চিকিৎসায় বৈষম্যের শিকার নারী, নিরসনে দরকার শিক্ষা ও জনসচেতনতা

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
০৩ মার্চ ২০১৮, ১৮:৩২আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৮, ১৮:৪২

 

 

গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরা

দেশে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে আছেন নারীরা। অসুস্থ হলেও তারা চিকিৎসা নিতে যান না বা তাদের অসুস্থতা পরিবারের সদস্যদের কাছে তেমন গুরুত্ব পায় না। এতে করে বৈষম্য বাড়ছে। এই বৈষম্য দূর করতে হলে সবার আগে নারীকে শিক্ষিত হতে হবে। পাশাপাশি গড়ে তুলতে হবে জনসচেতনতা।
শনিবার রাজধানীতে ডেইলি স্টার সেন্টারে ‘কিডনি ও নারীদের স্বাস্থ্য: চিকিৎসা ক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসনে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরা এসব কথা বলেন।
আলোচনার শুরুতে কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির (ক্যাম্পস) সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ বলেন, ‘কিডনি রোগে পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি আক্রান্ত হন। প্রতি বছর সারাবিশ্বে কিডনি বিকল হয়ে ছয় লাখ নারী মারা যাচ্ছেন। সারাবিশ্বে ১৪ শতাংশ নারী ও ১২ শতাংশ পুরুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। আক্রান্তের হার পুরুষের তুলনায় নারীর বেশি হলেও কিডনি বিকলের চিকিৎসা, ডায়ালাইসিস ও কিডনি সংযোজনের ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে পুরুষরা। চিকিৎসার সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা অবহেলিত। তারা বৈষম্যের শিকার।’
‘কিডনি ডোনেট করার ক্ষেত্রে স্ত্রীরা শত ভাগ স্বামীদের দিয়ে থাকেন, কিন্তু একজন স্বামীও পাওয়া যায় না যিনি স্ত্রীর জন্য ডোনেট করেছেন।’ এটা খুব হতাশার বলে জানান কিডনি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ। তিনি বলেন, ‘দেশে কিডনি রোগীর তুলনায় ডায়ালাইসিস সেন্টার খুবই কম। মাত্র ৯৬টি সেন্টার রয়েছে। ডায়ালাইসিসের জন্য বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সাড়ে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হয়। সপ্তাহে দুবার করে ডায়ালাইসিস করা নিম্নবিত্ত, এমনকি মধ্যবিত্তের পক্ষেও সম্ভব নয়।’ ডায়ালাইসিসের খরচ কমাতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বাস্তবিক উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি। আর নারীর কিডনি চিকিৎসায় বৈষম্য দূর করতে সরকারকে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে। সর্বোপরি সমাজে মানুষের মাইন্ড সেট পরিবর্তন হওয়া জরুরি বলে মনে করেন অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ।
সচেতনা সৃষ্টির মাধ্যমে কিডনি রোগকে ঠেকানো (প্রিভেন্ট) সম্ভব বলে মনে করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অনুষ্ঠান বছরে একবার আয়োজনের পরিবর্তে কয়েক বার করা উচিত। এই রোগটি জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রিভেন্ট করা সম্ভব।’ এ ছাড়া ডায়ালাইসিসের ব্যয় কমানো, নিয়মিত ব্যায়াম করা, পরিমিত পরিমাণ পানি পান করাসহ বেশ কয়েকটি পরামর্শ দেন আব্দুল কাইয়ুম।
সবার আগে নারীর শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপের আহ্বান জানান বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রফিকুল আলম। তিনি বলেন, ‘সব মেয়েকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। তারা শিক্ষিত হয়ে উঠলে নিজেদের চিকিৎসার বিষয়টি তারা নিশ্চিত করতে পারবে।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কিডনি রোগে আক্রান্ত বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গিত শিল্পী মিতা হক। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আক্রান্ত হওয়ার অনেক পর জেনেছি। রোগ সম্পর্কে সব সময় সচেতন থাকতে হবে। আর মেয়েরা রোগাক্রান্ত হলে সবচেয়ে বেশি সাফার করতে হয়। শুধু কিডনি রোগে নয়, সব রোগের বেলাতে একই অবস্থা। এসব বিষয়ে রোগীকে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হয়। পাশাপাশি আশপাশের সবার উচিত আক্রান্ত ব্যক্তিকে উৎসাহ দেওয়া।’
সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু। তিনি বলেন, ‘কিডনি রোগ হয়ে গেলে কিছু করার নেই। সে ক্ষেত্রে প্রিভেনশন জরুরি। দরকার সচেতনতা।’ পোশাক শিল্পে কাজ করা নারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করা যেতে পারে বলে মনে করেন এই ক্রিড়াবিদ। তার ভাষ্য, পোষাক শিল্পে অনেক নারী আছেন। তাদের সচেতন করা দরকার। এ ছাড়া জুমার নামাজের সময় কয়েক মিনিট নারীর স্বাস্থ্যসহ জনসচেতনতার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হলে সবার মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে বলে মনে করেন গাজী আশরাফ হোসেন লিপু।
কিডনি রোগ ও নারীর চিকিৎসা নিয়ে ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন হতে পারে বলে মনে করেন ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটিডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়রা আজম।
সমস্যা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি তা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মন্তব্য করে চলচ্চিত্র অভিনেতা ফেরদৌস আহমেদ। তিনি বলেন, ‘ছেলে ও মেয়েকে আলাদা না করে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। আমরা আলাদা করে ফেলি, সেটা ঠিক নয়। সমস্যা নিয়ে আমরা আলোচনা করি। কিন্তু এর সমাধান কীভাবে হবে এবং কারা করবে, সেটা নিয়ে খুব একটা কাজ হয় না। এই কাজটা আমাদের করতে হবে। তাহলে সমস্যা সমাধান হবে।’
নারীরা অনেক ক্ষেত্রে এগিয়েছে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের নারীরা অনেক ক্ষেত্রে এগিয়েছে। আমরা বীরের জাতি। মেধা, বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে পারবো। আর এই এগিয়ে যাওয়া পথে হাতে হাত রেখে নারী-পুরুষকে চলতে। একজনকে পিছনে রেখে অন্যজন এগিয়ে গেলে আমাদের উন্নতি হবে না। নারীদের উন্নয়নে আমরা চেষ্টা করছি। আর চেষ্টা করতে হবে।’
এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটি (ক্যাম্পস)। এটা তাদের ১৩তম বৈঠক। ১৪ বছর আগে ক্যাম্পস যাত্রা শুরু করে। বেসরকারি এ সংস্থাটি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কিডনি রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছে।


 

/আরজে/এইচআই/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যা বললেন আরাঘচি
কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যা বললেন আরাঘচি
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম