নির্ঘুম গাড়ি চালনায় ঈদযাত্রায় ঝরছে প্রাণ

শাহেদ শফিক
১৮ জুন ২০১৮, ১১:৫৮আপডেট : ১৮ জুন ২০১৮, ১৪:১২

সোমবার (১৮ জুন) সকালে ঠাকুরগাঁওয়ে বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ নীলফামারীর সৈয়দপুরে ঈদের পরদিন রবিবার (১৭ জুন) রাত সাড়ে ১০টার দিকে পিকআপ ও বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ৮ জন। এর আগে একই দিনে ঠাকুরগাঁও, টাঙ্গাইল, নোয়াখালী ও কুমিল্লায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন আরও ৯ জন। নিহত ও আহত ব্যক্তিরা ঈদ উপলক্ষে কেউ স্বজনের কাছে যাচ্ছিলেন, আবার কেউবা ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরছিলেন।

প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরেন কর্মজীবী মানুষেরা। কিন্তু কখনও কখনও এই আনন্দের যাত্রা হয়ে ওঠে বেদনাময়। প্রতিবছরই ঈদযাত্রায় অসংখ্য মানুষ লাশ হয়ে ফেরেন প্রিয়জনের কাছে। এসব দুর্ঘটনার জন্য সড়কের দুরবস্থা, যানবাহনের ত্রুটির পাশাপাশি চালকদের অদক্ষতা ও নির্ঘুম গাড়ি চালানোকেই বেশি দায়ী করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনা রোধে চালককে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। বাসচালকদের অভিযোগ—দীর্ঘ রুটে গাড়ি চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর পরপরই কোনও বিশ্রাম ছাড়া ফিরতি পথের (রিটার্ন) গাড়ি চালাতে তাদের বাধ্য করেন মালিকরা। এ কারণে অনেক সময় চালকরা বাসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন, প্রাণ দিয়ে যার খেসারত দিতে হয় যাত্রীদের।

চালকদের নির্ঘুম গাড়ি চালানোকে বিশেষ করে ঈদের মৌসুমে ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সেই সঙ্গে আরও যেসব কারণের কথা তারা উল্লেখ করেছেন, সেগুলো হচ্ছে—বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, নিয়ম ভঙ্গ করে ওভারলোডিং ও ওভারটেকিং করার প্রবণতা, ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, আনফিট গাড়ি চলাচল বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক নিয়োগ, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও সড়কের বেহাল দশা, গাড়ি চালোনার সময় চালকের মোবাইল ফোনে কথা বলা, হেয়ালিপনা, ফাঁকা রাস্তা পেয়ে প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি চালানো, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন না মানা, ফুটপাত দখলে থাকা, রাস্তার নির্মাণ ত্রুটি, যাত্রীদের অসতর্কতা, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জেব্রা ক্রসিং না থাকা ও তা না মানা, নির্ধারিত গতিসীমা অমান্য করা এবং ধারণ ক্ষমতার চেয়ে ঈদের সময়ে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা ইত্যাদি।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে—এবারের ঈদযাত্রার বহরে ৫ কোটি যাত্রীকে ১৫ কোটি ট্রিপ নিতে হয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা থেকে ১ কোটি ১৫ লাখ ও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অন্য জেলায় আরও প্রায় ৩ কোটি ৮৫ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেন। সব মিলিয়ে ঈদের আগে ও পরে ৬ দিনে প্রায় ১৫ কোটি ট্রিপ যাত্রী ছিল। এই বিশাল যাত্রীর চাপ সামাল দেওয়ার মতো গণপরিবহনের ব্যবস্থা দেশে নেই। সেজন্যই চালক ও যানবাহনের ওপর অতিরিক্ত চাপ বাড়ে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির দেওয়া তথ্যে জানা যায়, গত ঈদুল ফিতরে সারা দেশে ২০৫টি দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন যাত্রী নিহত হন। আহত হয়েছেন ৮৪৮ জন। এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ছিল চালকদের নির্ঘুম গাড়ি চালানো।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঈদে প্রতিটি পরিবহনে যাত্রীদের ব্যাপক চাপ থাকে। এ জন্য মালিকরা অতিরিক্ত মুনাফার লোভে চালকদের অতিরিক্ত ট্রিপ দিতে বাধ্য করেন। আর যেসব চালক চুক্তিভিত্তিক, তারাও এ কাজটি বেশি করে থাকেন। প্রতিদিন একজন মানুষের যে পরিমাণ সময় বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন, চালকরা তা নেন না। ফলে কিছু দূর গাড়ি চালানোর পর ক্লান্ত হয়ে অনেক চালক ঘুমিয়ে পড়েন। এতে দুর্ঘটনা ঘটে ।’

বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও সড়ক দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মুয়াজ্জেম হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার অনেক কারণের মধ্যে নির্ঘুম গাড়ি চালানো অন্যতম। প্রতিটি চালককে যেকোনও সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি তাদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ দিতে হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব ও ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চালকরা ঘুমানো বা বিশ্রামের সময় পান না—এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আমাদের দূরপাল্লার প্রতিটি গাড়ির জন্য দুজন করে চালক থাকেন। একজন যখন গাড়ি চালান, তখন অন্যজন বিশ্রাম নেন। আর প্রতিটি যানবাহনকেও ট্রিপ শেষে বিশ্রাম দেওয়া হয়। অনেক কোম্পানির বিশ্রামাগার রয়েছে। তবে ছোটখাটো কিছু কোম্পানির বিশ্রামাগার নেই।’

তিনি বলেন, ‘বরং ঈদযাত্রায় দেখা যায় অনেক সময় ঈদের পরের দিন সড়ক অনেকটা ফাঁকা থাকে। তখন ফাঁকা সড়কে হেলপাররাই গাড়ি চালিয়ে থাকে এবং তখনই দুর্ঘটনা ঘটে। আমরা এই দুর্ঘটনারোধে ঢাকার সব টার্মিনালে মালিকদের নিয়ে মিটিং করেছি। চালকদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।’

নোয়াখালীগামী হিমাচল পরিবহনের চালক তাওফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চালকরা বিশ্রাম নিতে চান। কিন্তু সুযোগ কই? ঈদের দুদিন আগে ও পরে অনেক যাত্রী থাকে। কিন্তু সে পরিমাণ গাড়ি নেই। তাই মালিকরা আমাদের টানা গাড়ি চালাতে বাধ্য করেন।’ তবে তিনি জানান, তার কোম্পানির ক্ষেত্রে এমনটা হয় না। তাদের পর্যাপ্ত চালক রয়েছে।

চট্টগ্রামগামী বাস এস আলম পরিবহনের একজন চালক নাম না প্রকাশের শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনও স্টেশনসহ কোথাও আমাদের বিশ্রামের কোনও ব্যবস্থা নেই। মালিকরা এসব নিয়ে একেবারেই ভাবেন না। সড়কেই গাড়ি পার্কিং এবং সেই গাড়িতেই ঘুমাতে হয় চালককে। আর ঈদের আগ মুহূর্তে তো ঘুম বলতে কিছুই নেই।

তার মতে, মহাসড়কে ধীরগতির পরিবহন, যত্রতত্র রাস্তা পারাপার, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অতিরিক্ত গতির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। তাই সড়কে দুর্ঘটনা রোধে এসব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, এবারের ঈদযাত্রায় সড়কপথে ৪৪ হাজার ৩৭৪টি বাস, ২৭ হাজার ৯৬২টি মিনিবাস, ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৬৬০টি প্রাইভেট কার, ২ লাখ ৪৯ হাজার ৯১টি সিএনজি অটোরিকশা, ৯৮ হাজার ১৭৫টি মাইক্রোবাস, ২১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৫৯টি মোটরসাইকেল, ৫৪ হাজার ৪৩৭টি জিপ, ১৭ হাজার ৫১৬টি হিউম্যান হলার, ২০ হাজার ৪২২টি অটোটেম্পু , ৭৩ লাখ প্যাডেল চালিত রিকশা ও ১৫ লাখ ব্যাটারি চালিত রিকশা রয়েছে। যা মোট যাত্রী পরিবহনের তুলনায় অনেক কম। এই সংকটের মধ্যেই যাতায়াতের বহর সামাল দিতে হয় চালকদের। যে কারণে তাদের ওপরে অতিরিক্ত ট্রিপের চাপ বাড়ে।

 আরও পড়ুন: 

সৈয়দপুরে পিকআপ-বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ১১

ঠাকুরগাঁও‌য়ে বাস-ট্রা‌কের মু‌খোমু‌খি সংঘ‌র্ষে নিহত ১, আহত ৩০

 

 

/এপিএইচ/চেক-এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম