আসামের নাগরিক তালিকা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ‘টাইম বোমা’

রঞ্জন বসু, দিল্লি
০১ জানুয়ারি ২০১৮, ২১:৪৬আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০১৮, ২২:৩৮

ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস

বছর শেষের অন্তিম প্রহর বা তথাকথিত ‘থার্টি ফার্স্ট নাইটে’ গোটাদেশ যে মেতে থাকে আনন্দ উল্লাসে, এবারে ভারতের আসাম ছিল তার এক বিরল ব্যতিক্রম। কারণ, ঘড়ির কাঁটা যখন ঠিক রাত বারোটা ছুঁয়ে নতুন বছরে পা দিচ্ছে, ঠিক তখনই এই রাজ্যে অনলাইনে প্রকাশিত হলো বৈধ নাগরিকদের প্রথম খসড়া তালিকা বা এনআরসি। আর বিতর্কিত এই তালিকাকে অনেকেই মনে করছেন, ২০১৮ সালে আসামের নাগরিক তালিকা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ‘টাইম বোমা’ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

আসামে কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে অনেক বছর ধরে রাজনৈতিক প্রচারণা চালিয়ে আসছে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠী, যারা অহমিয়া জাতীয়তাবাদের প্রতিভূ। অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা আসু’র মতো প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠন আসামে অনেক দিন ধরে দাবি করে আসছে, বাংলাদেশ থেকে আসা বাঙালি মুসলিমদের কারণেই রাজ্যে অসমিয়ারা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। এমনকি কোনও কোনও অঞ্চলে আসামের ভূমিপুত্ররা নাকি সংখ্যালঘুতেও পরিণত হয়েছে।

দু’বছর আগে যে বিজেপি প্রথমবারের মতো আসামে ক্ষমতা দখল করেছে, তারাও ঘোষিতভাবে বাংলাদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে। যদিও সেটা শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্যই প্রযোজ্য, বাংলাদেশি হিন্দুদের জন্য তাদের দ্বার অবারিত। আর  এমন এক পটভূমিতেই আসামে প্রকাশিত হলো ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনসের প্রথম খসড়া, যে তালিকায় নাম থাকলে তবেই একজন আসাম তথা ভারতের বৈধ নাগরিকের স্বীকৃতি পাবেন। অন্যথায় তাকে শনাক্ত করা হবে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে।

আর ঠিক এখানেই যাবতীয় গণ্ডগোলের সূত্রপাত। এই তালিকা থেকে আসামের যে লাখ লাখ বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমের নাম বাদ পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তারা অবধারিতভাবে আসামে থাকার অধিকার হারাবেন। হয়তো অচিরেই তাদের ঠাঁই হবে সীমান্তবর্তী ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতে, যেখানে এর মধ্যেই বেশ কয়েক হাজার সন্দেহভাজন ‘বিদেশি’কে (বাংলাদেশি) রাখা হয়েছে। কিন্তু সেই সংখ্যাটা যদি বেড়ে গিয়ে লাখ লাখ দাঁড়ায়, তাহলে সমস্যা আরও অনেক প্রকট হবে সন্দেহ নেই। যেহেতু বাংলাদেশ তাদের একজনকেও ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত নয়, তাই বিষয়টি অচিরেই একটি কূটনৈতিক সংকটের চেহারায় রূপ নিতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন।

‘মুশকিলটা হলো, আসামে এনআরসি-কে ঘিরে যে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে, সেখানে হয়তো লাখ লাখ  মানুষ সত্যিই নিজেদের বৈধ নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে পারবেন না। কিন্তু তাদের আমরা যতই বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করি না কেন, বাংলাদেশ যদি তাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি না হয়, তাহলে সমস্যা তো রয়েই যাবে। আর আমরা যতদূর জানি, বাংলাদেশ তাদের একজনকেও আদৌ ফেরাতে প্রস্তুত নয়।’, বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন দিল্লির থিঙ্ক ট্যাংক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো জয়িতা ভট্টাচার্য।

আসামে তালিকাভুক্তির জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন কয়েকজন স্থানীয় নাগরিক (ছবি- বিবিসি) আসামে বিদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে যারা শনাক্ত হবেন, তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে তো দূরের কথা, এনআরসি তালিকা তৈরির বিষয়েও ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনও আলোচনাই হয়নি, সেটাও মনে করিয়ে দেন তিনি। আর সে কারণেই জয়িতা ভট্টাচার্যের ধারণা- দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি একটি ‘টাইম বোমা’-র সঙ্গে তুলনীয়।

এ আশঙ্কা যে মোটেও ভিত্তিহীন নয়, তার ইঙ্গিত আছে প্রথম খসড়াতেই। মোট সোয়া তিন কোটিরও বেশি লোক আসামে এই তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। তারা আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা দিয়েছেন প্রয়োজনীয় নথিপত্র বা প্রমাণাদি। সরকারও ধারণা দিয়েছিল, এর মধ্যে থেকে অন্তত সোয়া দুই কোটি লোকের নাম প্রথম খসড়ায় থাকবে। বাকিদের অপেক্ষা করতে হবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তালিকা বেরোনো পর্যন্ত। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো, এক কোটি ৯০ লাখ নাম ঠাঁই পেয়েছে প্রথম খসড়ায়।আর অনিশ্চয়তার মধ্যে ডুবে রয়েছেন রাজ্যের লাখ লাখ বাসিন্দা, বিশেষত বাঙালি মুসলিমরা।

‘যদিও এদিনের (৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতের) তালিকাই চূড়ান্ত তালিকা নয়, তারপরেও যেভাবে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম সংখ্যক নাম প্রথম খসড়ায় ঠাঁই পেয়েছে, তাই তাতে আমাদের নিশ্চিন্ত হওয়ার কোনও অবকাশ থাকছে না। বস্তুত আর  কয়েক মাসের মধ্যে তালিকা চূড়ান্ত হয়ে গেলে আসামের লাখ লাখ মানুষ রাষ্ট্রহীন নাগরিকে পরিণত হবেন, এমন আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ আছে’, নতুন বছরের প্রথম দিনে এই প্রতিবেদককে বলছিলেন আসামের নাগরিক অধিকার সুরক্ষা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ও গুয়াহাটির সিনিয়র আইনজীবী হাফিজ রশিদ চৌধুরী।

তিনি যাদের রাষ্ট্রহীন নাগরিক বলে বর্ণনা করছেন, আসামের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের চোখে তারাই অবৈধ বাংলাদেশি ছাড়া আর কিছু নয়। নাগরিক তালিকা তৈরির কাজ শেষ হলে ভারত সরকার যে এই তথাকথিত বিদেশিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য সচেষ্ট হবে, সেটাও অনুমান করা যায় সহজেই।

দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীও দিনকয়েক আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘরোয়া আলোচনায় স্বীকার করেছিলেন, এই বিষয়টি তার দেশকে উদ্বেগে রেখেছে। হাই কমিশনার আলী সেদিন আরও বলেছিলেন, আসামে এনআরসি তালিকা প্রকাশ নিয়ে কী ঘটছে, তার ওপর তারা প্রতিনিয়ত নজর রাখছেন এবং ঢাকাকেও নিয়মিত অবহিত করছেন।

সোজা কথায়, ২০১৮ সালের প্রথম প্রহরে আসামে এনআরসি-র প্রথম খসড়ার মধ্যদিয়ে যে প্রক্রিয়ার সূচনা হলো, তার মধ্যেদিয়ে আসামের নাগরিক তালিকা বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ‘টাইম বোমা’ বন্ধুপ্রতিম কূটনৈতিক সম্পর্ককেও কিন্তু এক কঠিন পরীক্ষা পার হতে হবে। ভারত যদি সত্যিই আসামের কয়েক লাখ বাঙালি মুসলিমকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি তোলে, তখন কীভাবে দুই বন্ধু দেশ তার মীমাংসা করে, সেটা অবশ্যই একটা দেখার বিষয় হবে। এই মুহূর্তে সেই সংকটের আভাস স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সমাধানের কোনও দিশা এখনও দিগন্তে নেই!

 

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম