সুদের কারবারি শামসুজ্জামান সেন্টু নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে দাবি করেছেন প্রতারিতরা। শুধু মিরপুরেই তার রয়েছে পাঁচটি বাড়ি। মানিকগঞ্জে সাত বিঘা জমির ওপর একটি বাগানবাড়ি আছে তার। চিড়িয়াখানা এলাকায় আছে প্রায় ১২ বিঘা জমি। মিরপুরে মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটে ১১টি দোকানের মালিক তিনি। প্রধানমন্ত্রীর দফতর, পুলিশ সদর দফতর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, থানা-পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি দফতরে সেন্টুর বিচার দাবি করে দেওয়া অভিযোগপত্রে আরও বাড়ি, জমি, ফ্ল্যাট বেদখলে রাখার তথ্য মিলেছে।
কে এই সেন্টু
১৯৮৪ সালে রাজধানীর গাবতলীতে নির্মিত হয় বাস টার্মিনাল। স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ার সূত্র ধরে এই টার্মিনালই সুদের কারবারি শামসুজ্জামান সেন্টুকে অর্থ রোজগারের নতুন দিশা দেয়। সেই সময়ের ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় রাতারাতি মুদির দোকানি থেকে বাসের মালিক বনে যান তিনি। ১৯৮৫ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত টানা যাত্রীসেবা বাস মালিক সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সেন্টু। আর তার সুদের কারবারও শুরু হয় ১৯৮৫ সাল থেকে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় ৩৩ বছর ধরে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় সুদের কারবার চালাচ্ছেন শামসুজ্জামান সেন্টু। এ সময়ে ঠিক কতজন মানুষ সেন্টুর সুদের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে সেন্টুর সুদের ফাঁদে পড়ে ২০০ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সন্ধান মিলেছে। মনসুর আলী নামে এক ক্ষতিগ্রস্ত সুদের টাকা পরিশোধ করতে সেন্টুর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে একবার ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়েছিলেন। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে এই একজনের কাছেই শুধু একটি প্রমাণ রয়েছে। অন্যদের কাছে কোনও প্রমাণ নেই।
মিরপুরের দারুসসালাম থানার ২১৫/১ বাগবাড়ী, বাজারপাড়ার স্থায়ী বাসিন্দা সেন্টু। বাবার নাম মৃত আবুল হাশেম বেপারী। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ তিনি। সেন্টু ২ মেয়ে ও ১ ছেলের জনক। তার বাবা হাশেম বেপারী বড়বাজার এলাকার মুদি দোকানি ছিলেন। সেই দোকানেই কর্মজীবন শুরু হয়েছিল সেন্টুর।
অন্যের জমি দখলের মামলায় ১০ মাস জেলে থাকতে হয়েছে সেন্টুকে। গত বছর সাভারের মোগরাকান্দা গ্রামে জমি দখল করতে গিয়ে গণপিটুনির শিকার হন। লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে অন্যের ওপর হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সেন্টুর সখ্য
অনুসন্ধানে জানা যায়, আশির দশকে উত্থান শুরু হয় সেন্টুর। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত যতগুলো সরকার ক্ষমতায় এসেছে, আর যারা মিরপুরের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তাদের সবার সঙ্গেই সখ্য সেন্টুর ছিল এবং এখনও আছে।
সেন্টুর নামে অর্ধশত মামলা
২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রাতে দারুসসালাম রোডের এপেক্স শোরুম ও মুক্তি প্লাজার সামনে নিউ পল্লবী এক্সপ্রেস ও প্রজাপতি পরিবহন নামে দুটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। একই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি দারুসসালাম থানার মাজার রোডে এবি ব্যাংকের সামনে একটি মিনিবাসে আগুন দেয় সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় তিনটি মামলা দায়ের করা হয়, যার আসামি শামসুজ্জামান সেন্টু। জানা গেছে, সেন্টু প্রায় অর্ধশত মামলার আসামি। নাশকতা চালিয়ে রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধনের অভিযোগে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫(৩) এবং ২৫-ঘ ধারায় এই মামলাগুলো দায়ের হয়েছে।
প্রতারিতদের নামে সেন্টুর মামলা
সুদে টাকা দেওয়ার আগে শামসুজ্জামান সেন্টু প্রতারিতদের কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেক রেখে দেন। পরে সুদ-আসল আদায়ের পর ব্ল্যাংক চেকে টাকার অংক বসিয়ে চেক ডিজঅনারের মামলা করেন। বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে এমন ১৯টি মামলার তথ্য মিলেছে।
থানা-পুলিশ মামলা নেয় না
সুদের কারবারি শামসুজ্জামান সেন্টুর প্রতারণার শিকার হয়েছেন যারা, তাদের বেশিরভাগই মিরপুরের দারুসসালাম এলাকার বাসিন্দা। এ কারণে প্রতারিতরা দারুসসালাম থানা পুলিশের কাছেই অভিযোগ করেন। প্রতারিতদের কয়েকজন মনসুর আলী, মশিউর রহমান স্বপন, মুন্সী মশিউর রহমান, আব্দুর রহমান বাংলাট্রিবিউনকে বলেন, ‘থানা পুলিশ কখনও সেন্টুর বিরুদ্ধে মামলা নেয়নি। বলা হয়েছে, সেন্টুকে গ্রেফতার করা গেলে মামলা নেওয়া হবে। মামলার পরিবর্তে নেওয়া হয়েছে সাধারণ ডায়েরি। আর এই সাধারণ ডায়েরি তদন্ত হয়েছে, অথবা সেন্টুর স্থায়ী ঠিকানায় কখনও অভিযান হয়েছে, এমন কোনও তথ্য নেই। ’
প্রতারিত মনসুর আলী বলেন, ‘মিরপুর এলাকার সবাই জানে সেন্টুর সঙ্গে পুলিশের বিশেষ সখ্য আছে। আর পুলিশকে নিয়মিত মাসোহারা দেন তিনি।’
দারুসসালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য
দারুসসালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ সেলিমুজ্জামান প্রতারিতদের অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা প্রতারকের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি করতে চেয়েছে, তাই মামলা নেওয়া হয়নি।’
সেন্টুর বক্তব্য মেলেনি
সেন্টুর বাসায় দফায় দফায় যোগাযোগ করে তার দেখা মেলেনি। তিনি যে দুটি মুঠোফোন নম্বর ব্যবহার করেন—যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে সেই নম্বর দুটোতে, পাঠানো হয়েছে এসএমএস। কিন্তু সাড়া দেননি সেন্টু।
আইনজীবীর বক্তব্য
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘সুদের ব্যবসা করা এবং সুদে টাকা নেওয়া— দুটোরই আইনগত বৈধতা নেই। তারপরও মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে সুদের কারবারির শরণাপন্ন হয়। এটি এমন একটি বিষয়, যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের কাছে সুদের টাকা নেওয়া এবং পরিশোধ করার কোনও দালিলিক প্রমাণ থাকে না। উপরন্তু, ব্ল্যাংক চেক, জমি বা সম্পদের দলিল সুদের কারবারির কাছে রাখতে হয়। এসব কারণে আইনগত দিক থেকে সুদের কারবারি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীই শুধু ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করতে পারে। তারা আন্তরিকভাবে তদন্ত করলে সুদের কারবারিরা আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বাধ্য।’
আরও পড়ুন-
জীবন যাবে, তবু সুদ-আসল কোনোটাই শোধ হবে না
যেভাবে সুদের ফাঁদে ফেলেন সেন্টু
‘নেতা, পাতি নেতা, সন্ত্রাসী সবাই আছে সেন্টুর সঙ্গে’
মিরপুরে সুদের কারবারি সেন্টু গ্রেফতার
মিরপুরের সুদের কারবারি সেন্টু একদিনের রিমান্ডে








