একবার টাকা দিয়ে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে সুদ-আসল আদায় করেন সুদের কারবারি শামসুজ্জামান সেন্টু। টাকা আদায় করতে গিয়ে অস্ত্রবাজির পাশাপাশি ঋণগ্রহীতার স্ত্রী-সন্তানের ওপর হামলা, রাস্তা থেকে অপহরণ ও গুমের হুমকিও দেয় সেন্টুর লোকজন। ভুক্তভোগীর স্ত্রী-কন্যাকে জিম্মি করার অভিযোগও আছে সেন্টুর বিরুদ্ধে। সরকারের বিভিন্ন দফতর ও পুলিশের কাছে এসব অভিযোগ করেও কোনও প্রতিকার পান না ভুক্তভোগীরা।
সুদের ফাঁদে সব হারিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা মশিউর রহমান
মুক্তিযোদ্ধা মুন্সি মশিউর রহমান বাবু। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন সংস্থার ভাইস চেয়ারম্যান ও শেখ রাসেল মেমোরিয়াল স্পোর্টিং ক্লাবের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক তিনি। সুদের কারবারি শামসুজ্জামান সেন্টুর কাছ থেকে ২০১৪ সালে ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন মশিউর রহমান। এ সময় তিনি ও তার স্ত্রী সেলিনা আক্তার ৯টি ব্ল্যাংক চেক দিয়েছিলেন সেন্টুকে। এছাড়া, সাদা কাগজ ও সাদা স্ট্যাম্পেও স্বাক্ষর করেছিলেন তারা। সুদে আনা টাকা শোধ করতে গিয়ে মশিউর রহমান ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সেন্টুকে ৪৩ লাখ টাকা দেন। এখানেই শেষ নয়, ২০১৫ সালের শেষ নাগাদ ব্ল্যাংক চেকের ভয় দেখিয়ে আরও ৫০ লাখ টাকা দাবি করে সেন্টু। আর সেই টাকা দিতে অস্বীকার করায় মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে চেক ডিজঅনারের তিনটি মামলা করা হয়। মামলা দায়েরের পর অর্ধকোটি টাকার দাবিতে সেন্টু ও তার সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা দারুসসালামের খালেক সিটিতে বসবাসকারী মশিউর রহমানের বাসায় ১২ বার হামলা চালিয়েছে। হামলার সময় তার বাসা থেকে টিভি, ফ্রিজ, ফার্নিচার, স্বর্ণালংকার লুট করা হয়। এমনকি মশিউরের স্ত্রী ও সন্তানরা সন্ত্রাসীদের হাতে লাঞ্ছিত হন। হামলা চলাকালে বারবার পুলিশকে খবর দিলেও কোনও সহযোগিতা পাননি মশিউর ও তার পরিবার।
সেলিনা আক্তার জানান, সেন্টুর কাছে নারী-পুরুষ সবই সমান। তার নির্যাতনের হাত থেকে কেউই রেহাই পায় না।
মুক্তিযোদ্ধা মশিউর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর দফতর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ, পুলিশ সদর দফতর, ডিএমপি (ঢাকা মহানগর পুলিশ) সদর দফতর, র্যাব ফোর্সেস, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবি, অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি, ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ নানা জায়গায় সহায়তা চেয়ে আবেদন করেছি। সব জায়গাতেই আমাদের অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়েছে। আমি ও আমার স্ত্রী কোনও সহযোগিতা পাচ্ছি না।’
রেহাই পাননি বিধবা সেলিমাও
২০০২ সালে মাসে এক লাখ টাকা সুদ দেওয়ার মৌখিক চুক্তিতে শামসুজ্জামান সেন্টুর কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা নিয়েছিলেন গাবতলীর মোটর পার্টস ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ। ২০০৮ সালে মারা যান তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেন্টুকে নগদে এক কোটি টাকা দিয়েছেন শহীদ উল্লাহ। এছাড়া, শাহ আলী মহিলা কলেজ মার্কেটে তার মালিকানাধীন দুটি দোকান ও গাবতলী সিটি করপোরেশন মার্কেটের একটি দোকান লিখে নেন সেন্টু। দোকান তিনটির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। এর বাইরে মো. শহীদ উল্লাহর একটি ফ্ল্যাটও দখলে রেখেছে সেন্টু।
শহীদ উল্লাহর স্ত্রী দারুসসালাম মাজার রোডের বাসিন্দা সেলিমা ভূঁইয়া বলেন, ‘স্বামী মারা গেছেন অনেক আগে। কিন্তু তা মানতে নারাজ সেন্টু। ব্ল্যাংক চেক, সাদা কাগজ আর সাদা স্ট্যাম্পে স্বামীর স্বাক্ষর দেখিয়ে এখনও ৫০ লাখ টাকা দাবি করছে সে। একটি ফ্ল্যাট দখলে রাখার পর এখন আমাদের মাজার রোডের বাসাটিও লিখে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। আমাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। নেতা, পাতি নেতা, সন্ত্রাসী সবাই সেন্টুর সঙ্গে আছে। আমরা অসহায়। সে আমাদের মেরে ফেললেও কিছু হবে বলে মনে হয় না।’
মুক্তিযোদ্ধা মশিউর রহমান বাবু কিংবা বিধবা সেলিমা ভূঁইয়াই কেবল সেন্টুর সুদের ফাঁদে পড়ে অসহায় জীবনযাপন করছেন না, এমন আরও অনেকেই আছেন— যারা মুখ খুলতেও ভয় পান।
উল্লেখ্য, বাংলা ট্রিবিউনে সেন্টুকে নিয়ে ‘সুদের ফাঁদে জীবন’ শিরোনামে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে পুলিশ গত মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুর থেকে তাকে গ্রেফতার করে।
আরও পড়ুন:
মিরপুরের সুদের কারবারি সেন্টু একদিনের রিমান্ডে
মিরপুরে সুদের কারবারি সেন্টু গ্রেফতার
জীবন যাবে, তবু সুদ-আসল কোনোটাই শোধ হবে না
যেভাবে সুদের ফাঁদে ফেলেন সেন্টু








