দুদকে চাকরি বিধিমালা নিয়ে সমালোচনা, প্রয়োগের বৈষম্য নিয়েও প্রশ্ন

নুরুজ্জামান লাবু
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০:০০আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০:০০

দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের চাকরি বিধিমালার ৫৪(২) ধারা নিয়ে সংস্থাটিতে সমালোচনা চলছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এই ধারা প্রয়োগের কারণে সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই অফিসে ব্যক্তি ভেদে ধারাটি প্রয়োগের অভিযোগ করেছেন খোদ দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এমনকি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই ধারাটি বাতিলের দাবি তোলা হয়েছে। দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দীনকে সম্প্রতি আকস্মিক চাকরিচ্যুত করার পর বিষয়টি নিয়ে জোর আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুদকের চাকরি বিধিমালার ৫৪(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই বিধিমালায় ভিন্নরূপ যা কিছুই থাকুক না কেন, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কোনও কারণ না দেখিয়ে কোনও কর্মচারীকে ৯০ দিনের নোটিশ দিয়ে, অথবা ৯০ দিনের বেতন পরিশোধ করে, তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করতে পারবে।’ অপরদিকে দেশের সংবিধানের ১৩৫(২) নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘অনুরূপ পদে (প্রজাতন্ত্রের অসামরিক পদে) নিযুক্ত কোনও ব্যক্তিকে তার সম্পর্কে প্রস্তাবিত কোনও ব্যবস্থা গ্রহণের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দান না করা পর্যন্ত, তাকে বরখাস্ত, অপসারিত বা পদাবনমিত করা যাবে না। তবে শর্ত থাকে যে, এ দফা সেসব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না, যেখানে (অ) কোনও ব্যক্তি যে আচরণের ফলে ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হয়েছেন, সে আচরণের জন্য তাকে বরখাস্ত, অপসারিত বা পদাবনমিত করা হয়েছে। অথবা (আ) কোনও ব্যক্তিকে বরখাস্ত, অপসারিত বা পদাবনমিত করার ক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যে, কোনও কারণে যা ওই কর্তৃপক্ষ লিপিবদ্ধ করবেন, ওই ব্যক্তিকে কারণ দর্শাবার সুযোগ দান করা যুক্তিসঙ্গতভাবে সম্ভব নয়, অথবা (ই) রাষ্ট্রপতির কাছে সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে ওই ব্যক্তিকে অনুরূপ সুযোগ দান সমীচীন নয়।’

দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, সংস্থাটির চাকরি বিধিমালার ৫৪ (২) ধারাটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের তিনটি উপধারায় তা পরিষ্কার ব্যাখ্যা করা রয়েছে। কিন্তু দুদক কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে না নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এক তরফা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন কর্মচারী (চাকরি) বিধিমালা, ২০০৮ এর ৫৪ (২) ধারাটি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। ২০১১ সালের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্ট বিভাগ দুদক চাকরি বিধিমালার ৫৪ (২) ধারাকে অসাংবিধানিক হিসেবে ঘোষণা করে। পরবর্তীতে সেই রায়ের বিপরীতে আপিল দায়ের হলে আপিল আদালত ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর আপিল খারিজ করে হাইকোর্ট বিভাগের ৫৪ (২) বিধি অসাংবিধানিক ঘোষণাটি বহাল রাখে। এর বিপরীতে কমিশন আপিল বিভাগের ওই সিদ্ধান্তের বিপরীতে ৩২/২০১৭ সিভিল রিভিশন দায়ের করলে রিটকারীর প্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে শুনানি হয় এবং গত বছরের ২৮ নভেম্বর হাইকোর্টের আদেশটি স্থগিত করা হয়। বিষয়টি এখনও উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, দুদকে চাকরি বিধিমালার ৫৪(২) ধারা প্রয়োগ নিয়েও বৈষম্য রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। চেয়ারমান ও কমিশনাররা সরকারের জনপ্রশাসন বিভাগে চাহিদাপত্র দিয়ে ডেপুটেশনে নিয়োগ দেন। দুদক সংশ্লিষ্টরা জানান, দুদকে পরিচালক ও মহাপরিচালক পদের বেশিরভাগই প্রশাসন ক্যাডার থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু দুদকের চাকরি বিধিামালার ৫৪(২) ধারা অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সুযোগ নেই। অন্যান্য ক্যাডারের কোনও কর্মকর্তা অসদাচরণ করলে তাকে নিজ বিভাগে ফেরত পাঠানো হয়। দুদকের ক্ষেত্রেও সেটাই হওয়া যৌক্তিক।

দুদকের একজন মধ্যম সারির কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি আসলে দুদকের নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে একটি বৈষম্যমূলক আচরণ। একই অফিসে একই ধারা দুইভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এজন্য আমরা ধারাটাই বাতিলের জন্য আবেদন করেছি।’

দুদকের একটি সূত্র জানায়, সরাসরি দুদকে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ পরিচালক পদ পর্যন্ত পদোন্নতি পান। দুদকের ইতিহাসে একজনমাত্র কর্মকর্তা মহাপরিচালক হতে পেরেছিলেন। পরিচালক ও মহাপরিচালক পদের জন্য প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দুদক মূলত দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধান করে থাকে। এক্ষেত্রে অনুসন্ধান বা তদন্ত বোঝেন না এবং আইন সম্পর্কে ধারণা নেই, এমন কর্মকর্তাদেরও প্রেষণে এই সংস্থায় নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে দুদকের মহাপরিচালকের আটটি পদের সাতটিতেই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একটি পদে রয়েছে জুডিশিয়ারি বিভাগের কর্মকর্তা। পরিচালকের ২৭টি পদের আটটিই প্রশাসন ক্যাডার থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ প্রেষণে কাউকে নিয়োগ দিতে হলে কাজের বিষয়ে দক্ষতা অনুযায়ী তদন্ত  করে এবং আইন সম্পর্কে ধারণা রয়েছে, এমন ব্যক্তি বা পুলিশ থেকে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।

দুদকের চাকরি বিধিমালার ৫৪(২) ধারার প্রয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে দুদক সচিব মাহবুব হোসেন বলেন, ‘এখনে যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিষয় না। এখানকার সবাই যোগ্য। সবাই যোগ্য বলেই দুদকের কাজে গতিশীলতা রয়েছে। আমি এখানে নতুন এসেছি। এখানে যে অর্গানোগ্রাম রয়েছে, এসব বিষয় আমার কানেও এসেছে। এখানে মিস ম্যাচ আছে কিনা এবং এখানে করার কিছু আছে কিনা সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’

 

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
নিয়োগ-টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ: এলজিইডির সাবেক পিডির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে দুদক
দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার জ্যাকব, কারাফটকে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ
প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের এমডিসহ দু’জনের আয়কর নথি জব্দের আদেশ
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম