সমাজে বর্তমানে প্রচলিত বিচারহীনতার বোধই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট)শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফোরাম। শুক্রবার (১১ অক্টোবর) ফোরামের প্রধান সমন্বয়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ মন্তব্য করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের কোনও গাফিলতি থেকে থাকলে তাও বিচারের আওতায় আনা জরুরি। এছাড়াও হলগুলোতে যেভাবে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের নির্যাতন করা হয়— যেন হলগুলো একেকটা টর্চার সেল। এসব নির্যাতন বন্ধে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফোরাম।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (১৭ তম ব্যাচ) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সমগ্র জাতি আজ হতবিহ্বল। বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে আমরা জানতে পেরেছি যে, ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরে বাংলা হলের উক্ত শিক্ষার্থীকে একই হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে পিটিয়ে হত্যা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বিপদগামী দুষ্কৃতকারী শিক্ষার্থী। যারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত, এরকম কয়েকজন দুর্বৃত্ত অমানুষিকভাবে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে। ভারতকে সমুদ্রবন্দর, পানি ও গ্যাস দেওয়ার চুক্তির বিরোধিতা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন আবরার ফাহাদ। ওই স্ট্যাটাসকে সরকারবিরোধী আখ্যা দিয়ে আবরার ফাহাদের ওপরে নির্মমভাবে নির্যাতন চালায় ওই শিক্ষার্থী পরিচয়ের ঘৃণ্য খুনিরা। যেভাবে নৃশংসভাবে আঘাতে আঘাতে আবরারকে হত্যা করা হয়েছে, তা কোনও সুস্থ বিবেকবোধ সম্পন্ন মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, সমাজে বর্তমানে প্রচলিত বিচারহীনতার বোধই আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ বলে আমরা মনে করি। ভিন্নমতকে পেশিশক্তি দিয়ে দমনের যে প্রবণতা বর্তমানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা একটি সভ্য ও মানবিক বোধসম্পন্ন সমাজ গঠনের বড় অন্তরায়। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া জরুরি। কেবল লেখার কারণে এরকম ঘৃণীত আক্রমণের শিকার আগেও অনেক প্রগতিশীল লেখক, শিক্ষক, সম্ভাবনাময় প্রাণকে হতে হয়েছে। কখনও কখনও তা বীভৎস-বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ড আজকেই প্রথম নয়, বুয়েটেও প্রথম নয়। সনি, দীপ, আবুবকর থেকে শুরু করে আজকের আবরার ফাহাদ— প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাই এদেশের বিচারহীনতার একেকটি দুর্ভাগ্যজনক নিদর্শন।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফোরামের বিবৃতি বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তো বটেই, কোথাও এরকম ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের কোনও গাফিলতি থেকে থাকলে, তাও বিচারের আওতায় আনা জরুরি। এছাড়াও হলগুলোতে যেভাবে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের নির্যাতন করা হয়, যেন হলগুলো একেকটা টর্চার সেল। এসব নির্যাতন বন্ধে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই। এটা অনুধাবন জরুরি যে, এরকম নৃশংস হত্যাকাণ্ড সমগ্র জাতিকে যে মনস্তাত্ত্বিক চাপে ফেলবে তার ক্ষতি অপূরণীয়। তাই সংশ্লিষ্ট সব মহলকে অনুরোধ করবো, রাজনৈতিক মতাদর্শের বিভেদের কারণে কিংবা লেখালেখিকে কেন্দ্র করে, অথবা ব্যক্তিগত আক্রোশে এ পর্যন্ত যত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার সুষ্ঠু বিচার অতিদ্রুত সম্পন্ন করুন। আবরারের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি ও তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।








