‘ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ/দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?/বরকতের রক্ত।’
কবিতার প্রেক্ষাপট বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ‘সোনালি কাবিনের’ কবি আল মাহমুদ তার কবিতায় এভাবেই বর্ণনা দেন একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা। তাতে স্থান পায় তথকনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবুল বরকতের নাম।
একুশে ফেব্রুয়ারি মিছিলে গুলি চালানোর পরদিন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় খবর ছাপা হয়। সেখানে পাঁচটি নামই বেশি উচ্চারিত হয়েছিল- সালাম, জব্বার, রফিক, বরকত ও শফিউর। এদের মধ্যে একমাত্র আবুল বরকতই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সেই ভাষা শহীদের স্মরণে তার ব্যবহৃত সামগ্রী ও তার সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়েই শোভা পাচ্ছে ‘আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালা’। এটির অবস্থান সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের পাশে পলাশীর প্রবেশপথে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের আলোকচিত্র, প্রিয়জনকে লেখা চিঠি, ভাষা শহীদদের ছবিসহ নানা ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে ২০১২ সালের ২৫ মার্চ ভাষা শহীদ আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালা চালু করা হয়।
দ্বিতল জাদুঘর ভবনের নিচতলায় শহীদ বরকতের ব্যবহৃত ঘড়ি, চিঠি, ছবি, কাপ-পিরিচ, ভাষা আন্দোলনের ডকুমেন্টারি, একুশে পদক প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে। এছাড়া ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের খবর রয়েছে এমন পত্র-পত্রিকার কিছু কাটিং সংরক্ষণ করা হয়েছে জাদুঘরটিতে। কিছু স্মৃতিচিহ্ন, হাতঘড়ি ও একুশে পদকও সংরক্ষিত রয়েছে।
জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের জন্য সব সময় উন্মুক্ত থাকে না। ছুটির দিনগুলোতে বন্ধ থাকে। দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। এই সময়েরও মধ্যে আবার দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত খাবার বিরতি।
ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে সম্মৃদ্ধ লাইব্রেরি
এই সংগ্রহশালার দ্বিতীয় তলায় রয়েছে একটি পাঠাগার। পাঠাগারে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত প্রায় পৌনে চারশ বই সংগৃহীত আছে বলে জানান জাদুঘরটির পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু মো. দেলোয়ার হোসেন। তিনি দাবি করেন বাংলাদেশে আর কোথাও ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে এমন সম্মৃদ্ধ বিশেষায়িত লাইব্রেরি নেই। কেউ যদি ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করতে চান তাহলে এটি হতে পারে তার জন্য দারুণ জায়গা।
তিনি জানান, ভাষা আন্দোলন নিয়ে এখন পর্যন্ত একটি পিএইচডি ও চারটি এমফিল ডিগ্রি হয়েছে মাত্র। ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রায় পাঁচশ’ বই আছে, সবগুলোই এখানে সংগ্রহ করা হবে বলে তিনি জানান।
অপরিকল্পিত স্থাপনা
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৮সালে ক্ষমতায় এলে সব ভাষা শহীদদের স্মরণে তাদের নামে নিজ নিজ এলাকায় স্মৃতি জাদুঘর করার নির্দেশ দেয়। কিন্তু আবুল বরকতের বাড়ি ভারতের মুর্শিদাবাদে হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হল এলাকায় স্থানীয় সরকারের অধীনে এই জাদুঘর স্থাপন করা হয় বলে জানান পরিচালক। তিনি জানান, তখন যারা এটি নির্মাণ করেছিল তারা তেমন কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই এটি করেছিলেন। যার কারণে অনেক জায়গার অপচয় হয়েছে। এমনভাবে করা হয়েছে চাইলে কোনোদিকেই আর জাদুঘর বাড়ানো সম্ভব না।
যুক্ত হবে ডিজিটাল স্ক্রিন
অনেকেই পরিদর্শন করতে এসে কিছুটা হতাশা প্রকাশ করেন সংগ্রহ দেখে। কারণ হিসেবে তারা জানান, আবুল বরকত সম্পর্কে তেমন কিছুই নেই। যা আছে খুবই কম। এর কারণ হিসেবে অধ্যাপক আবু মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বরকত এদেশের সন্তান ছিলেন না। যার কারণে তার সম্পর্কে বা তার ব্যবহৃত তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। তাছাড়া তিনি কোনও বড় রাজনীতিবিদ ছিলেন না। যার কারণে পত্রিকায়ও তার সম্পর্কে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। নিজ উদ্যোগে তিনি আবুল বরকতের জন্মভূমি মুর্শিদাবাদের বাবলা গ্রামে গিয়েছেন বলে জানান অধ্যাপক আবু মো. দেলোয়ার হোসেন।
সেখানে আবুল বরকতের প্রাইমারি স্কুল,হাইস্কুল,তার নিজের বাড়ির ছবিসহ তার সম্পর্কে বেশকিছু স্মৃতি চিহ্ন সংগ্রহ করেছেন। তবে জাদুঘরে এগুলো প্রদর্শনের জায়গায় না থাকায় বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় দুটি ডিজিটাল স্ক্রিনে এগুলো প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করবেন বলে তিনি জানান। অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি গবেষণা সেলের সঙ্গে সংযুক্ত করা। ফলে যে কেউ গবেষণা করতে চাইলে সহজে তথ্য পেতে পারবে।
জাদুঘরে নেই প্রয়োজনীয় লোকবল
তিনজন অফিস সহকারী, তিনজন গার্ড ও একজন পিয়ন দিয়ে জাদুঘরটি পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় বছর খানেক আগে জাদুঘরের গাইড (প্রদর্শক) মারা যান। এই পদে এখনও নতুন করে নিয়োগ হয়নি। এসব বিষয় পরিচালক বলেন, গাইড মারা যাওয়ার পর কিছু ফর্মালিটি শেষ করতে গিয়ে সময় লেগেছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আবেদন করেছি। শিগরিগিরিই হয়তো বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে। এছাড়াও তিনজন গার্ড দিয়ে পরিচলনা করা কঠিন। তারা তিনজন নিয়মিত ডিউটি করে। কেউ ছুটিতে গেলে তখন শিডিউল মেইনটেইন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আমি এরজন্যও আবেদন করেছি। তবে এখনও কোনও সাড়া পাইনি।









