X
শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৩
১৩ মাঘ ১৪২৯

মানবপাচার চক্রে জড়িত শাহজালালের ইমিগ্রেশন পুলিশের সদস্য!

আব্দুল হামিদ
২১ অক্টোবর ২০২২, ২২:৩৭আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২২, ১৭:৩৭

সামিউল হোসেন সামি (২৬), সদ্য লেখাপড়া শেষ করা এক তরুণ। সাড়ে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে দালালের মাধ্যমে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ইতালির উদ্দেশে উড়াল দেন তিনি। ভুয়া ভিসা নিয়ে কোনও ভোগান্তি ছাড়াই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন পার হয়ে যান তিনি। কিন্তু তুরস্কের ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনে জাল ভিসায় ভ্রমণ বিষয়টি নজর আসলে আটকা পড়েন সামি। ফিরতি ফ্লাইটে তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। প্রশ্ন হলো, তথ্য জালিয়াতি করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পাড় হলো কীভাবে? বাংলাদেশের ইমিগ্রেশনের অভ্যন্তরীণ তদন্তে ধরা পড়েছে, এতে শাহজালালের ইমিগ্রেশন পুলিশের সদস্য জড়িত ছিল। পরে জড়িত পুলিশ সদস্যকে এপিবিএনে বদলি করা হয়েছে।

গত ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি ইতালির উদ্দেশে টার্কিশ এয়ারলাইন্স টিকে-৭১৩ ফ্লাইটে দেশে ছাড়েন সামিউল হোসেন সামি। জানা গেছে, সেদিন ঢাকা থেকে নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লাইট ছেড়ে গেলেও ইস্তাম্বুল থেকে নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লাইট না ছাড়ায় পরিবর্তন হয়ে যায় ইমিগ্রেশন অফিসারদের শিফট। এতেই ভুয়া ভিসা নিয়ে ইতালি যেতে গিয়ে ধরা পড়েন সামি। পরে তাকে দেশে ফেরত পাঠায় কর্তৃপক্ষ। 

লেখাপড়া শেষ করে বাবার ব্যবসা দেখাশুনা করতেন সামি। আর তার বড় ভাই আমেরিকা প্রবাসী। পরিবারের সম্মতিতে মাদারীপুরের স্থানীয় এক দালালের সঙ্গে ইতালি যাওয়ার জন্য সাড়ে ১২ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। এরমধ্যে ৪ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়। আর বাকি টাকা ভিসা হওয়ার পরে দেওয়া হয় বলে সামি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান।

চলতি বছরের আগস্ট মাসে একইভাবে ইউরোপে যাওয়ার সময় জাল ভিসার জন্য দেশে ফেরত পাঠানো হয় আরেক তরুণী রোদেলাকে। রোদেলা (ছদ্মনাম) পর্তুগাল যাওয়ার জন্য ২৮ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। বনানী এলাকার বিদেশে লোক পাঠানো এজেন্সির সঙ্গে। কিন্তু তারা রোদেলাকে জাল ভিসায় পর্তুগাল পাঠান।

ভুক্তভোগী বলেন, আমি ঢাকা ইমিগ্রেশন থেকে কোনও বাধা ছাড়াই পার হয়। পরে সেখানে যাত্রা বিরতির পরে ইমিগ্রেশন চেকে গেলে আমাকে জানানো হয় ভিসা জাল। একথা শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তারা আমাকে দেশে ফেরত পাঠায়। দেশে ফিরে কয়েকদিন পরে ওই অফিসে গিয়ে দেখি বন্ধ। অফিসের নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও কোনও সাড়া পাইনি। এখন বিষয়টি পুলিশের গোয়েন্দা শাখাকে (ডিবি) জানিয়েছি।

সামিউল হোসেন সামির মামলার এক তদন্ত কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সামিউল হোসেনের ইতালি যাত্রার আগেই বাংলাদেশ ও তুরস্কের ইমিগ্রেশন থেকে সব ব্যবস্থা করে রাখে মানবপাচার চক্রটি। দুই দেশের সুনির্দিষ্ট ডেস্ক ম্যানেজ করে রাখেন তারা। সঠিক সময় বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন পার হলেও ফ্লাইট ছাড়তে কিছুটা দেরি হওয়ায় তুরস্কের ইস্তাম্বুল ইমিগ্রেশনের সুনির্দিষ্ট কর্মকর্তার ডিউটির শিফট পরিবর্তন হয়ে যায়। এতে করে ঢাকা থেকে জাল ভিসা নিয়ে ইমিগ্রেশন পার হতে পারলেও ইস্তাম্বুলে গিয়ে ধরা পড়ে। আর তাতেই ফিরে আসতে হয় সামিউলকে। 

সিআইডির মানবপাচার নিয়ে কাজ করা এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশে মানবপাচারে সক্রিয় রয়েছে একাধিক চক্র। এদের মধ্যে বেশ কয়েকটি চক্র আন্তর্জাতিক লিংক ম্যানেজ করে। আর তারাই ইউরোপ, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে মানবপাচারের কাজ করছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে কাউকে সরাসরি এসব দেশে পাঠান। আবার কাউকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে এসব দেশে পাচার করেন। 

সামি বলেন, তুরস্কের ইস্তাম্বুল ইমিগ্রেশন তার পাসপোর্ট ও কাগজপত্র জব্দ করে দেশে ফেরত পাঠান। এরপর ঢাকা বিমানবন্দর থেকে কোনও ঝামেলা ছাড়াই বের হয়ে মাদারীপুর পরিবারের কাছে ফিরে আসি। কিন্তু তার কয়দিন পরে মাদারীপুর থেকে আমাকে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেফতারের পরে এক মাস ১৭ দিন কারাগারে ছিলাম। পরে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে এখন মাদারীপুর পরিবারের সঙ্গেই আছি।

সামির ভাষ্য, তিনি যে জাল ভিসা নিয়ে ইতালির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন, সেটা তিনি জানতেন না। ঢাকা ইমিগ্রেশন থেকে কোনও ঝামেলা ছাড়াই পার হয়ে যায়। তাহলে কীভাবে তাকে ঢাকা ইমিগ্রেশন ছেড়ে দিল, সেটাও জানেন না সামি। 

মামলার এজাহারে থেকে জানা যায়, সামি তার স্ত্রীর সঙ্গে বসবাস করতে ইতালিতে যাওয়ার জন্য বিএমইটি থেকে ছাড়পত্র নেন। যদিও সামিউল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমার কোনও স্ত্রী নেই। আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। যদিও সামিউলের পাসপোর্টে তাকে বিবাহিত হিসেবে দেখানো হয়েছে। সামিউলের পাসপোর্ট অনুযায়ী তার স্ত্রীর নাম ছিল মিতু আক্তার। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সামি বলেন, ইতালিতে যাওয়ার জন্য দালালের সঙ্গে মোটা অংকের টাকায় চুক্তি হয়। পরে তারাই সব কাগজপত্র প্রস্তুত করে আমাকে পাঠায়। এছাড়া তাকে বাংলাদেশে অবস্থিত দূতাবাসেও দাঁড়াতে হয়নি। টাকার চুক্তি অনুযায়ী সব কিছু দালালরা করে দেন।

মামলার এজাহার থেকে আরও জানা যায়, জাল ভিসা নিয়ে ইস্তাম্বুল ইমিগ্রেশনে গিয়ে ধরা পড়েন সামি। পরে জাল ভিসায় ভ্রমণ করার অভিযোগে দুই দিন পরে ২৯ জানুয়ারি ইস্তাম্বুল থেকে টার্কিশ এয়ারলাইনসের টিকে-৭১২ ফ্লাইটে সামিউল হোসেনকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। পরের দিন ২০২১ সালের ৩০ জানুয়ারি এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে সামিউল হোসেনের পাসপোর্ট দেন। নিয়ম অনুযায়ী পাসপোর্ট ও ডিপোর্ট পত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হস্তান্তর করার কথা থাকলেও এ সময় সামিউলকে হস্তান্তর করেনি তুরস্ক এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ।

পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, এমন ঘটনায় নিয়মানুযায়ী জাল ভিসায় কোনও যাত্রীকে দেশে ফেরত পাঠালে কর্তৃপক্ষ তার ডিপোর্ট লেটার, পাসপোর্ট ও অভিযুক্তকে ইমিগ্রেশনের কাছে হস্তান্তর করতে হয়। কিন্তু টার্কিশ এয়ারলাইন্সে কর্তৃপক্ষ যাত্রীকে না দিয়ে শুধু তার পাসপোর্ট আর ডিপোর্ট লেটার দেন। এক সপ্তাহ পরে সিআইডি সামিউল হোসেনকে গ্রেফতার করে।

জাল ভিসা নিয়ে বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগে সামিউল হোসেনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে সামিউল বলেছে, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। দালালেরা তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। কিন্তু পুলিশ এটা মানতে রাজি না। তারা বলছে, সামিউল পারিবারিকভাবে সাড়ে ১২ লাখ টাকা চুক্তিতে ইতালিতে যাওয়ার জন্য দেশ ছাড়ে। এছাড়া সে জাল ভিসায় ভ্রমণ করছে সেটাও সে জানতো।

সামিউলের ভিসা আসল না নকল বিষয়টি জানতে ২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর ঢাকার ইতালি দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত বরাবর চিঠি লেখে সিআইডির ঢাকা মেট্রো উত্তরের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. খালিদুল হক হাওলাদার। মানবপাচার প্রতিরোধে সহযোগিতার জন্য সিআইডি থেকে চিঠি দেওয়া হয় বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান এই কর্মকর্তা। 

ইতালি দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত বরাবর লেখে চিঠি বাংলা ট্রিবিউনের হাতে আসলে এতে দেখা যায়, ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির উপ-পরিদর্শক মো. রাশেদুজ্জামান ঢাকার ইতালির রাষ্ট্রদূতকে লেখা চিঠিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। সেই সঙ্গে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সামিউল হোসেনের ভিসা যাচাই-বাছাইয়ের অনুরোধ করেন। পরে ঢাকার ইতালির দূতাবাস সামিউল হোসেনের পাসপোর্টে ০৪৬৮৭৮২৩৯ নম্বরের যে ভিসাটি রয়েছে, তা জাল বলে সিআইডিকে জানিয়েছে।

ওই ঘটনায় গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি সামিউল হোসেনকে ১ নম্বর আসামি করে বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা করেন হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন ‘ক’ পুলিশের পরিদর্শক সাজ্জাদ হোসেন। এতে ২ নম্বর আসামি করা হয় অজ্ঞাতনামা মানবপাচারকারী চক্রকে।

জাল ভিসা নিয়ে ঢাকার ইমিগ্রেশন কীভাবে পার হলেন সামিউল, এ বিষয় জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, ‘আমিও বিষয়টি পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কাছে জানতে চেয়েছিলাম। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, সেদিন নতুন একজন কর্মকর্তা ছিল ডিউটি করছিলেন, তিনি ভুল করে ফেলেছেন। ঢাকার ইমিগ্রেশনে মাঝেমাঝে চাপ থাকলে, সব ভিসা দেখার সময় হয় না।

বাংলাদেশে থাকা পশ্চিমা দূতাবাসগুলোতে ভিসা সঠিক কিনা জানতে চেয়ে প্রায় সময় চিঠি দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে ভুল কি বারবারই হয়? এবিষয়ে রাশেদুজ্জামান বলেন, ‘এ প্রশ্নটি সঠিক। আসলে ইমিগ্রেশনের দিকেই আঙুল যায়।’

এ ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন পুলিশের সেই সদস্যকে আসামি করা না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইমিগ্রেশন পুলিশের উপ-পরিদর্শক আরিফুল ইসলামকে আসামি করা হয়নি। কারণ এসবি ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। ইতিমধ্যে তাকে শাস্তিস্বরূপ এসপিবিএনে বদলিও করা হয়েছে।

এজাহারের ১ নম্বর আসামি সামিউলকে চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সামিউল মূলত ভুক্তভোগী, পাচারের শিকার হয়েছে। এজন্য তাকে আসামির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আর যিনি পাচারকারী ছিলেন মাদারীপুরের সামিউলের গ্রামের কে ওবায়দুল করিম, তিনি ২০১৯ সালে করোনায় মারা গেছেন। দালালের মধ্যে শুধু তারই খোঁজ পাওয়া গেছে। বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন পুলিশ এজাহারে ভুল করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসবি’র ইমিগ্রেশন শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘অনেকেই সঠিক ভিসা নিয়ে অন্য দেশে যায়। তবে তারা সঙ্গে করে জাল ভিসাও সংগ্রহ করে নিয়ে যান। পরে ঢাকা ইমিগ্রেশন পার জাল ভিসা লাগিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এমন অভিযোগে অনেকেই দেশে ফেরত এসেছেন। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

/ইউএস/
সর্বশেষ খবর
বাবা হওয়ার পরদিন মাদ্রাসাশিক্ষকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
বাবা হওয়ার পরদিন মাদ্রাসাশিক্ষকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব প্রস্তুতি: অবকাঠামোর উন্নয়ন
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব প্রস্তুতি: অবকাঠামোর উন্নয়ন
১০৭ ধরে চলছে হাডুডু খেলার আয়োজন, গ্রামজুড়ে উৎসব
১০৭ ধরে চলছে হাডুডু খেলার আয়োজন, গ্রামজুড়ে উৎসব
বন বিভাগের জায়গা দখল করে প্রভাবশালীদের মার্কেট নির্মাণ
বন বিভাগের জায়গা দখল করে প্রভাবশালীদের মার্কেট নির্মাণ
সর্বাধিক পঠিত
বিয়ে করে বিপাকে অভিনেতা তৌসিফ!
বিয়ে করে বিপাকে অভিনেতা তৌসিফ!
উপহার পেয়েছিলেন মাত্র চারটি, এখন তাদের ছাগল-ভেড়া ৬৩টি
উপহার পেয়েছিলেন মাত্র চারটি, এখন তাদের ছাগল-ভেড়া ৬৩টি
রাজধানীতে বিক্রি হচ্ছে জমজমের পানি
রাজধানীতে বিক্রি হচ্ছে জমজমের পানি
কলকাতার দেয়ালে দেয়ালে তাসনিয়া: ফারিণের পাশে দাঁড়ালেন প্রসেনজিৎ
কলকাতার দেয়ালে দেয়ালে তাসনিয়া: ফারিণের পাশে দাঁড়ালেন প্রসেনজিৎ
প্রধানমন্ত্রী কুমিল্লা নামেই বিভাগ দিন: এমপি বাহার
প্রধানমন্ত্রী কুমিল্লা নামেই বিভাগ দিন: এমপি বাহার