দুর্ঘটনা কবলিত একটি বাস থানায় নিতে গিয়ে সেই গাড়ির নিচে চাপা পড়ে নিহত হয়েছেন রূপনগর থানার তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) উত্তম কুমার সরকার (৩৪)। প্রশ্ন উঠেছে বাসটির ফিটনেস নিয়ে। পুলিশ কর্মকর্তা ও চালকের বক্তব্য অনুযায়ী, বাসটির ব্রেক ঠিকমতো কাজ করছিল না। প্রশ্ন উঠেছে, ত্রুটিপূর্ণ একটি গাড়িকে রেকার না লাগিয়ে কেন চালককে দিয়ে চালিয়ে থানায় নিচ্ছিল গাড়িটি? পুলিশ কর্মকর্তাদের উত্তর, ‘এই সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন এসআই উত্তম নিজেই।’
গত ২৯ আগস্ট দায়েরকৃত একটি অভিযোগের ভিত্তিতে ঈগল পরিবহনের একটি বাস জব্দ করে রূপনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) উত্তম কুমার (৩৪)। জব্দকৃত বাসটি থানায় আনতেই রবিবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঘটনাস্থলে যান তিনি। বাসটি থানায় আনার সময় বাসের সামনে সামনে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন এই উপপরিদর্শক। শাহ আলী থানা এলাকার রাইনখোলা মোড়ে বাসটি তাকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় এবং ঘটনাস্থলেই মারা যান এসআই উত্তম কুমার। রবিবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৪টা ১০ মিনিটের দিকে এ ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পরপরই ঈগল পরিবহনের বাসটি (ঢাকা মেট্রো ব-১৪-৬৮২৮) জব্দসহ চালক বেলাল হোসেন খানকে (৩৮) গ্রেফতার করা করা হয়। ওইদিন রাতেই নিহত উত্তমের ভাই দীপঙ্কর সরকার বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা নং-০৩। আসামি বেলাল হোসেন খান সিরাজগঞ্জ সদরের মৃত হাবিবুর রহমান খানের ছেলে। বর্তমানে মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার পাবনা হাউজ গলির একটি বাসায় ভাড়া থাকেন।
পরিবারের অভিযোগ, বাসচালক ইচ্ছাকৃতভাবেই এসআই উত্তম কুমার সরকারকে চাপা দেয়। এদিকে পুলিশ বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামি জানিয়েছে, বাসটি ব্রেকফেল করেছিল, তাই গতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আসামিকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ঘটনাটি চালকের ইচ্ছাকৃত, নাকি বাসের ব্রেকফেল হয়েছিল, সেটি তদন্তের পর বলা যাবে।’
নিহত উত্তম কুমারের বড় ভাই দীপঙ্কর সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উত্তম পেশাগত দায়িত্ব পালন করতেই জব্দ বাসটি থানায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। চালক যাতে গাড়িটি নিয়ে পালাতে না পারে, সে জন্যই মোটরসাইকেলে করে ওই গাড়িটির সামনে সামনে পাহারা দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু চালক পালাতেই গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয়। এতে গাড়িটি আমার ভাইয়ের ওপরে উঠিয়ে যায়। বাসের চালক ইচ্ছাকৃতভাবেই উত্তমকে গাড়িচাপা দিয়েছে।’
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে এসআই উত্তম কুমারের মরদেহ তার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জব্দকৃত ওই বাসটি যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন মোটরসাইকেলসহ উত্তম কুমার বাসের নিচে চলে যায়। তবে এখানে অন্য কোনও ঘটনা আছে কিনা তা তদন্তের পরই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হবে। এছাড়াও জব্দ বাসটি রেকার দিয়ে না এনে চালক দিয়ে থানায় আনতে কে এসআই উত্তমকে নির্দেশ দিয়েছেন, সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ঈগল পরিবহনের বাসটির ব্রেক ঠিক ছিল না বলেও প্রাথমিক তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি। তবে এই গাড়িটি আসলেই ব্রেকফেল করেছিল কিনা, সেটি খতিয়ে দেখা হবে। এর জন্য বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটিতে (বিআরটিএ) ফিটনেস পরীক্ষার জন্য বাসটি পাঠানো হবে। এর জন্য ঈগল পরিবহনের মালিক পক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এই ঘটনার চারদিন আগে এই বাসটি একটি প্রাইভেট কারকে ধাক্কা দেয়। তবে সেখানে কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ওই সময় এই গাড়িটির চালক কে ছিল, সেটি খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
ডিএমপির দারুসসালাম জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) মো. জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, উত্তম কুমারের মৃত্যুর ঘটনায় চালক গ্রেফতার রয়েছে। আসলে কী কারণে ঘটনাটি ঘটলো সেটি আমরা তদন্ত করছি। পাশাপাশি অন্য কোনও কারণ বা উদ্দেশ্য ছিল কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পুলিশ জানায়, এসআই উত্তম কুমারের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতী থানার পশ্চিম বেতডোবা গ্রামের কর্মকারপাড়ায়। তার বাবার নাম ভজন কুমার সরকার। ২০১৪ সালে বিয়ে করেন তিনি। তার তিন মাস বয়সী কন্যাসন্তান রয়েছে, নাম উপমা সরকার। তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে শ্যামলীতে থাকতেন। দেড় বছর ধরে তিনি রূপনগর থানায় উপপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে তিনি প্রথমে ধানমন্ডি থানা, এরপর মোহাম্মদপুর থানা, আদবার থানা ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০১২ সালে ৩৩তম এসআই ক্যাডেট হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন।








