মাদক মামলায় যথাযথ আইন না মেনে কারসাজি করে কম শাস্তি হয় এমনভাবে অভিযোগপত্র দেওয়ার অভিযোগে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ক্লোজ ও দূরের জেলায় বদলি করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। ওই পুলিশ কর্মকর্তা সীমাহীন দুর্নীতি ও ফৌজদারি মামলা রুজু করার নামে নিরীহ মানুষকে ফাঁদে ফেলে অবৈধভাবে লাভবান হতে ঘুষ বা চাঁদাবাজি করেছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে আদালতের আদেশে।
অভিযুক্ত এই পুলিশ কর্মকর্তার নাম রমজান আলী। তিনি কুড়িগ্রামের রৌমারী থানায় সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। গত সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) কুড়িগ্রামের জেলা ও দায়রা জজ মো. আব্দুল মান্নান এই আদেশ দেন।
আইনজীবীরা বলছেন, আইনের মধ্যে থেকেই মাদক মামলায় এমন কারসাজি করে আসামিদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নিয়ে থাকেন অনেক পুলিশ কর্মকর্তা। অর্থের বিনিময়ে আইনের ধারা পরিবর্তন করে দিয়ে শাস্তির মাত্রা কমবেশি করার সুবিধা দেওয়া হয়। বিশেষ করে মাদক মামলার ক্ষেত্রে অভিনব এই কারসাজি চলে। এমনকি মাদক উদ্ধারের সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির পকেট বা শরীর থেকে উদ্ধার ও সঙ্গে বা পাশে থাকা ব্যাগ থেকে উদ্ধার দেখানোর মধ্যেও কারসাজি করা হয়ে থাকে। তবে এরকম দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ নেওয়ার ঘটনা বিরল।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, বেলাল হোসেন নামে মাদক মামলার (মামলা নম্বর ৫৬৭/২০২০) এক আসামির বিরুদ্ধে তার আইনজীবী আদালতে নথি তলব ও জামিনের আবেদন করেন। আদালত নথি তলবের আবেদন মঞ্জুর করে জামিন শুনানির জন্য পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেন। নথি পর্যালোচনা করে আদালত দেখতে পান, গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম সদর থানাধীন পাঁচগাছি ইউনিয়নের গোবিন্দপুর সরকার পাড়া থেকে বেলাল হোসেনকে দুই হাজার ১০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়। মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় সাব ইন্সপেক্টর রমজান আলীর ওপর। তিনি তদন্ত করে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(১) টেবিলের ১০ (কে) ধারায় অভিযোগপত্র দেন। আদালত এই অভিযোগপত্র ‘ভুল’ উল্লেখ করে এটি ‘অযোগ্যতা ও অদক্ষতার শামিল’ বলে মন্তব্য করেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধারকৃত দুই হাজার ১০০ ইয়াবার ওজন ২১০ গ্রাম। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(১) টেবিলের ১০(ক) ধারায় বলা হয়েছে, মাদকদ্রব্যের পরিমাণ অনূর্ধ্ব ২০০ গ্রাম অথবা মিলিলিটার হলে অন্যূন এক বছর, অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড। আর ১০(খ) ধারায় বলা হয়েছে, মাদকদ্রব্যের পরিমাণ ২০০ গ্রাম অথবা মিলিলিটারের ঊর্ধ্বে এবং অনূর্ধ্ব ৪০০ গ্রাম অথবা মিলিলিটার হলে অন্যূন পাঁচ বছর, অনূর্ধ্ব ১০ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এসআই রমজানের আরেকটি মামলার অভিযোগপত্রের উদাহরণ দিয়ে আদালত বলেছেন, কুড়িগ্রাম সদর থানায় চাকরিরত অবস্থায় বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল উদ্ধার করেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে অভিযোগপত্র না দিয়ে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫-বি(২) ধারা মতে দাখিল করেন। এই ফেনসিডিল উদ্ধারের মামলা মাদকদ্রব্য আইনে বিচার হলে আসামির যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড শাস্তি হতে পারতো। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫-বি(২) ধারা মতে অভিযোগ প্রমাণ হলে শাস্তির পরিমাণ হবে সর্বোচ্চ সাত বছর।
আদালত তার আদেশে বলেন, আইনের ফাঁক দিয়ে আসামিদের কাছ থেকে নগদ উৎকোচ গ্রহণে আসামির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির পরিবর্তে সুকৌশলে কম শাস্তির ধারায় পুলিশ রিপোর্ট দাখিল করেন, যা দৃশ্যত তার সীমাহীন দুর্নীতির প্রমাণ। তার দাখিল করা পুলিশ রিপোর্টগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তিনি সুকৌশলে পুলিশ রিপোর্টে কিছু দুর্বলতা রেখে দেন যা কিনা বিচার আমলে আসামির পক্ষে যায়। এসব ক্ষেত্রে তিনি আসামিপক্ষের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে জড়িত থাকেন বলে আদালতের কাছে বলিষ্ঠভাবে প্রতীয়মান হয়।
আদালত তার আদেশে বলেন, এসআই রমজান আলীকে কোনও থানায় রেখে তাকে দিয়ে কোনও মামলার তদন্ত কাজ পরিচালনা করা ন্যায় বিচারের স্বার্থে আদৌ সমীচীন নয়। তাই তাকে ক্লোজ করার জন্য পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে এসআই রমজান আলীকে রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা ও ডিএমপি বাদে দূরবর্তী কোনও জেলায় বদলির পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালত আদেশে আরও বলেছেন, ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫ ধারা মতে জেলা ও দায়রা জজ আদালত কুড়িগ্রাম জেলার ভৌগোলিক অধিক্ষেত্রের ভেতরে এক্স অফিসিও জাস্টিস অব দ্য পিস হিসেবে জেলার লাইফ লিবার্টি অ্যান্ড প্রোপ্রার্টির লিগাল কাস্টোডিয়ান। সেই সূত্রে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রমজান আলীর অদক্ষতা ও অযোগ্যতা এবং দুর্নীতির বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার আদালতের রয়েছে। এসআই রমজান আলীর বিরুদ্ধে আদালতের প্রকাশ্য এজলাসে নানা ধরনের আপত্তিকর কথাবার্তা বিচারপ্রার্থী জনগণ এবং কৌঁসুলিগণ প্রায়শই আদালতকে মৌখিকভাবে অবগত করেন। তার বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতি এবং ফৌজদারি মামলা রুজু করার নামে নিরীহ মানুষকে ফাঁদে ফেলে অবৈধভাবে লাভবান হয়ে ঘুষ তথা চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। তার বিরুদ্ধে থানা এলাকা এবং আদালত অঙ্গনের আশপাশে সীমাহীন দুর্নীতির কথা প্রায়ই আদালতের গোচরীভূত হয়।
আদালত আদেশে বলেছেন, সাধারণ মানুষ তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ভয়ে এসআই রমজান আলীর বিরুদ্ধে সরাসরি মুখ খুলতে সাহস পান না। তার চলাফেরা ও গতিবিধি এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে ব্যবহার ও আচরণ এবং সর্বোপরি তার সীমাহীন দুর্নীতি একজন পুলিশের এসআই হিসেবে তাকে রক্ষকের স্থলে ভক্ষকের ভূমিকায় রূপান্তর করেছে। এস আই পদে চাকরির দাপট দেখিয়ে তিনি নিরীহ প্রতিবেশী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নানা রকম হয়রানি এবং উত্ত্যক্ত করেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত।
আদালতের এই আলোচিত আদেশের বিষয়ে জানতে এস আই রমজান আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইয়াবা মামলার অভিযোগপত্রে ভুল করে ১০ (ক) ধারার জায়গায় ১০(খ) হয়েছিল। আর ফেন্সিডিলের মামলায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে প্রচুর মামলা রয়েছে। মাদকদ্রব্য আইনেও মামলা হয়। আর আসামিদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে উৎকোচ নেওয়ার বিষয়টি সত্য নয়। তারপরও যেহেতু আদালত আদেশ দিয়েছেন, এ বিষয়ে আমার আর কিছু বলার নেই।’








