ঝলসে গেছে মুখের ডান পাশ। পুড়ে গেছে ডান চোখটাও। গলা-ঘাড়সহ বুক ও পিঠের কিছু অংশও ঝলসে গেছে। মুখ ঝলসে যাওয়ায় ফুলে গেছে এর ভিতরের মাংস। দুর্বৃত্তের ছুড়ে মারা এসিডে পোড়া শরীর নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের শয্যায় কাতরাচ্ছেন গৃহবধূ আকলিমা খাতুন। এসিডে কেবল মুখ ও শরীরই ঝলসে যায়নি তার, একইসঙ্গে থমকে গেছে জীবনও।
মঙ্গলবার (৩ এপ্রিল) ঢামেক হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয় আকলিমাকে। গত সোমবার (২ এপ্রিল) রাজধানীর হাজারীবাগ ঝাউচড় এলাকায় আকলিমা খাতুনের মুখে এসিড ছুড়ে মারে এক দুর্বৃত্ত।
তার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আকলিমার স্বামীর নাম জোবায়ের হোসেন। এ দম্পতির জান্নাত ও জুনায়েদ নামে দুই সন্তান রয়েছে। ছেলেমেয়ে দুটি সারাক্ষণ মায়ের পিছু পিছু ঘুরতো। এসিডে ঝলসে মুখ বীভৎস হয়ে যাওয়ায় মায়ের কাছে ঘেঁষতে এখন ছেলেমেয়ে দুটি ভয় পাচ্ছে।
আকলিমার বোন রাশেদা বেগম আমেনা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেক বছর আগে ওর (আকলিমা) একটা প্রেম হইছিল, দেলোয়ার নামে একজনের সঙ্গে। আমরা সেইটা মানিনি। ওর আলাদা জায়গায় বিয়্যা দিসি। পরে ওই ছেলে (দেলোয়ার) সুমি নামে একজনকে বিয়ে করেছে, তাদের দুইটা সন্তানও আছে। বোনরে বিয়ে দিসি, ওরও দুইটা বাচ্চা আছে। হঠাৎ এমন একটা কিছু হয়ে যাবে, আমরা ভাবি নাই।’
রাশেদা বেগম আমেনা জানান, এসিড নিক্ষেপের পেছনে দেলোয়ারের কোনও হাত নেই বলেই তারা মনে করেন। তবে তাদের সন্দেহ, এর পেছনে দেলোয়ারের স্ত্রী সুমির হাত আছে।
রাশেদা বেগম আমেনা বলেন, ‘দেলোয়ারকে আমরা সন্দেহ করি না। গতকালও দেলোয়ার ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করেছে। বলেছে, ওর সাথে তো আমার কোনও যোগাযোগই নাই। যার যার সংসার নিয়ে আমরা ব্যস্ত।’
অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে রাশেদা বেগম আমেনা বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত কাজটা সুমিই করেছে। গত পরশু সে ইশারায় একটা লোককে আকলিমাকে দেখাইসে। আকলিমা আবার এই কথা বাসায় যাইয়্যা ভাবিদের বলেছে। ভাবিদের সাথে আলোচনা করেছে।’
আকলিমা খাতুনের ভাগ্নি আইরিন আক্তার বলেন, ‘এমন ঘটনায় আমরা হতবাক, ভীতও। শুধু আমরা ভীত নই, ভীত খালার (আকলিমা) ছেলেমেয়ে দুটোও। তারা তাদের মায়ের কাছে যেতেই ভয় পাচ্ছে। এসিড আক্রান্তের কথা স্কুলে বইতে পড়েছি। দুয়েকবার এর প্রতিবাদে র্যালিতেও গিয়েছি। এখন আমাদের পরিবারে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল, যা কখনও ভাবতেও পারিনি।’
একই কথা জানায় আকলিমা খাতুনের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ভাগ্নি আয়শা আক্তারও। সে বাংলা ট্রিবিউনকে বলে, ‘জান্নাত অনেক ভয় পেয়েছে। ও কারও সাথে কথা বলে না। ও শুধু এখন মামির কাছে থাকে।’
আকলিমার স্বামী জোবায়ের হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওর চোখের অবস্থা বেশি খারাপ। চোখের পাশটা পুড়ে গেছে। চিকিৎসকেরা বলেছেন ওর চোখ ঠিক হবে না। তবে তারা ওষুধ দিয়েছেন। ওর চোখ এখন ফুলে আছে। ক্ষত না শুকানো পর্যন্ত চোখের অপারেশনে যেতে পারবেন না চিকিৎসকেরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে ছেলে আমার স্ত্রীর মুখে এসিড ছুড়েছিল, তাকে পুলিশ এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি। সুমি ইশারায় দেখিয়ে দেওয়ায় সে (দুর্বৃত্ত) আমার স্ত্রীকে চিনে রেখেছিল। সে এসিড ছুড়ে মারার আগেই তাকে আমার স্ত্রী দেখে ফেলেছিল। তদন্তে আসার পর পুলিশকে এসব বলেছে আমার স্ত্রী। এরপর পুলিশ সুমিকে গ্রেফতার করেছে। আজ তাকে রিমান্ডে পাঠিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সোমবার (২ এপ্রিল) সকালে বাসা থেকে পাঁচ বছরের মেয়েকে নিয়ে হাজারীবাগ ঝাউচড় শাহজাহান মার্কেটের পাশ দিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় এক যুবক আকলিমাকে পাশ থেকে এসিড ছুড়ে মারে। আকলিমার চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসলে ওই যুবক পালিয়ে যায়।’
ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিট অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শংকর পাল বলেন, ‘আকলিমার ডান চোখ, গলা ও ঘাড়সহ শরীরের আরও কিছু অংশ ঝলসে গেছে। সব মিলিয়ে তার শরীরের পাঁচ শতাংশ বার্ন হয়েছে।’








