আইন অনুযায়ী নতুন কীটনাশক আমদানি করতে হলে বছরব্যাপী মাঠ পরীক্ষা করাতে হবে। পরিবেশে ওই কীটনাশকটির ক্ষতিকর প্রভাবের মাত্রা নিশ্চিত করতে হয় কেনার আগে। কিন্তু পরীক্ষা ছাড়াই বেলে মাছি ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে ডেল্টামেথ্রিন ও বেন্ডিওকার্ব কীটনাশক কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সেন্ট্রাল মেডিক্যাল স্টোর ডিপো (সিএমএসডি)।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কীটতত্ত্ববিদরা। এ নিয়ে এক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আইনি নোটিশও দিয়েছেন। কিন্তু নোটিশের জবাব দেয়নি সিএমএসডি তথা কেন্দ্রীয় ঔষধাগার।
কীটতত্ত্ববিদরা বলেছেন, আইন অনুযায়ী মাঠ পরীক্ষা ছাড়া এ ধরনের কোনও ওষুধ আমদানির সুযোগ নেই।
দি পেস্টিসাইড রুলস ২০১০ (সংশোধিত) অনুযায়ী কোনও কীটনাশক ক্রয়ের ক্ষেত্রে দেশীয় আবহাওয়ায় দুই মৌসুমে পূর্ণাঙ্গ মাঠ পরীক্ষা করতে হবে। এ পরীক্ষা জাতীয় সংস্থার অধীনে হওয়াও বাধ্যতামূলক। তথাপি, ওই রিপোর্ট ছাড়াই গত ৯ মার্চ দুই লটে টেন্ডার আহ্বান করে সিএমএসডি।
একটি পাকিস্তানি কোম্পানিকে সুবিধা দিতে টেন্ডারের শর্ত শিথিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ অপর ওষুধ আমদানিকারকদের।
জানা গেছে, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি কীটনাশক ক্রয় প্যাকেজের প্রি-বিড সভায় ৭টি কোম্পানি অংশ নেয়। ৬টি কোম্পানি জানায়, কীটনাশকের স্বাস্থ্যঝুঁকি, শিশুস্বাস্থ্য ও পরিবেশের বিষয়টি মাথায় রেখে দরপত্রের স্পেসিফিকেশনে আইন অনুযায়ী দেশীয় পরিবেশে ২টি জাতীয় সংস্থার অধীনে পূর্ণাঙ্গ মাঠ পরীক্ষার শর্তও যুক্ত করতে হবে।
কিন্তু সিএমএসডি গত ৯ মার্চ যে দরপত্র প্রকাশ করে তাতে প্রি-বিড মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করা হয়।
দেশীয় পরিবেশে ২টি জাতীয় সংস্থার অধীনে পূর্ণাঙ্গ মাঠ পরীক্ষার বিধান থাকলেও শুধু ‘সিমিলার’ শব্দ যোগ করে যেকোনও মাঠ পরীক্ষার অভিজ্ঞতা চেয়ে দরপত্র আহ্বান করে সিএমএসডি।
অথচ কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, যে দেশ বা এলাকায় ওষুধটি প্রয়োগ করা হবে সেখানকার পরিবেশেই মাঠ পরীক্ষার রিপোর্ট হতে হবে। সব দেশের পরিবেশ-প্রকৃতি এক নয়।
এর আগে, এ ধরনের ওষুধের ক্ষেত্রে মাঠ পরীক্ষা উঠিয়ে দিতে নোকন নামের পাকিস্তানি কোম্পানিটি ইতোপূর্বে উচ্চ আদালতে রিট করেছিল। শুনানি শেষে আদালত রিটটি খারিজ করে দেন।
তারপরও পাকিস্তানি কোম্পানিটিকে সুবিধা দিতে দরপত্র চাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
নোকন লিমিডেটেডের দায়ের করা রিটের আদেশের আইনগত মতামত দিতে এসিআই ফর্মুলেশন লিমিটেডের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু সিএমএসডি সেটা দেয়নি।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যদি দেশে ওই কীটনাশকের ফিল্ড ট্রায়াল না হয়ে থাকে তাহলে সেটি কেনা যাবে না। আইন অনুযায়ী ওই দরপত্র গ্রহণযোগ্য হবে না।
কেন ফিল্ড ট্রায়াল লাগবে জানতে চাওয়া হলে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, একই ইনসেক্টিসাইডে বাংলাদেশের কীট ও অন্য দেশের কীট-এর রেজিস্ট্যান্স প্যাটার্ন এক না। বাংলাদেশের মশা যে ডোজে মরবে, জাপানের মশা হয়তো তারচেয়ে কম ডোজে মরবে। কারণ জাপানে মশার রেজিস্ট্যান্স কম। তাই ফিল্ড ট্রায়াল ছাড়া এই ওষুধ কেনা ঝুঁকিপূর্ণ।
ওষুধের ফিল্ড ট্রায়াল থাকাটা বাধ্যতামূলক স্বীকার করলেও সিএমএসডির পরিচালক মো. মোখলেসুর রহমান সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, উভয় লটেই টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশনে সম্ভাব্য দরদাতা কর্তৃক প্রস্তাবিত ইনসেক্টিসাইডের জন্য সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার বিষয়টি বলা হয়েছে।
‘যে প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন সনদ দাখিল করবে তাকে বিধিতে বর্ণিত প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত ফিল্ড ট্রায়ালের শর্ত পূরণ করেই নিবন্ধন নিতে হবে। এক্ষেত্রে সিএমএসড-এর ক্রয় প্রক্রিয়ায় কোনও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি।’
জানা গেছে, কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি)-এর বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য ওষুধগুলো কেনা হচ্ছে। সিডিসিও সিএমএসডিকে জানিয়েছে আমদানি করা ওষুধগুলোর মাঠ পরীক্ষা করতে হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিডিসির এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মাঠ পরীক্ষার রিপোর্ট ছাড়া যদি কোনও ওষুধ কেনা হয় সেটি আমরা গ্রহণ করবো না। গত বছরও সিএমএসডি একই প্রক্রিয়ায় এই ওষুধ কেনার চেষ্টা করেছিল। তখন সিডিসির বাধার কারণেই তা করতে পারেনি।








