X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালানের যত ফন্দি

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২২, ১৫:২৭

আকাশ কিংবা স্থলপথ, সব জায়গায় অভিনব কায়দায় স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালানে সক্রিয় রয়েছে একটি চক্র। বিমানের ফ্লাইটে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের তল্লাশি করে বিভিন্ন সময় মিলছে স্বর্ণ। অভিনব কৌশলে হাতুড়ির ভেতর বা ফ্লাস্কে করে বিদেশ থেকে স্বর্ণ নিয়ে আসছে পাচারকারীরা। নানা কায়দায় চোরাকারবারিরা মাদক পাচারেও সক্রিয় রয়েছে। তবে মাদক কিংবা স্বর্ণ চোরাচালানকারীরা এত কায়দা করেও রেহাই পাচ্ছে না। ধরা পড়ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। এসব চোরাচালান ধরতে গিয়ে অর্জিত নানা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, স্বর্ণ কিংবা মাদক চোরাচালান এবং পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত অভিনব সব কৌশল অবলম্বন করছে চক্রগুলো। সম্প্রতি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাস্টমস কর্মকর্তাদের অভিযানে দেখা গেছে, হাতুড়ির ভেতর লুকিয়ে রাখা হয়েছিল স্বর্ণ। উদ্ধার করা হয় তালার ভেতর অভিনব কায়দায় লুকানো স্বর্ণভরা ব্যাগও। এছাড়া ট্রলি ব্যাগের ভেতর বিশেষ বাক্সে স্বর্ণ চোরাচালানের সময় ধরা পড়ে অনেকে। পেটের ভেতরেও নিয়ে আসা হচ্ছে স্বর্ণ। বিদেশ থেকে আসা যাত্রীর হুডি জ্যাকেটের হাতা থেকেও উদ্ধার করা হয় স্বর্ণ। জুসের মেশিনের ভেতর করে চোরাচালান হচ্ছিল স্বর্ণ। বিদেশ থেকে আসা এক যাত্রীর ব্যাগ ও ফুলের টবের ভেতর করে নিয়ে আসা হয় স্বর্ণের বার।

কর্মকর্তারা বলেন, মাদক বিশেষ করে হেরোইন, গাঁজা, ইয়াবা—এগুলো সীমান্তবর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন পন্থায় রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। এসব মাদক বিভিন্ন অভিযানে আটক হচ্ছে। তখন দেখা যাচ্ছে, পাচারকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। তারা পণ্যবাহী কাঁচামালের ট্রাকের ভেতর, পেঁয়াজের ট্রাক, বালুর ট্রাক, প্রাইভেট কারের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ বক্স বসিয়ে মাদক পাচার করছে। মাদক ব্যবসায়ীরা পানের ভাঁজে, কাঠের তক্তায় বিশেষ বাক্সে করে মাদক পাচার করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়াতে বেদের দল সেজে ইয়াবা পাচারের মতো ঘটনাও ধরা পড়েছে।

এছাড়া মবিলের ভেতর, প্রাইভেট কার, সিএনজির অটোরিকশার ভেতরে, বাসা পরিবর্তনের কথা বলে বালিশের ভেতর ইয়াবা ও হেরোইন পাচারের মতো কর্মকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ধরা পড়েছে। তাছাড়র অভিনব কায়দায় অ্যাম্বুলেন্সে করে রোগী সেজে, গুঁড়া হলুদ ও মরিচের প্যাকেটের ভেতর হেরোইন ঢুকিয়ে পাচার করা হচ্ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এসব বিষয় উঠে আসে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপির গুলশান গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মশিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘সব ধরনের মাদক সীমান্ত পার হয়ে নানা কৌশলে বাংলাদেশের ঢোকে এবং রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে থাকে তারা।’

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘র‌্যাব মাদক নির্মূলে বদ্ধপরিকর। আমরা সবসময় তৎপর রয়েছি এবং বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করে মাদক চোরাকারবারিদের গ্রেফতার করছি, মাদক উদ্ধার করছি। অভিযানে আমরা দেখেছি, পেটের ভেতর পুটলি করে ইয়াবা পাচার করতে। এমন অভিজ্ঞতা থেকে আমরা নজরদারি আরও বাড়িয়েছি।’

ঢাকা কাস্টমস হাউজের ডেপুটি কমিশনার (প্রিভেন্টিভ) সানোয়ারুল কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেটলির ভেতর, তালার ভেতর, স্বর্ণ গুড়ো করে নিয়ে আসা, নতুন নতুন ওয়েব আউট তৈরি করে স্বর্ণ পাচার করে চোরাচালানকারীরা। গোল্ড বার লিকুইড করে পানির সঙ্গে কেমিক্যাল মিশিয়ে নিয়ে আসার ঘটনাও আছে। গতবছর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ ধরনের অভিনব কৌশল অবলম্বন করেও কাস্টমস কর্মকর্তাদের নজরদারি এড়াতে পারেনি চোরাচালানকারীরা। প্রায় ৬০ কেজির বেশি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে ওই বছর।’

স্বর্ণ চোরাচালানে বিমানবন্দরে যত কায়দা

২০২১ সালের ৭ জুলাই কাস্টমস প্রিভেন্টিভ টিমের অভিযানে বিদেশ থেকে আসা এক যাত্রীর অভিনব কায়দায় ফুলের টবের ভেতরে রাখা প্রায় দেড় কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।

২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর এক যাত্রীর ট্রলি ব্যাগের ভেতরে থাকা তালার ভেতরে বিশেষ কায়দায় রাখা হয়েছিল স্বর্ণ। পরে কাস্টমস প্রিভেন্টিভ টিম তল্লাশি করে এক কেজির মতো স্বর্ণ উদ্ধার করে।

বিদেশ থেকে আসা এক যাত্রীর দুটি হাতুড়ির ভেতর নিয়ে আসা হয়েছিল স্বর্ণ। ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর কাস্টমস প্রিভেন্টিভ টিমের ওই অভিযানে উদ্ধার করা হয় ৪৪টি গোল্ড বার।

পেটের ভেতর করে নিয়ে আসা স্বর্ণ উদ্ধার করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাস্টমস প্রিভেন্টিভ টিম। ২০২১ সালের ২ অক্টোবর ওই অভিযানে পেটের ভেতর থেকে বের করে আনা হয় ২টি স্বর্ণের বার।

এক যাত্রীর ব্যাগ স্ক্যানিং করে ২টি জুসার মেশিন ও ২টি ডিজিটাল সাউন্ড বক্সের ব্যাটারির মধ্যে কৌশলে লুকিয়ে রাখা অবস্থায় ৩২টি স্বর্ণের বার পাওয়া যায়। ২০২১ সালে ২৫ জুলাই প্রিভেন্টিভ টিমের অভিযানে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীর ব্যাগে ধরা পড়ে স্বর্ণ চোরাচালানের এই অভিনব কায়দাটি।

মাদক কারবারিদের কৌশল

কাঠের তক্তা তৈরি বক্স বানিয়ে গাঁজা পাচার করছিল মাদক চক্রের সদস্যরা। ২০২১ সালের ৪ ডিসেম্বর র‌্যাবের  অভিযানে ২০ কেজি গাঁজাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে আটকের পর এমনই তথ্য উঠে আসে।

২৬ নভেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ এলাকায় দুই জনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের সন্দেহ হলে হাসপাতালে নিয়ে এক্সরে করে পেটের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় ২ হাজার পিস ইয়াবা।

১৩ অক্টোবর যাত্রাবাড়ীতে অভিযান পরিচালনাকারী সদস্যরা পোল্ট্রি ফিডের ব্যাগ থেকে অভিনব কায়দায় পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে।

ভাসমান বেদে দলের ছদ্মবেশ ধারণ করে ইয়াবা পাচারের সময় ৭ অক্টোবর উদ্ধার করা হয় প্রায় ২০ হাজার পিস ইয়াবা। গ্রেফতার করা হয় ৬ মাদক ব্যবসায়ীকে।

১৬ নভেম্বর ওয়ারী এলাকা থেকে মোটরসাইকেলের সিট কভারের ভেতর থেকে বেশ কয়েকটি প্যাঁকেটে মোড়ানো ৩ হাজার ৭০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ সময় গ্রেফতার করা হয় এক মাদক কারবারিকে।

প্রাইভেটকারটি তল্লাশি করে পেছনের সিটের ভেতরে তিনটি বস্তার মধ্যে লুকানো অবস্থায় ৩০ কেজি গাঁজা উদ্ধারসহ প্রাইভেটকারটিকে জব্দ করা হয়।

কক্সবাজার থেকে অভিনব কায়দায় পানের ভাঁজে করে রাজধানীতে ইয়াবা নিয়ে এসেও রক্ষা পায়নি মাদক ব্যবসায়ীরা। ১৪ নভেম্বর অভিযানে র‌্যাবের হাতে তারা ধরা পড়ে। পানের ভাঁজে ভাঁজে ৩২৬ প্যাকেটে থাকা ৬৫ হাজার পিস ইয়াবাসহ ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

গত ১৮ মে মোহাম্মদপুরের কলেজ গেট এলাকা থেকে দুই মাদক ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞাসাবাদের পর কর্মকর্তাদের সন্দেহ হলে হাসপাতাল নিয়ে তাদের এক্সরে করানো হয়। পরে তাদের পেটে ছোট ছোট পলিথিনের পুটলি শনাক্ত হয়। পেট থেকে ৩৫ পুটলি বের করে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

আদাবর এলাকায় ১২ মে অভিযান চালিয়ে বিছানাপত্র এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরের অজুহাতে সেই বিছানার বালিশের ভেতর থেকে ৬০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতার করা হয় এক মাদক ব্যবসায়ীকে।

এদিকে, বাসা বাড়ির জিনিসপত্র নেওয়ার আড়ালে ওয়ারড্রব এবং খাটের ভেতর অভিনব কায়দায় পাচার করা হচ্ছিল গাঁজা। ২০২১ সালের ১৩ জুন গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে ৫০ কেজি গাঁজাসহ গ্রেফতার করা হয় দুজনকে। জব্দ করা হয় একটি পিকআপ।

রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় হেরোইন ছড়িয়ে দিতে গুড়া হলুদ ও মরিচের প্যাকেটের ভেতর বহন করে পাচারের সময় মাদক চোরাচালান চক্রের এক নারী সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। ২০২১ সালের ২৪ আগস্টের অভিযানে তারা দেখেন, এসব গুঁড়া হলুদ ও মরিচের প্যাকেটের ভেতর ঢুকিয়ে ছোট ছোট করে কাগজে মুড়িয়ে হেরোইন রাখা হয়েছে।

/আইএ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
গৃহবধূর মৃত্যু: মায়ের দাবি নির্যাতনে, ননদ বলছে প্যারাসিটামল খেয়ে
গৃহবধূর মৃত্যু: মায়ের দাবি নির্যাতনে, ননদ বলছে প্যারাসিটামল খেয়ে
হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা-টিকা প্রদান শুরু
হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা-টিকা প্রদান শুরু
বাংলাদেশ-ইইউ রাজনৈতিক সংলাপ ২৮ জুন
বাংলাদেশ-ইইউ রাজনৈতিক সংলাপ ২৮ জুন
ইউক্রেনে আরও হাই-টেক অস্ত্র পাঠানো হচ্ছে: পেন্টাগন
ইউক্রেনে আরও হাই-টেক অস্ত্র পাঠানো হচ্ছে: পেন্টাগন
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত