স্বল্প কর নির্ধারণের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। এই সুবিধা নিতে হলে ঘুষ দিতে হবে ৬০ লাখ টাকা। অগ্রিম দিতে হবে ১০ লাখ টাকা। এভাবেই রাজশাহীর উপশহর হাউজিং এস্টেটের বাসিন্দা ডা. ফাতেমা সিদ্দিকার সঙ্গে মৌখিক চুক্তি হয় রাজশাহী সার্কেল-১৩-এর কর কর্মকর্তা মহিবুল ইসলাম ভুঁইয়ার।
গত ৪ এপ্রিল অগ্রিম ১০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে যাওয়ার আগে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) রাজশাহী জেলা কার্যালয়কে অবহিত করেন ডা. ফাতেমা সিদ্দিকা। খবর পেয়ে দুদক ফাঁদ পাতে কর কর্মকর্তার কার্যালয়ের আশপাশে। ডা. ফাতেমা ঘুষ দিয়ে কর কর্মকর্তার কক্ষ থেকে বের হতেই ভেতরে ঢোকেন দুদকের স্থানীয় কর্মকর্তারা। ঘুষের ১০ লাখ টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয় কর কর্মকর্তাকে।
এ ঘটনার দুদিন পর ৬ এপ্রিল একইভাবে ফাঁদ পেতে শরীয়তপুরের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে ঘুষের ৫০ হাজার টাকাসহ উপব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মনির হোসেনকে গ্রেফতার করেন দুদক কর্মকর্তারা।
দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোর কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করতে দুদক আবারও ‘ফাঁদ’ অভিযান শুরু করেছে। যদিও বিগত পাঁচ বছরে দুদক ফাঁদ কার্যক্রম পরিচালনা করে মাত্র ৫৯টি। ২০২২ সালে এমন অভিযান হয়েছিল মাত্র চারটি। ২০২১ সালে ছয়টি। ২০২০ সালে ১৮টি, ২০১৯ সালে ১৬টি এবং ২০১৮ সালে ১৫টি ফাঁদ কার্যক্রম পরিচালনা করে দুদক। তবে এবার অভিযান আরও বাড়াতে চায় দুদক।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদকের ‘ফাঁদ’ কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৭ সালে। ওই বছরই এটি দুদকের ১৬ নম্বর বিধিতে সংযুক্ত করা হয়। এতে বলা হয়, ‘দুর্নীতি প্রতিরোধের নিমিত্তে আইনের তফসিলভুক্ত অপরাধে জড়িত কোনও ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে হাতেনাতে ধরার উদ্দেশ্যে তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনারের অনুমোদনক্রমে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফাঁদ মামলা (ট্র্যাপ কেস) প্রস্তুত করতে বা পরিচালনা করতে পারবেন।’
এ ছাড়া বলা হয়, ‘ফাঁদ মামলা তদন্ত কার্যক্রম কেবল তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনার বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিশনের পরিচালক পদমর্যাদার নিচে নয় এমন একজন কর্মকর্তা দিয়ে সম্পন্ন করতে হবে।’
দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানান, দুদক নিজ থেকে কাউকে লোভে ফেলে কিংবা ঘুষ দেওয়ার ফাঁদে ফেলে গ্রেফতার করে না কিংবা ফাঁদ তৈরি করে না। যদি কারও কাছে কেউ ঘুষ চায়, আর ওই ব্যক্তি যদি দুদকের কাছে অভিযোগ করেন, তখন দুদক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। দুদক স্বপ্রণোদিত হয়ে কিছু করে না। তাই যিনি ঘুষ দেবেন, তাকে দুদকে অভিযোগ জানাতে হবে।
দুদক সচিব মাহবুব হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ঘুষ লেনদেনের অবসান ও দুর্নীতির উৎস নির্মূল করতে দুদক ফাঁদ কার্যক্রম পরিচালনা করে। সাধারণত সরকারি সেবা প্রদানকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী সেবার বিনিময়ে ঘুষ দাবি করলে কমিশন থেকে অনুমোদনের ভিত্তিতে ফাঁদ অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়। তখন তারা ঘুষ দাবি করা কর্মকর্তাদের হাতেনাতে ধরতে অভিযান চালায়। এ অভিযান এ বছর আরও জোরদার করা হবে। সে জন্য দুদকের গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।
দুদকের ফাঁদ কার্যক্রমকে ভালো উদ্যোগ উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শামীম সরদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে দুর্নীতি কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য এ উদ্যোগ ব্যাপকভাবে থাকা খুবই জরুরি। না হলে যে হারে ঘুষ-দুর্নীতি চলে, সেটা কোনও দিনই প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। এ ফাঁদ কার্যক্রম চালু থাকলে নিদেনপক্ষে একজন ঘুষখোর ভয়ে থাকবে যে যেকোনও সময় সে ফাঁদে পড়তে পারে। তাই এটা দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রয়োজন রয়েছে।’
দুদকের ফাঁদ কার্যক্রম নিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেভাবে ঘুষ-দুর্নীতি হয়, সেটাকে প্রতিরোধ করতে ফাঁদ পন্থা একটি ভালো উদ্যোগ। তবে ধরার পর এসব অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা গেলে দুদকের ফাঁদ পন্থাটি ফলপ্রসূ হবে।’
দুদকের মামলা পরিচালনায় নিয়োজিত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিধি অনুযায়ী দুদকের ট্র্যাপ কেস সম্পূর্ণ বৈধ ও যুক্তিসংগত। ঘুষখোরদের ধরতে এর কোনও বিকল্প নেই।’









