কোভিড-১৯ মোকাবিলায় এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজিএস) অর্জনের পথ সুগম করতে ২০২০-২০২১ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) খাতে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ ও ন্যায্য বাজেট বরাদ্দের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, এর ব্যত্যয় ঘটলে এসডিজিএস অর্জনের অগ্রগতি কঠিন হয়ে পড়বে।
সোমবার (৮ জুন) সকালে ওয়াটারএইড, ইউনিসেফ, পিপিআরসি, ফানসা-বিডি, ডব্লিউএসএসসিসি-বি, এফএসএম নেটওয়ার্ক, স্যানিটেশন অ্যান্ড ওয়াটার ফর অল এবং ওয়াশ অ্যালায়েন্সের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে আলোচকরা এ আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ওয়াটারএইড ও ইউনিসেফের সহযোগিতায় পিপিআরসির (পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার) করা এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) খাতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগ বেশ প্রশংসনীয়। কারণ, ওয়াশ খাতে ২০০৭-২০০৮ সাল থেকে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে অর্থ বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। এ সময় দুই হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১০ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে আর্থিক বরাদ্দের ধারা ঊর্ধ্বমুখী, যা ১১ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে স্যানিটশনে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, এর বিপরীতে হাইজিনের ক্ষেত্রে বরাদ্দ ছিল অপর্যাপ্ত। কিন্তু, প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ মোকাবিলায় উভয় খাতেই সমানভাবে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
ওয়াটারএইড জানায়, ভৌগলিক অবস্থান বিচারে দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়াশ বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে অসমতা এই বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। গ্রামাঞ্চল, চর, পার্বত্য অঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় ওয়াশ বাজেট বরাদ্দের অত্যধিক প্রয়োজনীয়তা থাকার পরেও বিগত বছরগুলোতে শহর ও মহানগরগুলো তুলনামূলকভাবে বরাদ্দের বেশি শতাংশ পেয়েছে। শহর অঞ্চলের তুলনায় এসব পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোতে অধিক বরাদ্দের প্রয়োজন এবং আগামী বাজেটে এসব অঞ্চলের প্রয়োজনীয়তার নিরিখেই বাজেটে অধিক অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি যেনো অবশ্যই বিবেচনা করা হয়।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং পিপিআরসির চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘কোভিড-১৯ মোকাবিলায় এবং এসডিজিএস-৬ অর্জনের বিষয়টি বিবেচনায় ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেটে হাইজিনকে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ওয়াশ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে এসডিজিএস অর্জনের গতিকে ত্বরান্বিত করার এখনই উপযুক্ত সময়।’
ওয়াটারএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান বলেন, ‘কোভিড-১৯ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে দেশব্যাপী হাইজিন খাতকে উৎসাহিত ও মানুষের আচরণগত পরিবর্তনে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অর্থ বরাদ্দের বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।’
সংবাদ সম্মেলনে অন্য বক্তারা বলেন, ‘বাজেটে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে পার্থক্য থাকা উচিত নয়। কেননা, আমরা দেখতে পাচ্ছি, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের সবাই কোভিড-১৯-এর ঝুঁকিতে আছে। জনপরিসরে (পাবলিক প্লেস) হাত ধোয়ার ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য বাজেটে এ খাতে আরও বেশি বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। যা স্বাস্থ্যবিধি ও করোনা প্রতিরোধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’
সংবাদ সম্মেলনে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে সম্মিলিতভাবে উত্থাপিত সুপারিশগুলোর মধ্যে আছে:
কোভিড-১৯ প্রতিরোধ এবং এ থেকে সুরক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে এবং ভবিষ্যতের কোনও প্রাদুর্ভাব থেকে মানুষের সুরক্ষায় দ্রুত ওয়াশ খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য পরিষেবার মধ্যে হাইজিন বা স্বাস্থ্যবিধি ও ওয়াশকে যুক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে দুর্গম এলাকা এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট করতে এবং ওয়াশ খাতের বিনিয়োগে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যথাযথভাবে করতে এ খাতে বরাদ্দ ব্যয় ঠিকমতো হচ্ছে কিনা সেগুলোর ঠিকমতো নজরদারি করতে হবে। এর পাশাপাশি একেবারে প্রান্তের মানুষের প্রয়োজনও বুঝতে হবে। ওয়াশ পরিষেবাকে সর্বজনীন করতে ও এ খাতে অর্থায়নকে প্রাধান্য দিতে বিভিন্ন পরিকল্পনার দলিল যেমন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানে যেসব প্রতিশ্রুতি আছে সেগুলোর বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চরম দরিদ্র মানুষ এবং সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষকে প্রাধান্য দিতে হবে। জাতীয় নীতি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন যথাযথভাবে করার জন্য বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিগরি সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ করতে হবে। বিশেষ করে হাইজিন এবং পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো এখনও পিছিয়ে থাকা খাতে গুরুত্ব দিতে হবে। জনস্বাস্থ্যের জন্য এসব বিষয় জরুরি। সুপেয় পানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এ খাতে বিপুল ভর্তুকি পাওয়া শহুরে গ্রাহক এবং উপকূল অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষ, বস্তিবাসী অন্যান্য দুর্গম এলাকার মানুষের মধ্যে চরম বৈষম্য আছে। এ বিষয়টির দিকে নজর দিতে হবে। আর প্রগ্রেসিভ বিলিংয়ের (সক্ষমতা বুঝে বিল নির্ধারণ) মতো উপায় বের করতে হবে। মহামারি প্রতিরোধের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হাইজিনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র হিসেবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেশব্যাপী হাইজিন সংক্রান্ত প্রচারে বৃহৎ আকারে বিনিয়োগ করতে হবে। বিভিন্ন এলাকায় সাবান ও পানি দিয়ে মানুষের হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।








