছেড়ে দেবে।’
মাঝে মাঝে বুদ্ধি এলোমেলো হয়ে যায়
ফরহাদ মজহারের অপহরণ নাটকের কারণে তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, ‘বুদ্ধিজীবী তো, তাই মাঝে মাঝে বুদ্ধি এলোমেলো হয়ে যায়।’ বিষয়টি পরবর্তীতে খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি জানান।
ফরহাদ মজহারের স্ত্রী-কন্যার অভিযোগ তার সঙ্গে ব্যাগ এবং টাকা ছিল না সাংবাদিকরা এবিষয়ে জানতে চাইলে আইজপি বলেন, ‘তার স্ত্রীকে বিভ্রান্ত করার জন্য পাঞ্জাবির নিচেও ব্যাগ রাখতে পারেন।’
ঢাকা থেকে তিনি কিভাবে গেলেন জানতে চাইলে আইজপি বলেন, ‘পুলিশের ধারণা তিনি বাসেই গেছেন। এবং বাসেই ঢাকায় আসার পথে তাকে উদ্ধার করা হয়েছে।’
আইজপি জানান, ‘হানিফ পরিবহনের ম্যানেজার পুলিশকে জানিয়েছে ফরহাদ মজহার নিজেই গফুর নাম দিয়ে ঢাকায় ফেরার টিকিট কেটেছেন।’
উল্লেখ্য, ৩ জুলাই ভোর সোয়া ৫টার দিকে রাজধানীর আদাবর রিং রোড এলাকার হক গার্ডেনের নিজ বাসা থেকে বের হন ফরহাদ মজহার। এরপর একটি সাদা মাইক্রোবাসে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। বিষয়টি তিনি স্ত্রী ফরিদা আখতারকে মোবাইলে জানান। এরপর আরও অন্তত পাঁচ বার তিনি স্ত্রীর কাছে ফোন করে মুক্তিপণ হিসেবে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দেওয়ার কথা বলেন। বিষয়টি নিয়ে দিনভর দেশজুড়ে আলোচনা চলতে থাকে। ফরিদা আখতারের মৌখিক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রযুক্তির সাহায্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানতে পারেন ফরহাদ মজহারকে গাবতলী, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, যশোর হয়ে খুলনার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুলনা থেকে ঢাকায় আসার পথে ফরহাদ মজহারকে যশোরের নওয়াপাড়ায় হানিফ বাস থেকে উদ্ধার করে। ৪ জুলাই তাকে ঢাকায় আনার পর আদালতে নেওয়া হলে তিনি ১৬৪ ধারায় ভিকটিম হিসেবে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দেন। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনায় ফরহাদ মজহারের স্ত্রী ফরিদা আখতার বাদী হয়ে সোমবার (৩ জুলাই) রাতেই আদাবর থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার তদন্তভার প্রথমে আদাবর থানা ও পরবর্তীতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
যা ঘটেছে তা প্রকাশ করতে ভীত নই: গার্ডিয়ানকে ফরহাদ মজহার
ফরহাদ মজহার নিজেই অপহরণকারীদের মুক্তিপণের টোপ দিয়েছিলেন?
/জেইউ/এনআই/








