X
বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২২
২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

ডিজে দম্পতি ‘হত্যাকাণ্ডের’ ৪ বছর পর আসামিদের স্বীকারোক্তি

আমানুর রহমান রনি
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৭:০৯আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৮:১১

২০১৮ সালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান সেই সময়ের জনপ্রিয় ডিজে (ডিস্ক জকি) দম্পতি সাদমান সাকিব ওরফে ডিজে সাকিব (২৪) ও তাসফিয়া জাহান নীল ওরফে ডিজে নীলা (২০)। পরে হাসপাতাল থেকে দেওয়া মৃত্যুসনদে তাদের মৃত্যুর কারণ লেখা হয়—‘হার্ট ফেল বা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু’। তবে হঠাৎ দুজন সুস্থসবল মানুষ এভাবে মারা যাওয়ায় জন্ম দেয় নানা প্রশ্নের।

এ ঘটনার এক মাস পর ডিজে সাকিবের বাবা মাসুদুর রহমান (৪৮) প্রথমে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ তাকে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেয়। পরে তিনি ২০১৮ সালের ২৮ আগস্ট আদালতে হত্যা মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয় সাকিবের বন্ধু ও ছোট ভাই ডিজে মারফি (২২), ডিজে শুভ (২২) ও ডিজে রিফাতকে (২১)। পরে আদালতের নির্দেশে ঘটনার ৮৪ দিন পর মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করা হয়।

মামলার চার বছর পর ওই তিন ডিজের মধ্যে দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পরে গ্রেফতার দুই ডিজে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। নিহত দম্পতিকে সহযোগিতা না করার কথাও স্বীকার করেছে তারা। এত দিন তারা সাকিবের পরিচিতি ব্যবহার করে সারা দেশে ডিজে পার্টিতে অংশ নিতো।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে দুই অভিযুক্ত জানায়, ডিজে দম্পতি সাদমান সাকিব ও তাসফিয়া জাহান নীলকে একটি ঘরোয়া পার্টিতে অতিরিক্ত মাদক নিতে বাধ্য করেছিল তারা। অতিরিক্ত মাদক সেবন করিয়ে তাদের বাসায় রেখে ওই তিন জন রাতে চলে যায়। অসুস্থ হয়ে সাকিব-নীলা পরদিন তাদের সহযোগিতা চাইলেও তারা কেউ এগিয়ে আসেনি। ধীরে ধীরে সাকিব-নীলা বাসায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পরিবার ও স্বজনরা যখন তাদের উদ্ধার করে, ততক্ষণে আর কিছু করার ছিল না চিকিৎসকদের।

মামলার নথি থেকে জানা যায়, মামলার পর আদালত লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করার নির্দেশ দেন। মামলাটি প্রথমে খিলগাঁও থানা পুলিশ তদন্ত করে। তারা প্রায় দুই বছর তদন্তের পর সব আসামিকে অব্যাহতি দিয়ে মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন তদন্ত কর্মকর্তা ও খিলগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসাআই) বিজন কুমার বিশ্বাস।

পরে মামলার বাদী সাকিবের বাবা মাসুদুর রহমান ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি দেন। এরপর আদালত মামলাটি সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন। ২০২১ সালের ১ অক্টোবর মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। বর্তমানে সিআইডি মামলা তদন্ত করছে।

গত ৩০ আগস্ট দুই ডিজে রিফাত ও মারফিকে গ্রেফতার করে সিআইডি। তাদের আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নেয় সিআইডি। পরে গত ১ সেপ্টেম্বর তারা দুজন আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তি দেয়।

যে উপলক্ষে হয়েছিল পার্টি
২০১৮ সালে গ্রেফতার মারফি উচ্চমাধ্যমিক পাস করে। এ জন্য সে সবাইকে খাওয়াতে চায়। পরে ১৯ জুলাই রাতে পার্টির আয়োজন হয় সাকিবের স্ত্রীর বনশ্রীর বাসায়। রাত ৯টা থেকে শুরু হয়ে ভোর পর্যন্ত চলে পার্টি। সেখানে সাকিব-নীলা দম্পতিসহ অংশ নেয় তখনকার উদীয়মান ডিজে মারফি, ডিজে শুভ ও ডিজে রিফাত। তারা সাকিবের সহযোগী হিসেবে কাজ করতো।

সিআইডির তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পার্টিতে মদ ও মাদক নিয়ে আসে ডিজে শুভ। তার রাতে পার্টিতে বিভিন্ন খাবারের পাশাপাশি মদ ও মাদক সেবন করে। তবে ওই তিন ডিজে কম সেবন করে। কৌশলে বিভিন্ন কথা বলে ও প্রলুব্ধ করে সাকিব ও নীলাকে অতিরিক্ত মদ সেবন করানো হয়। এ ছাড়া তারা মদের সঙ্গে ইয়াবা সেবন করে। ২০ জুলাই ভোরে মারফি, শুভ ও রিফাত চলে যায়। এদিকে অসুস্থ হয়ে পড়ে সাকিব ও তার স্ত্রী নীলা।’

এ কর্মকর্তা আরও বলেন,‘অতিরিক্ত মাদক সেবনের কারণে সাকিব ও নীলা অসুস্থ হয়ে পড়ে। তারা বাসায় স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। প্রথমে তারা ভেবেছিল, মাদকের তীব্রতায় এমন হয়েছে, ধীরে ধীরে কেটে যাবে। তবে এই অপেক্ষা আরও ক্ষতি করেছে। অচেতন হয়ে যায় সাকিব। সাকিবের এমন অবস্থা দেখে সাহায্য চেয়ে রিফাত, মারফি ও শুভকে ফোন দেয় নীলা। তবে কেউ ফোন ধরেননি।’

সিআইডির হাতে গ্রেফতারের পর আদালতের কাছে রিফাত ও মারফি স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছে, পরের দিন তারা একটি পার্টিতে ছিল, তাই ফোন ধরতে পারেনি। মৃত্যুর খবর শোনার পর ভয়ে আর এদিকে আসেনি। সাকিবের স্ত্রী তাদের তিনজনকেই একাধিকবার ফোন দিয়েছিল। আসামিদের বিরুদ্ধে এই অবহেলাজনিত দুজনের মৃত্যু হয়েছে অভিযোগ আনা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান।

গ্রেফতার মারফি ও রিফাত

সহযোগিতা না পেয়ে সাকিবের বাল্যবন্ধুদের ফোন দেয় নীলা
তিন সহকর্মীকে ফোনে না পেয়ে এরপর নীলা সাকিবের বাল্যবন্ধু ইশতিয়াককে ফোন দিয়ে সাহায্য চায়। তবে ওই সময় ইশতিয়াক ঢাকার বাইরে থাকায় সে সাকিবের আরেক বন্ধু বিজয়কে ফোন দেয়। বিজয় সাকিবের মেজো ভাই দাইয়ান মাহিরকে ওই দিন রাতে ফোন করে বলে, ‘সাকিব অসুস্থ, তুই বাসায় গিয়ে দেখ সাকিবের কী হয়েছে?’

এরপর মাহির তার মাকে ফোন দিয়ে জানায়, ‘সাকিব অসুস্থ, আমি ওর বাসায় যাচ্ছি।’ ঘটনার দিন সাকিবের বাবা, মা ও ছোট ভাই কক্সবাজারে ছিলেন। মারফি তার বড় ভাই সাকিবের খিলগাঁও থানার বনশ্রীর বাসায় যায়।

সেখানে গিয়ে দেখতে পায়, তার ভাবি নীলা এলোমেলো কথা বলছে। ঠিকভাবে কথা বলতে পারছে না। মাহির ও সাকিবের বন্ধুরা মিলে সাকিবকে প্রথমে বনশ্রীর ফরাজী হাসাপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের পরামর্শে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে আনা হয়। তবে তার অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার কথা বলেন। তবে সেখানে লাইফ সাপোর্টের ব্যবস্থা নেই বলে অন্য হাসপাতলে নিতে বলেন। এরপর সাকিবকে লাইফ সাপোর্ট দিতে বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ নেয়। অবশেষে ২১ জুলাই রাত দেড়টার দিকে মগবাজারের রাশমনো হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।

এদিকে ফরাজ হাসপাতালে নীলার অবস্থার অবনতি হলে তাকেও হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে আনা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১৮ সালের ২১ জুলাই ভোর পৌনে ৬টার দিকে তার মৃত্যু হয়। এ সময় তার পরিবার তার সঙ্গে ছিল। অপরদিকে রাশমনো হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকা ডিজে সাকিব ২২ জুলাই বিকালে মারা যান। তাসফিয়া জাহান নীলাকে মোহাম্মদপুরের রায়ের বাজার কবরস্থানে ও সাকিবকে শাহজাহানপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

সাকিবের খ্যাতি ব্যবহার করে চলছে ডিজে গ্রুপ
সিআইডি মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের ক্লু পেতে থাকে। প্রকৃত ঘটনা বের করতে নামীয় আসামিদের কাযক্রমের উপর নজরদারি বৃদ্ধি করে। সিআইডি দেখতে পায়, ফেসবুক ও ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাকিবের পরিচিতি ও খ্যাতি ব্যবহার করে সারাদেশে ডিজে হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে মারফি, শুভ ও রিফাত। নিজেদের নামে পাশে কেউ কেউ ডিজে জুনিয়র সাকিবও যুক্ত করেছে। সাকিব ২০১১ সাল থেকে ডিজে হিসেবে নিজের পেশাকে বেছে নিয়েছিলেন। নীলাকে তিনি ভালোবেসে বিয়ে করেন। তিনি ডিজে কমিউনিটিতে খুব জনপ্রিয় ছিলেন। অল্প সময় তিনি পরিচিতি লাভ করেন।

বিচারের জন্য লড়ছেন সাকিবের বাবা মা
ঘটনার পর থেকেই এই মৃত্যুর জন্য সাকিবের সহযোগীদের দায়ী করে আসছেন সাকিবের বাবা মাসুদুর রহমান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি এটাই চেয়েছিলাম, যাতে অভিযুক্তদের হাতে হাতকড়া লাগে। আমার বিচার হয়েছে। আমি চার বছর ধরে থানা পুলিশ, আদালত, সিআইডিতে দৌড়াচ্ছি। অবশেষে সিআইডির নতুন পুলিশ সুপার কামাল হোসেন আসামিদের গ্রেফতার করেছে। তারা তাদের দোষও স্বীকার করেছে। আমি তাদের শাস্তি চাই।’

এদিকে বড় সন্তান হারিয়ে সাকিবের মা এখনো বিলাপ করেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছেলের কথা মনে পড়লে আমি পাগল হয়ে যাই। আমি অভিযুক্তদের বিচার চাই।’

তদন্ত সংস্থা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার কামাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা মামলাটি তদন্ত করছি। এখনো একজন আসামি পলাতক। শুভকে গ্রেফতার করলেই এই মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া যাবে। আমরা তাকে গ্রেফতারে কাজ করছি।’ ময়না তদন্তের প্রতিবেদনে মিথানল (মিথানল মেশানো অ্যালকোহল) পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

/এআরআর/এনএআর/
মাফলার দিয়ে ৬ স্টাইল
মাফলার দিয়ে ৬ স্টাইল
ডাকঘর ডিজিটাল করতে সহযোগী হতে চায় বাংলালিংক
ডাকঘর ডিজিটাল করতে সহযোগী হতে চায় বাংলালিংক
নয়াপল্টনের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের
নয়াপল্টনের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের
প্রধানমন্ত্রী কি সত্য তথ্য পাচ্ছেন?
প্রধানমন্ত্রী কি সত্য তথ্য পাচ্ছেন?
সর্বাধিক পঠিত
রোনালদোর পরিবর্তে দলে জায়গা পেয়ে হ্যাটট্রিক গোঞ্জালো রামোসের
রোনালদোর পরিবর্তে দলে জায়গা পেয়ে হ্যাটট্রিক গোঞ্জালো রামোসের
প্রথম একাদশ থেকে বাদ, বেঞ্চে রোনালদো
প্রথম একাদশ থেকে বাদ, বেঞ্চে রোনালদো
নিষেধাজ্ঞার জাল ভেদ করে কাতার কাঁপানো মিস ক্রোয়েশিয়া!
নিষেধাজ্ঞার জাল ভেদ করে কাতার কাঁপানো মিস ক্রোয়েশিয়া!
সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে ১৫ দেশের বিবৃতি
সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে ১৫ দেশের বিবৃতি
শৈত্যপ্রবাহ আসছে
শৈত্যপ্রবাহ আসছে