X
সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২
১১ আশ্বিন ১৪২৯

তিন স্তরে দুর্বল হয় ধর্ষণের মামলা

উদিসা ইসলাম
১১ আগস্ট ২০১৭, ১৯:১৩আপডেট : ১১ আগস্ট ২০১৭, ২২:৪৯

ধর্ষণ মামলা দায়ের থেকে শুরু করে তিনটি ধাপে ধর্ষণের মামলা দুর্বল করে দেওয়া হয় বলেই ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না বিচারপ্রার্থীরা। আইনজীবী, ফরেনসিক বিভাগের কর্মকর্তা ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, থানা, শারীরিক পরীক্ষা ও সাক্ষী উধাও- এই তিন ধাপের গড়মিলের মধ্যদিয়ে ধর্ষণ মামলা দুর্বল করা হয়। সামাজিকভাবে প্রভাবশালীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে সাক্ষীদের পিছিয়ে পড়ার প্রবণতাও রয়েছে। মূলত এসব কারণে ধর্ষণের মামলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলেই বাংলাদেশে এক হাজারে মাত্র চারজন আসামি ধর্ষণ মামলায় সাজা পায়৷

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, তারা এই পুরো প্রক্রিয়ার একটি অংশ মাত্র। পুরো দায় কোনোভাবেই পুলিশের নয়।

২০০১ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পুলিশের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে পাঁচ হাজার তিনটি ধর্ষণের  মামলা হয়।  এর মধ্যে রায় ঘোষণার হার ৩ দশমিক ৬৬ ভাগ এবং সাজার হার শূন্য দশমিক ৪৫ ভাগ।

পুলিশ সদর দফতরের নথি অনুয়ায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে মোট ৪৩ হাজার ৭০৬টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার মামলায় এক লাখ আসামি খালাস পেয়েছে। আর ধর্ষণ মামলায় খালাস পেয়েছে ৮৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ আসামি। নারী নির্যাতনের মামলায় আসামি খালাসের পরিমাণ ৯৫ শতাংশ।

অনেক সময় আলোচিত ঘটনায় আসামি খালাস পেলে প্রশ্ন ওঠে, কী কারণে তারা খালাস পেল। অন্য ক্ষেত্রে আসামি খালাসের ঘটনা অগোচরেই থেকে যায়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি বিচার প্রক্রিয়া মূলত সুঁই-সুতা দিয়ে বুননের মতো। একটু একটু করে সেটি যৌক্তিক পরিণতি পায়। যেকোনও একটা জায়গায় ছেদ পড়লে সেটি সঠিক পরিচালিত  হবে না। প্রাথমিকভাবে তিনটি স্তর দেখা যায়, যেখানে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না।

আইনজীবী এলিনা খান মনে করেন, ‘অপরাধী হওয়ার পরও আসামিদের সাজা না হওয়ার তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে মূলত তিনটি কারণে। তদন্ত পর্যায়ে পুলিশের দুর্বলতা, আর্থিক লাভ ও প্রভাবশালীদের চাপ এবং সাক্ষীদের মোটিভেশনের অভাব– এই বিষয়গুলো এর পেছনের কারণ হিসেবে কাজ করছে।’ এদিকে সুরতহাল প্রতিবেদনের সঙ্গে চার্জশিট ও ময়নাতদন্তের মিল থাকে না বলে আসামিপক্ষ আদালতে গিয়ে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

যদিও বাংলাদেশ পুলিশের মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের এআইজি সহেলি ফেরদৌস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চার্জশিট ও ময়নাতদন্তের মিল থাকে না, একারণে পুলিশকে দোষারোপ করা হয়ে থাকে। কিন্তু এককভাবে পুলিশকে দায়ী করার সুযোগ নেই। কেননা, সুরতহাল করার সময় পুলিশের সঙ্গে একজন ম্যাজিস্ট্রেটও উপস্থিত থাকেন। ফলে এককভাবে কাউকে দোষী করার সুযোগ নেই।’

এদিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবদুল্লাহ আবু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেক সময় তদন্তের দুর্বলতা ও সাক্ষীর অভাবে আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে। আবার  দীর্ঘসময় মামলা চলায় সাক্ষীরা অনেক সময় বেঁকে বসেন। তারা সহযোগিতা করতে চান না।’ তিনি আরও বলেন, ‘তদন্ত ঠিকমতো না হলে আদালতের সামনে আমাদের পক্ষ থেকে কিছু করার থাকে না। আবার অনেক সময় আসামির সঙ্গে অভিযোগকারীরা সমঝোতা করে নেন। সবটাই বাস্তবতা।’

দীর্ঘদিন ধর্ষণ ভিকটিমদের নিয়ে কাজ করছেন মানবাধিকারকর্মী ও নারীনেত্রী রোকেয়ার কবীর। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘থানা, ময়নাতদন্ত ও সাক্ষী-এই তিন স্তরে মামলা দুর্বল করার কাজ হয়। ধর্ষণের মামলায় ধর্ষণের শিকার নারীর সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়, তাকে বিচার চাওয়ার পথে বাধা দেয়। বিচার চাইতে এলে সেখানে যে পুরুষতান্ত্রিক পরিবেশ, তা তাকে স্বস্তি দেয় না। আদালতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ধর্ষণের অভিজ্ঞতা তাকে এতবার বলতে হয় যে, সে আর মামলাটি চালিয়ে যাওয়ার সাহস রাখেন না। আর দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাহীন ও ধর্ষণের শিকার নারীর বিরুদ্ধে কাজ নেবে সেটাও স্বাভাবিক।’

জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট দিলরুবা শারমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বলাই বাহুল্য, মেডিক্যাল টেস্টের জন্য পাঠাতে দেরি করার মধ্য দিয়েই মামলা দু্র্বল করার প্রধান কাজটি করা হয়। এরপরের ধাপের কাজগুলো এর মধ্যে দিয়েই সহজ হয়ে যায়। সাক্ষীদের হাত করা কিংবা বছরের পর বছর ধরে মামলা পরিচালনা করে বাদীর আগ্রহ কমিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে মামলাটির গুরুত্বও কমিয়ে দেওয়া হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশের সামাজিক বাস্তবতায় নারীর যৌনসংসর্গের পূর্বঅভিজ্ঞতা আছে, এটি প্রমাণ করেও মামলা দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়। এই পুরো পরিস্থিতিরই পরিবর্তন জরুরি।’

/ইউআই/এফএস/ এপিএইচ/

আরও পড়ুন:

অন্ধ বলে আমাকে যেন হেয় হতে না হয়: প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে সিদ্দিকুর

 

সম্পর্কিত
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
রাখাইনে মিয়ানমার জান্তার গোলাবর্ষণে নিহত ২ শিশু
রাখাইনে মিয়ানমার জান্তার গোলাবর্ষণে নিহত ২ শিশু
নারী ফুটবলারদের প্রতি আমাদের অনৈতিক ‘সংবেদনশীলতা’
নারী ফুটবলারদের প্রতি আমাদের অনৈতিক ‘সংবেদনশীলতা’
জেলেনস্কিও মনে করেন পারমাণবিক হামলা চালাবে রাশিয়া
জেলেনস্কিও মনে করেন পারমাণবিক হামলা চালাবে রাশিয়া
মোবাইলে কথা বলতে বলতে রেললাইন পার, ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু
মোবাইলে কথা বলতে বলতে রেললাইন পার, ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু
এ বিভাগের সর্বশেষ
রংপুরে আম্বিয়া হত্যাকাণ্ড: শফি উদ্দিনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল
রংপুরে আম্বিয়া হত্যাকাণ্ড: শফি উদ্দিনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল
বছরে ছয় কোটি টাকার জন্য ধ্বংস করা হয়েছে জাফলং-বিছানাকান্দি
বছরে ছয় কোটি টাকার জন্য ধ্বংস করা হয়েছে জাফলং-বিছানাকান্দি
পঞ্চগড়ে নৌকাডুবি: নিহতদের পরিবারকে অর্থ সহায়তা ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর
পঞ্চগড়ে নৌকাডুবি: নিহতদের পরিবারকে অর্থ সহায়তা ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর
রণেশ মৈত্র’র মৃত্যুতে মেয়র তাপসের শোক
রণেশ মৈত্র’র মৃত্যুতে মেয়র তাপসের শোক
‘ধনী তোষণনীতি বাদ দিয়ে ড্যাপ সংশোধন করুন’
‘ধনী তোষণনীতি বাদ দিয়ে ড্যাপ সংশোধন করুন’