লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যা

অভিযোগপত্রে আসামি ২৫৩, ব্যবহার হয়েছে চার দেশ

শাহরিয়ার হাসান
০৭ অক্টোবর ২০২১, ১১:০০আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ১১:৫৯

লিবিয়ায় পাচারের শিকার ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ঢাকাসহ সারাদেশে মামলা হয়েছিল ২৫টি। এর মধ্যে ২৪টি মামলায় ২৫৩ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। অন্য একটি মামলাও গুছিয়ে এনেছে সংস্থাটি। অভিযোগপত্রে বলা হচ্ছে, লিবিয়ায় মানবপাচারে চারটি দেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করেছেন পাচারকারীরা। সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে দেশের চারটি ট্রাভেল এজেন্সিরও।

মানবপাচার নিয়ে কাজ করা সিআইডির বিভাগটি বলছে, গত বছর লিবিয়ায় মানব পাচারকারীদের কাছ থেকে অপহরণের শিকার হন একদল বাংলাদেশি। পরে তাদের হাতেই খুন হন এক অপহরণকারী। এর প্রতিশোধ নিতেই ক্ষিপ্ত অন্য পাচারকারীরা এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ ঘটনায় আরও ১২ বাংলাদেশি আহত হয়। তাদের মধ্যে ৯ জন বিভিন্ন সময় ফেরত আসলেও বাকি তিনজন এখনও সে দেশে কাজ করছেন।

সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলছেন, দালাল ধরে লিবিয়ায় যাওয়া এসব ভুক্তভোগীদের খরচ করতে হয়েছিল ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। এই অর্থ খরচ হয়েছে বিভিন্ন ধাপে। তার মধ্যে গ্রামের এই যুবকদের প্রথম যে দালাল টার্গেট করে প্রলোভনে ফেলেন, তিনি (দালাল) পেয়েছেন ৫ হাজার টাকা। পরের বিভিন্ন ধাপে চক্রটি দেশেই ‘কাজে লাগান’ দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। প্রথম দালাল থেকে লিবিয়া পর্যন্ত, চক্রের সব সদস্যের বিষয়েই উল্লেখ আছে অভিযোগপত্রে। এসব আসামির অধিকাংশের বাড়ি কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, মাদারীপুর, কুষ্টিয়া ও নরসিংদী জেলায়।

সিআইডির মানবপাচার তদন্ত বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মুহাম্মাদ সাইদুর রহমান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, লিবিয়ার ঘটনায় ২৫টি মামলার সবগুলোই তদন্ত করেছে সিআইডি। যার এজাহারভুক্ত আসামির সংখ্যা ২৯৯ জন। গ্রেফতার হয়েছেন ১৭১ জন। আর তাদের মধ্যে ৪২ জন এরই মধ্যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সিআইডি গত তিন থেকে চার মাসে ২৫টি মামলার অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। যাতে আসামি করা হয়েছে ২৮০ জনকে। কোনও কোনও ব্যক্তির নাম একাধিক মামলায় থাকায় জন হিসেবে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫৩-তে। বাকী একটি মামলার কাজ প্রায় শেষ। আগামী এক দুই সপ্তাহের মধ্যে এই অভিযোগপত্রও জমা দেওয়া হবে।

চার দেশ পেরিয়ে লিবিয়ায়

অভিযোগপত্র বিশ্লেষণ করে সিআইডির সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলছে, লিবিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর ২০০৮ সালের দিকে বাংলাদেশিরা দেশটিতে কাজের জন্য যেতে শুরু করেন। সেই ধারাবাহিকতা এখনও চলছে। লিবিয়ায় থাকা বাংলাদেশিরাও তাদের আত্মীয়স্বজনদের সেখানে নিয়ে যেতেন, আবার অনেকে টাকার বিনিময়েও ইউরোপে লোকজন নিতেন। এভাবেই এক পর্যায়ে লিবিয়া অভিবাসনের রুট হিসেবে পরিচিতি পায়; গড়ে ওঠে মানব পাচারকারী চক্র।

দেশ থেকে লিবিয়ায় যেতে ব্যবহার করা হতো চারটি দেশ– ভারত, নেপাল, দুবাই  ও মিশর। ঢাকা থেকে প্রথম গন্তব্য থাকে এই দেশগুলোর বিভিন্ন শহরে। সেখান থেকে লিবিয়া। তারপর সেখান থেকে ডিঙি নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ইতালি কিংবা অন্য কোনও ইউরোপিয় দেশে। পাচারের পথে ধাপে ধাপে এক চক্রের হাত থেকে আরেক চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় নিয়ে চলে এই অনিশ্চিত যাত্রা– এক মাস দু’মাস কখনও আবার তারও বেশি।

লিবিয়ায় পাচারের রুট ও সময়

ঢাকা – কলকাতা– লিবিয়া– ২ মাস
ঢাকা– কাঠমুন্ড–লিবিয়া– ২ মাস
ঢাকা–দুবাই–মিশর–লিবিয়া– ৩ মাস
ঢাকা– কলকাতা–মিশর–লিবিয়া– ৩ মাস

সিআইডি বলছে, অবৈধভাবে যারা ইউরোপে ঢুকতে চায়, তাদের জন্য সুবিধাজনক জায়গা হচ্ছে লিবিয়া। বাংলাদেশ থেকে অনেকে নানা উপায়ে লিবিয়া পৌঁছে। এরপর সেখান থেকে নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যেতে সচেষ্ট হয় অধিকাংশই। ভাগ্য বদলাতে যারা ইতালি যাত্রায় সামিল হন, নির্মম পরিহাসে দালালচক্রের ফাঁদে পড়ে প্রতিনিয়ত সাগরে ডুবে মারা যায় এর অনেকেই।

২০১৪ সাল থেকে এ পথে ইউরোপে যেতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের ২০ হাজারের বেশি অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরেই মারা গেছেন অন্তত ৩৫০ জন। ভূমধ্যসাগরের এ জলপথকে অভিবাসন প্রত্যাশীদের জন্য ‘বিপজ্জনক পথ’ বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

রেড নোটিসভুক্ত চার মানব পাচারকারী অধরা
গত বছরের নভেম্বরে লিবিয়ায় মানবপাচার মামলার ছয় পলাতক আসামিকে ধরে দিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ পুলিশ সংস্থার (ইন্টারপোল) সাহায্য চেয়েছিল সিআইডি। সিআইডির অনুরোধে রেড নোটিস জারি করে বাংলাদেশ পুলিশ। নোটিস দেওয়ার দেড় মাসের মধ্যে দুই বাংলাদেশি মানব পাচারকারী গ্রেফতারও হন। এরপর ৬ মাস কেটে গেলেও বাকি চার আসামি মিন্টু মিয়া, স্বপন, নজরুল ইসলাম মোল্লা ও তানজিরুল খোঁজ দিতে পারেনি পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।

বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) শাখার মহিউল ইসলাম বলেন, জাফর ইকবাল ও শাহাদত হোসেন গ্রেফতার হয়েছেন। বাকি আসামিদের বিষয়ে এখনও কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি এই মানব পাচারকারীদের অবস্থানও জানা সম্ভব হয়নি।

সার্বিক বিষয়ে সিআইডি প্রধান ব্যারিস্টার মাহবুব রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মানবপাচারকারী চক্র এতটাই বিস্তৃত যে, তাদের গোড়া পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হয় না। তবুও আমরা পাচারকারী চক্র ও দালালদের তালিকা করে গ্রেফতারের চেষ্টা করছি। তাছাড়া এই অপরাধ নির্মূলে সর্বপ্রথম পারিবারিক ও ব্যক্তি সচেতনতা জরুরি।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
চলন্ত বাইকের চালককে ইটের আঘাত, তিন আসামি কারাগারে
চালকের মাথায় ইটের আঘাত, ছিনতাইকারী গ্রেফতার
মাদ্রাসাছাত্রকে আত্মহত্যা প্ররোচনা: সেই শিহাবের দায় স্বীকার 
সর্বশেষ খবর
টাইমস স্কয়ারে বিশ্বকাপের রঙ, ব্রাজিল-মরক্কো সমর্থকদের উৎসব
টাইমস স্কয়ারে বিশ্বকাপের রঙ, ব্রাজিল-মরক্কো সমর্থকদের উৎসব
২০২২-এর হতাশা পেছনে ফেলে নতুন স্বপ্নে বিভোর কাতার
২০২২-এর হতাশা পেছনে ফেলে নতুন স্বপ্নে বিভোর কাতার
একই শব্দে সব অনুভূতি: আমরা কি ‘ভালোবাসা’ শব্দটাকেই হালকা করে ফেলছি?
একই শব্দে সব অনুভূতি: আমরা কি ‘ভালোবাসা’ শব্দটাকেই হালকা করে ফেলছি?
পুলিশ মারবে কেন, থানায় কাঁদলেন ক্রিকেটার নাঈম হাসান
পুলিশ মারবে কেন, থানায় কাঁদলেন ক্রিকেটার নাঈম হাসান
সর্বাধিক পঠিত
বাংলাদেশে এসেই ভিসা নিয়ে যা বললেন ভারতের নতুন হাইকমিশনার
বাংলাদেশে এসেই ভিসা নিয়ে যা বললেন ভারতের নতুন হাইকমিশনার
আইনজীবী তালিকাভুক্তির এমসিকিউতে পাস করলেন জাইমা রহমান, মোট উত্তীর্ণ ৯২০১
আইনজীবী তালিকাভুক্তির এমসিকিউতে পাস করলেন জাইমা রহমান, মোট উত্তীর্ণ ৯২০১
মোটরসাইকেল আরোহীর মাথায় ইটের আঘাত: নেপথ্যে কী
মোটরসাইকেল আরোহীর মাথায় ইটের আঘাত: নেপথ্যে কী
কী আছে ইরান চুক্তিতে, যা সই করতে প্রস্তুত ট্রাম্প
কী, কেন, কীভাবেকী আছে ইরান চুক্তিতে, যা সই করতে প্রস্তুত ট্রাম্প
যে পাঁচটি তথ্য কখনোই এআই চ্যাটবক্সে ইনপুট দেবেন না
যে পাঁচটি তথ্য কখনোই এআই চ্যাটবক্সে ইনপুট দেবেন না