শাঁখারীবাজারে দোল পূর্ণিমার হোলি উৎসবে কলেজ শিক্ষার্থী রওনক হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ ঘটনার চারদিন পর পাঁচ আসামিকে গ্রেফতার করা গেলেও মূল পরিকল্পনাকারীসহ বাকি আসামিদের গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তবে গ্রেফতার পাঁচ আসামির মধ্যে চারজন এরই মধ্যে রিমান্ড শেষে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় তারা।
গত ১ মার্চ দুপুর ১২টার দিকে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার এলাকায় হোলি উৎসবে ভিড়ের মধ্যেই ছুরিকাঘাতে নিহত হয় রওনক হোসেন রনো (১৭)। পরে ৫ মার্চ রাতে রিয়াজ আলম ওরফে ফারহান, ফাহিম আহম্মেদ ওরফে আব্রো, ইয়াসিন আলী, আল আমিন ওরফে ফারাবী খান ও মায়শা আলম ওরফে লিজা আক্তারকে গ্রেফতার করে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি চাকুও উদ্ধার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় ৭ মার্চ।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, রিমান্ড শেষে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আসামি ফারহান, আব্রো, ফারাবী খান ও লিজা আক্তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এতে ওই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছাড়াও আরও ১০ থেকে ১২ জনের জড়িত থাকার তথ্য উঠে এসেছে। তাদের গ্রেফতার করতে অভিযান চলছে।
চার আসামির জবানবন্দি দেওয়ার কথা জানিয়ে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবিএম মশিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গ্রেফতার চার আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তারা রওনক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য থেকে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ছাড়াও হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত অনেকের নাম এসেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম-পরিচয় এখনই প্রকাশ করা যাচ্ছে না।’
জবানবন্দিতে যা আছে
আসামি লিজা আক্তার ওরফে মায়শা আলম তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছে, তার সঙ্গে রওনক সম্পর্ক ছিন্ন করায় সে কষ্ট পায়। হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী তাকে জানায়, রওনককে একটু শায়েস্তা করতে হবে। ওকে হোলি উৎসবে ডাকতে বলে। পরে লিজা ১ মার্চ সকালে রওনককে ফোন করে শাঁখারীবাজারে হোলি উৎসবে আসতে বলে। সেখানে লিজাও উপস্থিত ছিল। রওনক তার বন্ধুদের নিয়ে শাঁখারীবাজার শনি মন্দিরের সামনে গেলে লিজা তাকে ডেকে পাশের গলির সামনে নিয়ে যায়। তখন ২০ থেকে ২৫ জন রওনকের ওপর হামলা করে। লিজার দাবি, ওই সময় রওনককে হত্যা করা হবে বলে তার জানা ছিল না।
রিয়াজ আলম ওরফে ফারহান তার জবানবন্দিতে উল্লেখ বলেছে, রওনককে মারধর ও আহত করতে মূল পরিকল্পনাকারীর সঙ্গে তারা শাঁখারীবাজার কেএফসি রেস্টুরেন্টের সামনে দেখা করে। সেখানে তাদের চারজনের কাছে চারটি ছুরি দেওয়া হয়। সরাসরি রওনক হত্যায় জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে ফারহান।
ফাহিম আহম্মেদ ওরফে আব্রো এবং আল আমিন ওরফে ফারাবী খানও হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। তারা হত্যার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল বলে জানায় জবানবন্দিতে।
হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে পুলিশ ও নিহতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিহত রওনকের সঙ্গে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীর দীর্ঘদিন ধরে কিছু বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল। একটি মোবাইল ফোন নিয়ে রওনকের সঙ্গে তার ঝামেলা হয়। এ ছাড়াও অর্থ সংক্রান্ত বিষয় এবং প্রেম নিয়েও ঝামেলা হয় তাদের। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি তাদের ঝামেলা বড় আকার ধারণ করে। এর ধারাবাহিকতায় ১ মার্চ সকালে আসামি মায়শা আলমের সহায়তায় রওনককে শাঁখারীবাজারে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী মারধর ও ছুরিকাঘাতে রওনককে হত্যা করা হয়।
আরও জানা যায়, মায়শার সঙ্গে রওনকের একসময় প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর অন্য আরেক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে রওনক। ওই মেয়েকে অন্য এক ছেলে পছন্দ করত। রওনকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠায় মেয়েটির ওপর সেই ছেলে ক্ষুব্ধ হয়। এ নিয়ে রওনক ও ওই ছেলের মধ্যে একাধিকবার কথাকাটাকাটি ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে। তারা একে অন্যকে হত্যার হুমকিও দিয়েছে। তবে এ হত্যার ঘটনায় মেয়েটির কোনও সংশ্লিষ্টতা পায়নি পুলিশ।
পুলিশ বলছে, রওনককে হত্যার পরপরই মূল পরিকল্পনাকারী পালিয়েছে। তার বাসায় একাধিকবার অভিযান চালানো হয়। হত্যাকারীর পিতা ও ভাই এখন পলাতক রয়েছেন। তাদের আত্মীয়-স্বজনদের বাসায়ও তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রওনক হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ঘটনার পরপরই ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে গেলেও তাকে শনাক্ত করা গিয়েছিল। দুদিন আগে তার ঢাকায় আসার কথা ছিল। কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর দেখে সে তার পরিচিত সবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। তবে তাকে গ্রেফতার করতে পুলিশের একাধিক টিম ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলায় অভিযান পরিচালনা করছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
কোতোয়ালি থানার ওসি মশিউর রহমান বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে আমাদের হাতে পাওয়া সব তথ্য প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তবে ১০-১২ জন আসামি পলাতক আছে। তাদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
আরও পড়ুন-
ডিএমপি’র ৪ উপ-পুলিশ কমিশনারের বদলি
দুই যুগেও শেষ হয়নি শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মামলা








