রানা প্লাজা ধসের ১০ বছর

এখনও অরক্ষিত বেশিরভাগ পোশাক কারখানা!

উদিসা ইসলাম
২৪ এপ্রিল ২০২৩, ১০:০০আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৩, ১০:২৮

রানা প্লাজা ভবন ধসের ১০ বছর পূর্ণ হলো। এখনও পোশাককর্মীদের জন্য নিরাপদ কারখানা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তারা বলছেন, ঘটনার পর বছর দুয়েক নিরাপত্তা নিয়ে কিছু কারখানা কাজ করেছে। কিন্তু এখনও তালা মেরে রাখা, নিম্নমানের ভবনে কারখানা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকার মতো বিষয়গুলো বিদ্যমান। অ্যাক্টিভিস্ট ও শ্রমিক নেতারা বলছেন, রানা প্লাজা ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যাকর্ড  ও অ্যালায়েন্সের মাধ্যমে গার্মেন্টস কারখানা সুরক্ষায় বেশ কিছু কাজ হয়েছে। কিন্তু পোশাককর্মীদের যেসব সুবিধা দরকার, যেমন- বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, আগুন নির্বাপণ, বিল্ডিং কোড মানা, শিশু যত্নকেন্দ্র আছে কিনা—সেগুলো বেশিরভাগ কারখানায় পর্যাপ্ত নেই। যে শ্রমিকের হাত ধরে বৈদেশিক মুদ্রা আসছে, সেই শ্রমিকের জীবন রক্ষার কথা সংশ্লিষ্ট কেউই ভাবেন না।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে সাভার বাসস্ট্যান্ডের পাশে রানা প্লাজা নামের একটি বহুতল ভবন ধসে পড়ে। ভবনের কয়েকটি তলা নিচে দেবে যায়। কিছু অংশ পাশের একটি ভবনের ওপর পড়ে। এ দুর্ঘটনায় ১১৭৫ জন শ্রমিক নিহত এবং দুই হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হন, যা বিশ্বের ইতিহাসে তৃতীয় বৃহত্তম শিল্প দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

ভবন ধসের ১০ বছর উপলক্ষে দাতা সংস্থা অ্যাকশন এইড ২০০ শ্রমিকের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করে। সেখানে বেরিয়ে আসে বিস্ময়কর তথ্য। প্রায় ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা তাদের কারখানায় যন্ত্রপাতিসহ উপস্থিত বিভিন্ন ঝুঁকি বিদ্যমানতার তথ্য তুলে ধরেন। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল এবং আলো, সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। উত্তরদাতাদের প্রায় ২০ শতাংশ রিপোর্ট করেছেন, তাদের কারখানাগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। জরিপে উত্তরদাতা ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ শ্রমিক বলেছেন, জরুরি অগ্নি নির্গমন ব্যবস্থা নেই। উপরন্তু, ২০ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা উল্লেখ করেছেন, তাদের কারখানায় কোনও প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র নেই।

রানা প্লাজা ধসের ঘটনার পর বাংলাদেশের বেশিরভাগ কারখানা সুরক্ষা নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হয়েছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির ঢাকা সিটি সভাপতি আবুল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিগুলো ঢাকা ও চট্টগ্রামে। অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের সেফটি মেজার্সের পরে গার্মেন্টস সেক্টরে অনেক উন্নতি হয়েছে। পৃথিবীর বেশিরভাগ গ্রিন কারখানা আমাদের বাংলাদেশে। যেসব কারখানা বায়ারদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে, তাদের এই বিষয়গুলো না মেনে উপায় নেই। তবে ছোট ও মাঝারি কারখানা—যারা সাব কন্টাক্টে কাজ করে, তাদের এসব ব্যবস্থা নেই। অ্যাকোর্ড-অ্যালায়েন্স তাদের দিকে নজর দেয়নি। কারণ, বায়ারদের সঙ্গে এই কারখানাগুলো সরাসরি কাজ করেনি।’

সারা দুনিয়া শ্রমিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে মে দিবস পালন করে। এবারে রানা প্লাজা ধসের ১০ বছরকে সামনে রেখে ২৪ এপ্রিল ‘শ্রমিকের নিরাপত্তা দিবস’ হিসেবে পালনে সারা দুনিয়াকে আহ্বান জানাচ্ছে গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি। এদিন তারা দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তিসহ ৭ দফা দাবিতে রানা প্লাজা ঘটনায় নিহতের স্বজন ও আহত  শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে দিবসটি পালন করবে। বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির প্রধান তাসলিমা আকতার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিরাপত্তাকে মালিকপক্ষ একভাবে ব্যাখ্যা করে, আর আমরা আরেকভাবে দেখি।’

তাসলিমা আকতার বলেন, ‘অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স—একটা ইউরোপিয়ান ও আরেকটা নর্থ আমেরিকান সংস্থা। রানা প্লাজার ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে তাদের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের প্রকৌশলী, শ্রমিক সংগঠন, গবেষক, বিশেষজ্ঞরা মিলে যে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করেছিল, সেটা কার্যকর করা যায়নি। গার্মেন্টস যেহেতু সাপ্লাই চেইনের অংশ, বাইরের সংস্থাগুলো তাদের স্বার্থেই চিন্তা করবে। কিন্তু আমাদেরও নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘কারখানার সার্বিক পরিস্থিতি উন্নয়ন হয়েছে হয়তো, কিন্তু কারখানার উন্নয়ন মানে কেবল ভালো বিল্ডিং না। শ্রমিকদের সুবিধাদি আছে কিনা, পানি, আগুন নির্বাপণ, বিল্ডিং কোড মানা হয়েছে কিনা, শিশু যত্নকেন্দ্র আছে কিনা—এগুলো বেশিরভাগ কারখানায় পর্যাপ্ত নেই। শ্রমিকদের মজুরি, কথা বলার অধিকার নেই মানে, তার নিরাপত্তার দাবিও নেই। ভুলে গেলে চলবে না—রানা প্লাজায় সেদিন অনেক শ্রমিক কাজে ঢুকেছিলেন, পরের মাসের বেতনটা নিশ্চিত করতে।’

তাসলিমা আকতার আরও বলেন, ‘গত ১০ বছরে রানা প্লাজার মতো ধস হয়তো ঘটেনি, তাজরীনের মতো আগুন হয়তো লাগেনি, কিন্তু শ্রমিকরা তাদের দারিদ্র্যসীমার ওপরে যেতে পারেনি। এই বিষয়গুলো অনুপস্থিত রেখে গার্মেন্টস সেক্টরকে যে উন্নত করা গেছে, এটা বলা যায় না।’

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
নিরাপদ কারখানা, সবুজ অগ্রগতি: কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পোশাক খাত? 
১১৩৬: সংখ‍্যা নয়, একেকটি জীবন
রানা প্লাজা ধসে নিহতদের প্রতি আহত শ্রমিক ও স্বজনদের শ্রদ্ধা
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম