বিগত বছরগুলোর মতো ২০২০ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক ছিল বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। একইসঙ্গে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে এ বছরও আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। ২০২০ সালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বৃহস্পতিবার (৩১ ডিসেম্বর) এ তথ্য জানায় এই সংগঠনটি।
মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে সংবাদ সম্মেলনে আইন ও সালিশ কেন্দ্র বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে। এরমধ্যে মানবাধিকারের একটি সর্বজনগ্রাহ্য মান বজায় রাখার সুপারিশ করা হয়। সকল পর্যায়ের নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করাসহ একটি গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারবান্ধব রাষ্ট্র গঠনে সরকারের কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের কথা বলা হয়।
রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দ্বারা কোনও ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় যেমন- বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু, দায়িত্বে অবহেলা ইত্যাদির অভিযোগ উঠলে তা দ্রুততার সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সম্পৃক্তদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এ পর্যন্ত সংঘটিত সকল গুম, অপহরণ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কাউকে আটক বা গ্রেফতারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সম্পূর্ণভাবে মেনে চলতে হবে।
নাগরিকদের মতপ্রকাশের অধিকার খর্ব না করা এবং কোনও ধরনের ভয়ভীতি বা প্রতিহিংসার শিকার হওয়া ছাড়াই নাগরিকরা যেন এ অধিকারগুলো চর্চা করতে পারে, তার পরিবেশ সৃষ্টি করা। গণমাধ্যম ও নাগরিকদের মতপ্রকাশের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা।
নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য নিরসনসংক্রান্ত সনদের (সিডও) ধারা ২ এবং ১৬(গ) থেকে আপত্তি প্রত্যাহার এবং নারীর ওপর সহিংসতা বন্ধে কার্যকর সচেতনতামূলক ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি জোরদার করা।
শারীরিক ও মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি, ইনডিজিনিয়াস, দলিত, তৃতীয় লিঙ্গ, অন্যান্য অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ও চা বাগানে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের পূর্ণ চর্চা নিশ্চিত এবং রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিজ বিশ্বাস ও আচার পালনের, চর্চার অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ সকল অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে বৈষম্যবিরোধী আইন দ্রুততার সঙ্গে অনুমোদন করা।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, আইন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর করা এবং এসব প্রতিষ্ঠানে অবসরপ্রাপ্ত আমলা নিয়োগের যে ধারাবাহিকতা চলছে, তা বন্ধ করা। জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন স্বাধীনভাবে তাদের ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন করতে পারে, সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সহযোগিতা ও গুরুত্বারোপ করা।
স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ আমলে নিয়ে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে উত্থাপিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। সকল নাগরিকের জন্য কভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন (করোনার টিকা) প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী কমিটির মহাসচিব নূর খান বলেন, ‘অবসরপ্রাপ্ত আমলারা কোনও না কোনোভাবে সরকারের প্রতি অনুগত থাকে। সেজন্য আমরা এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করি। যাতে কোনও আমলাকে কমিশনগুলোতে নিয়োগ দেওয়া না হয়।’
তিনি বলেন,‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে সামান্য কিছু পরিবর্তন আমরা লক্ষ্য করছি। তবে এখনও বলার সময় আসেনি যে, এটি কমে গেছে বা আর হবে না। কারণ, এর আগেও আমরা দেখেছি যে, বিশেষ বিশেষ সময় যখন জনগণের ভেতরে কোনও ঘটনাকে নিয়ে যদি ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়, তখন রাষ্ট্র বা বাহিনীগুলোর তরফ থেকে কিছুটা নিরবতা আমরা লক্ষ্য করি। এই অতিমারির সময়েও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনক ও নজিরবিহীন। আমরা চাই, ২০২১ সালে একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে উঠুক।’







