জমির দলিল-দস্তাবেজ, খাজনা ও রশিদ ঠিক থাকলেও ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সরকার মকবুল হোসেনের নিজের জমির একাংশ খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ভূমি জরিপে নানা ধরনের অনিয়মে এমনটি হয়েছে বলে মনে করেন সরকার দলীয় এই এমপি। তার ক্ষেত্রে জমিটি খাস খতিয়ান থেকে কেটে নিজ নামে অন্তর্ভুক্ত করতে বেগ পেতে না হলেও দেশের সাধারণ মানুষের জন্য এটি সহজ হতো না বলে মনে করেন তিনি। এ কারণে তিনি ভূমি জরিপে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২৭ অক্টোবর) বাংলা ট্রিবিউনকে তথ্য জানিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি।
গত ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে ভূমি জরিপকালে জনগণের হয়রানি নিয়ে আলোচনা হয় বলে বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে ওই কার্যবিবরণী অনুমোদন দেওয়া হয়।
আগের বৈঠকে কমিটির সভাপতি ও পাবনা-৩ আসনের সদস্য মকবুল হোসেন বলেছিলেন, ভূমি জরিপে অনিয়মের কারণে সারা দেশের মানুষ নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এমনকি, তার নিজের জমির কাগজপত্র সঠিক থাকা সত্ত্বেও অর্ধেক জমি খাস হয়ে গেছে।
পদে পদে হয়রানির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সিএস ও এসএ রেকর্ডের সার্টিফায়েড কপি নিতে গিয়ে দেখা গেলো— কাগজ ছেঁড়া। এসি (ল্যান্ড) অফিসে নব নিয়োগকৃত কর্মকর্তা দু'টি উপজেলার দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছেন।’
তিনি বলেন, ‘কাউকে যেনো ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন না হতে হয়, সেটা নিশ্চিত করা দরকার। ডিজিটাল জরিপ হলে দুর্নীতির মাধ্যমে সৃষ্ট সমস্যাগুলো ভবিষ্যতে হবে না। তবে যাতে কোনও যান্ত্রিক ত্রুটি না থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’
জবাবে ওই বৈঠকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, সারা দেশের ৮টি বিভাগের মৌজা ম্যাপ ডিজিটাইজ করার উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। এ জন্য দুটি স্যাটেলাইট ইমেজ কেনার চুক্তি করা হয়েছে। আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে একটি ইমেজ পাওয়া যাবে। মৌজা ম্যাপগুলো ডিজিটাইজ হওয়ার পরে ইমেজ স্থাপন করা হলে ঘরে বসেই সারা দেশের ভূমির শ্রেণি দেখা যাবে। পরবর্তী সময়ে একটি আপডেটেড ইমেজ মৌজাম্যাপ স্থাপন করলে কোন জমির কী কী পরিবর্তন ঘটেছে, সে-বিষয়ে সিস্টেম থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নোটিশ পাওয়া যাবে। পটুয়াখালীতে একটি পাইলট প্রকল্প ভূমিমন্ত্রী উদ্বোধন করছেন বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মকবুল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তার একটি দাগে ৪৫ শতাংশ জমি ছিল। তিনি নিয়মিত ওই জমির খাজনা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু ই-নামজারি করতে গিয়ে দেখতে পান— ওই জমির ২৬.৫ শতাংশ সরকারি খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পিতার উত্তাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত তার ওই জমির সব ধরনের কাগজপত্র ঠিক থাকলেও কেন এমনটি হয়েছিল, সেটা তার কাছে বোধগম্য নয়। জরিপের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তারাই ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে এটা করে থাকতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। পরে অবশ্য তিনি ওই জমি নিজের নামে ফেরত এনেছেন বলেও জানান।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার ক্ষেত্রে হয়তো সহজে ফেরত আনতে পেরেছি। কিন্তু সাধারণ নাগরিকের জন্য এটা সত্যি কঠিন হতো। এজন্য আমি বৈঠকে জরিপের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে বলেছি। কেউ অনিয়ম করলে শক্ত ব্যবস্থা নিতে বলেছি।
সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবারের বৈঠকে ভূমি সংক্রান্ত যাবতীয় জটিলতা নিরসন করে আধুনিক সেবা নিশ্চিত করার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নাধীন ‘ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন শীর্ষক প্রকল্প’ এর মাধ্যমে সারা দেশে ভূমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ, ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মৌজাভিত্তিক শ্রেণি বৈষম্য দূরীকরণে মূল্য পুনর্নির্ধারণ, দেবোত্তর সম্পত্তির যথাযথ নিশ্চয়তা বিধান, রেজিস্ট্রেশন, খারিজ-খাজনা, নামজারি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সচেতনতা অবলম্বন করে সাধারণ মানুষের জন্য সহজ সেবামূলক কার্যক্রম গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।
সাব-কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক জনপদ বিভাগের অধিকাংশ জমি গাজীপুর জেলার কতিপয় ব্যক্তি অনিয়মিতভাবে ভোগ-দখল ও রেজিস্ট্রি-নামজারির সঙ্গে জড়িতদের নামের তালিকা পরবর্তী বৈঠকে পেশ করার জন্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে ভূমি সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত প্রকল্পগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হওয়ার অনুরোধ করা হয়।
মকবুল হোসেনের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও অংশগ্রহণ করেন— কমিটি সদস্য ও ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, মনোরঞ্জন শীল গোপাল, শাহজাহান মিয়া, আনোয়ারুল আজীম (আনার), উম্মে ফাতেমা নাজমা বেগম, আমিনুল ইসলাম এবং খান আহমেদ শুভ।









