সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দোতলা। সিঁড়ির গোড়া থেকেই দীর্ঘ লাইন। শেষ মাথায় তাকালে দেখা যাবে ওপরে লেখা— ‘ডেঙ্গু টেস্ট রিপোর্ট’। সামনে এগোতেই দেখা যায় একটি টেবিলের ওপরে অনেক খাম রাখা। টেবিলের ওপাশে সাদা অ্যাপ্রোন পরা ৩ জন বসে আছেন। সামনে থেকে একজন যার নাম ধরে ডাকছেন আর তিনি লাইন থেকে এসে রিপোর্ট নিয়ে যাচ্ছেন। তবে যিনি নাম ধরে ডাকছেন তিনি চিকিৎসকের সাদা অ্যাপ্রোন পরা নন, তার গায়ে রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকের পোশাক।
তিনি একা নন, রেড ক্রিসেন্টের আরও স্বেচ্ছাসেবক হাসপাতালটিতে কাজ করছেন। কেউ লাইন ঠিক করে দিচ্ছেন, কেউ রিপোর্ট বুঝিয়ে দিচ্ছেন, কেউবা রোগীকে সঠিক চিকিৎসকের কক্ষে পৌঁছে দিচ্ছেন। প্রয়োজনে রোগীকে হুইল চেয়ারে বসানো বা ট্রলি নিয়ে যেতেও সাহায্য করছেন তারা। এ চিত্র গত বৃহস্পতিবারের (৮ আগস্ট)।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসক, প্যাথোলজিস্টসহ সবার কাজের সুবিধা করে দিচ্ছে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির এসব সদস্য। তারা জানালেন, এই হাসপাতাল ছাড়াও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, বারডেম হাসপাতাল ও হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে রোগীর চাপ সামলাতে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছেন। এতে চিকিৎসক-নার্সসহ সবার চাপ অনেকটাই কমেছে।
জানা গেলো, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কাজ করছেন ১ শিফটে ৬ জন। বিএসএমএমইউতে ২ শিফটে আছেন ৪ জন করে আর হলি ফ্যামিলিতে ৬ জন করে ২ শিফটে।
হাসপাতালে নিচতলায় একদল কিশোর কাজ করছিল। তাদেরই একজন আলী আহমেদ। এবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজ থেকে। রেড ক্রিসেন্টের সঙ্গে আছেন ২ বছর ধরে। কেমন লাগে কাজ করতে জানতে চাইলে আলী আহমেদ বলেন, ‘মানুষের উপকারে কাজ করি; এর চেয়ে বড় ভালো লাগা আর কিছু নেই। প্রতিদিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতায় হয় জীবনে— এটাও উপভোগ্য।’
রিপোর্ট ডেলিভারি দিচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে এলে মানুষ যে কত অসহায় থাকে সেটা আগেও বুঝতাম, কিন্তু এবারে রোগীদের কষ্ট, তাদের প্রয়োজন বুঝতে পেরেছি।’ এটাকে জীবনের জন্য অন্যতম লার্নিং বলে মনে করেন তিনি।
এই দলের আরেক সদস্য সাইফুল ইসলাম কাজ করছিলেন হাসপাতালের দ্বোতলায়। ব্লাড রিপোর্ট দিচ্ছেন তিনি। ততক্ষণে ১ হাজার মানুষের রিপোর্ট দিয়েছেন জানিয়ে সাইফুল বলেন, ‘কিন্তু তারপরও লাইন শেষ করতে পারছি না। মাঝে মাঝে অসহায় লাগে… আমরা অনেকেই কাজ করছি, কিন্তু লাইন শেষ হচ্ছে না।’
গত ২ আগস্ট থেকে এই দলটি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে কাজ করছে বলে জানান হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘বাচ্চা বাচ্চা ছেলে-মেয়েগুলো এখানে যে কী পরিমাণ কাজ করছে, সেটা দেখার মতো! ওরা আসায় আমাদের অনেক উপকার হয়েছে।’ তবে যেসব মেয়ে কাজ করছিল ঈদের কারণে তাদের ছুটি দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। ডা. উত্তম বলেন, ‘দেশের সব দুর্যোগে এরা ঝাঁপিয়ে পড়ে, ওদের আমি ধন্যবাদ দিতে চাই হাসপাতালের পক্ষ থেকে, তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা।’
রেড ক্রিসেন্টের আরেক সদস্য রবিউল ইসলাম জানান, সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কাজ করছেন তারা ২ শিফটে ভাগ হয়ে। প্রথম শিফটে ১০ জন কাজ করেন দুপুর ২টা পর্যন্ত। দ্বিতীয় শিফটে ৬ জন কাজ করেন দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।
৬ বছর ধরে রেডক্রিসেন্টের সঙ্গে রয়েছেন জানিয়ে রবিউল বলেন, ‘কখনও কখনও রোগীদের কাছ থেকে থ্যাংক ইউ পাই, তখন এমন একটা অনুভূতি হয় যেটা বলে বোঝানো যাবে না!’
জানতে চাইলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা যে আমাদের সঙ্গে সমান হয়ে কাজ করছে, এটা দেখেই আমি মুগ্ধ!’ তিনি বলেন, ‘কাজের প্রতি ওদের যে একাগ্রতা, রোগীদের সার্ভিস দেওয়ার মানসিকতা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। ওদের স্যালুট।’








