কারাগারে হত্যা-নির্যাতন: সাক্ষ্য বহন করে চলেছে ‘খাপড়া ওয়ার্ড’

উদিসা ইসলাম
২৪ এপ্রিল ২০২৩, ০৯:০০আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৩, ০৯:১০

পাকিস্তান আমলে কারাবন্দিদের ওপর নানা অজুহাতে চালানো হতো নির্যাতন। অমানুষিক নির্যাতন তো ছিলই, তাদের দিনের খাবারের পরিমাণও ছিল সামান্য। দাসপ্রথার মতো তাদের পদে পদে পেটানো, রক্তাক্ত করা হতো অহরহ। তেলের ঘানি টানানো, গম মাড়াইয়ের কাজ করতে হতো কারাবন্দিদের। কমিউনিস্ট বন্দিরা প্রথম ওই অমানবিক নির্যাতনের প্রতিবাদ করেন, চলে অনশন। ১৯৫০ সালের এই দিনে (২৪ এপ্রিল) প্রতিবাদী কমিউনিস্ট নেতাকর্মীদের ওপর গুলি চালায় পুলিশ। এতে শহীদ হন সাত জন, আহত হয়েছিলেন আরও ৩২ জন। সেই ইতিহাস এখনও বহন করে চলেছে রাজশাহী কারাগার। এই কারাগারের ভেতরেরই একটি কামরা—চারপাশে দেওয়াল, টালির ছাদ; যা পরিচিত খাপড়া নামে। এই ‘খাপড়া ওয়ার্ড’ যেন ছিল জেলের ভিতরে আরেক জেল।

খাপড়া ওয়ার্ডে প্রথম শহীদ হয়েছিলেন কুষ্টিয়া মোহিনী মিলের শ্রমিক নেতা হানিফ শেখ। শুরুর গোলমালটা শেষ হতেই যখন চারপাশ চুপচাপ হয়ে যায় তখন খুলনার ছাত্র নেতা আনোয়ার মাথা তোলেন, ঠিক তখনই একটি গুলি এসে লাগে তার মাথায়। মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। সেদিন কেবল গুলিবর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি পুলিশ ও কারারক্ষীরা। চলেছে অতর্কিত লাঠিচার্জ।

কুষ্টিয়ার হানিফ শেখ এবং খুলনার আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে শহীদ হন রংপুরের সুধীন ধর, ময়মনসিংহের সুখেন ভট্টাচার্য ও কুষ্টিয়ার দেলোয়ার হোসেনও। ওইদিন বেলা ৩টায় গুরুতর আহত সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহ, আবদুল হক, কম্পরাম সিং, প্রসাদ রায়, বাবর আলী, আমিনুল ইসলাম বাদশা, শ্যামাপদ সেন, সত্যেন সরকার, সদানন্দ ঘোষ দস্তিদার, অনন্ত দেব, আবদুস শহীদ, প্রিয়ব্রত দাস ও নূরুন্নবী চৌধুরীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও দুজন; দিনাজপুরের কম্পরাম সিং ও বিজন সিং।

কী হয়েছিল সেদিন?

কমিউনিস্ট নেতারা বলছেন, প্রথমে রাজশাহী কারাগারের প্রতিবাদ শুরু হলেও পরে সেটা সারা দেশেই কম-বেশি ছড়িয়ে পড়ে। শুরুটা আরও আগের। ১৯৪৯ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ও রাজশাহী কারাগারে বন্দিরা চার দফায় মোট ১৫০ দিন অনশন করেন। খুলনা কারাগারে পিটিয়ে হত্যা করা হয় কমিউনিস্ট আন্দোলন কর্মী বিষ্ণু বৈরাগীকে। ঢাকা কারাগারে জোর করে খাওয়াতে গেলে শিবেন রায় নামের আরেক কমরেডের মৃত্যু হয়। অথচ প্রচার করা হয় শিবেন রায় ও বিষ্ণু বৈরাগী আত্মহত্যা করেছে। সাধারণ বন্দিরা তখন ক্ষোভে ফুঁসছে। আর তাদের সংগঠিত করছিলেন কিছু ‘রাজবন্দি’।

কীভাবে ঠান্ডা হবে পরিস্থিতি— ঠিক করতে গিয়ে তৎকালীন আইজি প্রিজন আমীর হোসেন রাজবন্দিদের কয়েক জনকে সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত দেন। কিন্তু সেইদিন রাজবন্দিরা কেউই খাপড়া ওয়ার্ড ছেড়ে যেতে রাজি হননি।

২৪ এপ্রিল ১৯৫০। ভোরের দিকে জেল সুপার ডব্লিউ এফ বিল ওয়ার্ডের ভেতর ঢুকে বন্দিদের কয়েক জনকে ১৪ নম্বর সেলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। প্রতিবাদী বন্দিরা রাজি হন না, পথরোধ করে দাঁড়ান জেল সুপারের। জেল সুপার তার হান্টার দিয়ে আঘাত করে সেল থেকে বাইরে বেরিয়ে হুইসেল দিতেই প্রায় ৪০ জন কারারক্ষী খাপড়া ওয়ার্ড ঘিরে ফেলে।

কোনোভাবেই দরজা যেন ভাঙতে না পারে, সেটাই ছিল বন্দিদের প্রথম লক্ষ্য। তারা নারিকেলের ছোবড়া, চৌকি, তোশক বালিশ ও শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দরজা আটকে রাখেন। কমিউনিস্ট নেতা প্রসাদ রায় দরজা বন্ধ রাখতে সাহায্য করতে গেলে পুলিশ গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ প্রসাদ রায় মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়েন। এরপরই বেপরোয়া পুলিশ ঢুকে পড়ে ওয়ার্ডের ভেতরে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে। খাপড়া ওয়ার্ডের বন্দিদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। ঘটনাস্থলেই মারা যান পাঁচ জন। আহত হন ওয়ার্ডের সবাই।

প্রসাদ রায়ের মেয়ে বৃত্বা রায় বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে তার পিতার কাছ থেকে শোনা স্মৃতির কথা বলেন। বর্তমান প্রজন্মর কাছে ইতিহাস তুলে ধরার গুরুত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘১৯৫০ সালে রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে বিদ্রোহ ও সাতজন কমিউনিস্ট রাজবন্দী শহীদ হওয়ায় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয়েছিল কয়েদীদের শারীরিক শাস্তিমূলক জেল কোড পরিবর্তন করতে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, এই ঐতিহাসিক কারা বিদ্রোহ নিয়ে এবং রাষ্ট্রীয় এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের কেউও স্পষ্টভাবে তেমন কিছুই জানে না। অথচ এই কারা বিদ্রোহ প্রত্যক্ষভাবে পাকিস্তানি অপরাষ্ট্রের জন্ম ও গুরুত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছিল বলে আমি মনে করি।’

অবশ্য এজন্য বর্তমান প্রজন্মকে তেমনভাবে দায়ী করেন না তিনি। বলেন, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে কেবল কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যেই ঘুরপাক খেয়েছি। এছাড়া বামপন্থী দলগুলোও তাদের অর্জনগুলি জন সাধারণের মধ্যে সেভাবে তুলে ধরতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারেনি। বিভিন্ন মাধ্যমে যেমন ডক্যুমেন্টেশন, লেখা, তথ্যচিত্র, সিনেমাসহ অন্যান্য মাধ্যমে এই ঘটনাগুলো উঠে আসা দরকার। সবচেয়ে প্রথমে দরকার সরকারের সহযোগিতা। দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ করা জরুরি।’

প্রতিবছর এই দিনে কারাগারের দরজা খুলে দেওয়া হয় নিহতদের স্মরণ করার উদ্দেশ্যে। রাজনৈতিক সংগঠনগুলো এইদিনে ওয়ার্ডের সামনে গিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। রাজশাহী কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আব্দুল জলিল জানান, প্রতিবারের মতো এবারও খাপড়া ওয়ার্ড দিবসকে স্মরণ করা হবে। বাইরে থেকে সংগঠনগুলোকে আসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
চীনের আবিষ্কার: মাছ ধরার রিল
ইতিহাস গড়ে বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার ইলন মাস্ক
যেভাবে তিনি হয়ে উঠলেন বিশ্বের প্রথম নারী আলোকচিত্রী
সর্বশেষ খবর
লন্ডনকে টপকে আন্তর্জাতিক শিপিং সূচকে দ্বিতীয় স্থানে শাংহাই
লন্ডনকে টপকে আন্তর্জাতিক শিপিং সূচকে দ্বিতীয় স্থানে শাংহাই
হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জার নাকি টেলিগ্রাম: ব্যক্তিগত তথ্যের জন্য কোনটি সবচেয়ে নিরাপদ
হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জার নাকি টেলিগ্রাম: ব্যক্তিগত তথ্যের জন্য কোনটি সবচেয়ে নিরাপদ
‘আমরা মেসিকে ঘুম পাড়িয়ে দেব’
‘আমরা মেসিকে ঘুম পাড়িয়ে দেব’
ইংল্যান্ড ম্যাচের আগে শক্তি সঞ্চয় করছেন মেসি!
ইংল্যান্ড ম্যাচের আগে শক্তি সঞ্চয় করছেন মেসি!
সর্বাধিক পঠিত
যাত্রীবেশে বাসে মন্ত্রী, ভাংতি না থাকায় নামিয়ে দিলেন কন্ডাক্টর
যাত্রীবেশে বাসে মন্ত্রী, ভাংতি না থাকায় নামিয়ে দিলেন কন্ডাক্টর
চমক দেখালো যমজ তিন বোন, পরিবারে আনন্দের বন্যা
চমক দেখালো যমজ তিন বোন, পরিবারে আনন্দের বন্যা
২৫ বছর পর ফেসবুকে খালার খোঁজ পেলাম, তাও মৃত্যুর পর, কষ্টের শেষ ছিল না তার
২৫ বছর পর ফেসবুকে খালার খোঁজ পেলাম, তাও মৃত্যুর পর, কষ্টের শেষ ছিল না তার
খামেনির জানাজায় সেই ‘রহস্যময়’ মুখোশধারী কে, জানা গেলো অবশেষে
খামেনির জানাজায় সেই ‘রহস্যময়’ মুখোশধারী কে, জানা গেলো অবশেষে
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে রক্ষণ ভাঙতে দেরি কেন, উত্তর দিলেন আলভারেজ 
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে রক্ষণ ভাঙতে দেরি কেন, উত্তর দিলেন আলভারেজ