মশার উপদ্রবে অতিষ্ট নগরবাসী। বস্তি থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি, অফিস- আদালত সবখানেই মশার উৎপাত। মশার কারণে চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গুসহ নানা রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তো আছেই। এ অবস্থায় মশানিধনের দায়িত্বে থাকা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের ব্যর্থতাকে দায়ী করে এর দায়িত্ব নিয়েছিলেন কাউন্সিলররা। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা তা পালন করছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী। করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট দফতরেও দেখা দিয়েছে অসন্তুষ্টি।
গত বছরের জুনে নগরজুড়ে মশাবাহিত চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়ার পর মশকনিধনকর্মীদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার দাবি জানান কাউন্সিলররা। সে সময় তারা বলেছিলেন, ‘আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। যেকোনও দুর্ভোগের জন্য আমরা জনগণের কাছে জবাবদিহি করি। কর্মকর্তাদের দুর্নীতির দায় আমরা নেবো কেন? তাদের কারণেই নগরবাসী মশার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না। পরিচ্ছন্নকর্মীদের মতো মশকনিধনকর্মীদের দায়িত্বও আমরা নেবো। কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ নিয়ন্ত্রণের পুরো দায়িত্ব আমাদের তত্ত্বাবধানে দেওয়া হলে নগরীতে মশার উপদ্রব থাকবে না।’
কাউন্সিলদের এমন দাবির পর ওই বছরের ৫ জুলাই মশানিধনের সব দায়িত্ব দেওয়া হয় কাউন্সিলরদের হাতে। কথা ছিল প্রতিদিন ওয়ার্ডের মশকনিধনকর্মীরা ওয়ার্ড কার্যালয়ে হাজির হয়ে ওষুধ ও যন্ত্র নিয়ে বের হবেন। কাজ শেষে আবার কাউন্সিলদের কাছে হাজিরা দিয়ে যাবেন। কিন্তু ভোর ৫টায় ওয়ার্ড কার্যালয়ে কর্মীরা হাজির হলেও কাউন্সিলর বা কাউন্সিলর কার্যালয়ের কাউকে পাওয়া যায় না। ফলে কর্মীরা প্রায়ই পড়েন বেকায়দায়। দায়িত্ব নিয়ে কাজ না করায় করপোরেশনের মশানিধন কাজে গতি ফিরছে না। ফলে এ বছরে মশার উপদ্রব আরও বেড়েছে। এ অবস্থায় সেই দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে সংস্থার আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোকে।
সম্প্রতি মশা বিষয়ে সচেতন না হলে দণ্ড দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। এ অবস্থায় সম্প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি ফাইল পাঠিয়েছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ। এতে বলা হয়েছে, ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাৎসরিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাঁচটি অঞ্চলের ৫৭টি ওয়ার্ডে মশানিধন পরিচালিত হয়ে থাকে। প্রতিটি ওয়ার্ডে চার থেকে ছয় জন মশকনিধনকর্মী সকালে লার্ভিসাইডিং (Larviciding) এবং বিকালে ফগিং (Fogging) কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিন-চার দিন অন্তর একই স্থানে কীটনাশক দেওয়া হয়। মাঠপর্যায়ে এই কার্যক্রম করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মশক সুপারভাইজার, স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা তত্ত্বাবধান করেন।’
এতে বলা হয়, ‘মশকনিধনকর্মীদের এই কার্যক্রম সুচারুভাবে বাস্তবায়নের জন্য গত বছরের ৫ জুলাই দক্ষিণ সিটি এলাকার জন্য কাউন্সিলরদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু তা আজ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। এরপরও আঞ্চলিক কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ওয়ার্ডের পরিধিভেদে চার থেকে ছয় জন মশককর্মী খুবই কম। ইতোমধ্যে ডিএসসিসি’র প্রতিটি ওয়ার্ডে মশকনিধনকর্মী ১০ জনে উন্নীত করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’ প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও দৃশ্যমান হবে বলে মনে করছেন তারা। অন্যদিকে ডিএনসিসি-ও মশানিধনে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম পরিচালনাসহ তাদের কর্মী বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটির সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র ও জ্যেষ্ঠ কাউন্সিলর আবু আহমদ মন্নাফি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের অনেক দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমরা সে দায়িত্ব পালনও করি। কিন্তু দায়িত্বটা এমনভাবে দেওয়া হয় যেটা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এমন অবস্থা চলছে কেউ কারো কথা শোনে না। এজন্য স্বাস্থ্য বিভাগই দায়ী। তারা মানহীন ওষুধ কেনে। এই ওষুধ নিয়ে মাঠে গেলে মশা যে মরে না তা জনগণ উদাহরণসহ আমাদের বুঝিয়ে দেয়। সেই দায়ভারও আমাদের নিতে হয়। তাহলে কাজ করবো কীভাবে? এরপরও আমরা মশানিধনের কাজ সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। অনেক প্রোগ্রাম করেছি। নগরবাসীকে সচেতন করেছি। আমাদের অবহেলা রয়েছে, তা ঠিক নয়।’
মশানিধন কাজে কাউন্সিলরদের না পেয়ে ক্ষোভ রয়েছে নগরবাসীর মনে। সম্প্রতি মেয়র সাঈদ খোকনের ‘জনতার মুখোমুখি জনপ্রতিনিধি’ অনুষ্ঠানে অনেক অভিযোগ করেন নগরবাসী।
দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা ও স্কুলশিক্ষক সিরাজুম মুনিরা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কে তাও ঠিকমতো বলতে পারবো না। শুধু আমি নই, আমার মতো অন্যরাও তা জানে না। কারণ নির্বাচিত হওয়ার পর কোনও কাউন্সিলর সেভাবে নগরিকদের সেবায় মনোনিবেশ করেননি। গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পারি, মশা মারার জন্য কাউন্সিলরদের প্রধান করা হয়েছে। প্রতিদিন সকালে ঘুরতে বের হই, কিন্তু কোনও কউন্সিলরকে দেখি না।’ দায়িত্ব নিয়ে বসে থাকলে জনসেবা হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কড়াইল বস্তির বাসিন্দা রফিক মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ভোটের আগে সবাই আমাদের বস্তি থেকে ওয়ার্ক শুরু করে। কিন্তু ভোটের পর বাসা বা অফিসে গিয়েও তাদের দেখা পাই না। বহুদিন বলেছি আমাদের বস্তিতে যাতে একটু ওষুধ ছিটানো হয়। কিন্তু আমাদের কথা কেউ শোনে না। কাউন্সিলরদের বললে তারা বলেন, ‘যারা ওষুধ দেয় তাদের বলো।’”
দুই সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার মশা নিধনের দায়িত্ব মশক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের। কিন্তু এই দফতরের ব্যর্থতার পর এ কাজ চলছে যৌথভাবে। অধিদফতরের মোট জনবলের সঙ্গে দুই সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের কিছু জনবল যুক্ত হয়েছে নগরীর মশানিধনের কর্মসূচিতে। কিন্তু তাতেও কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না।
জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সালাহউদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কাউন্সিলরদের যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারা তা পালন করছেন না। ফলে আগের মতোই আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে মশকনিধন কাজ পরিচালিত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটা নোট দিয়েছি। আশা করি, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনা করবেন।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ওসমান গনি অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সব কাজেই কাউন্সিলরদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ভোরে সব কাউন্সিলদের না পাওয়া গেলেও তারা বিষয়টি মনিটরিং করছেন। তবে দাফতরিক কাজ করপোরেশনের নিয়ম অনুযায়ীই হচ্ছে।’
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কাউন্সিলর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভোর ৫টা থেকে মশকনিধনের কর্মীরা কাজ শুরু করেন। তখন কাউন্সিলররা ঘুমে থাকেন। তাদের পক্ষে প্রতিদিন ভোরে এই কাজ তদারকি করা সম্ভব নয়। আর যেসব কাউন্সিলরদের দাবির কারণে সিটি করপোরেশন মশকনিধন কাজ কাউন্সিলদের দিয়েছে, খোদ তারাই সেই দায়িত্ব পালন করছেন না।’








