শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধে আইন করতে চাইল্ডস রাইটস অ্যাডভোকেসি কোয়ালিশন ইন বাংলাদেশ আহ্বান জানিয়েছে। রবিবার (৩০ এপ্রিল) গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানায় সংগঠনটি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বিলোপ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক দিবস ৩০ এপ্রিল। শিশুকে ভীতি প্রদর্শন ও শৃঙ্খলা রক্ষার নামে ব্যথা বা অস্বস্তি প্রদানের মাধ্যমে যেকোনও মাত্রার শারীরিক বল প্রয়োগ এবং নিষ্ঠুর ও অবমাননাকর আচরণ শিশুর স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে এবং শিশুর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। সহিংসতা মুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠা প্রতিটি শিশুর অধিকার। তাই, শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বিলোপের আন্তর্জাতিক দিবসে চাইল্ড রাইটস অ্যাডভোকেসি কোয়ালিশন ইন বাংলাদেশ শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং পরিবারসহ সব প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে যেকোনও ধরনের শাস্তি বন্ধে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করার আহ্বান জানাচ্ছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৩৯ জন শিশু শুধু শিক্ষকের হাতে শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এই পরিসংখ্যান গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে প্রকাশিত। এছাড়া এরকম অনেক ঘটনা অপ্রকাশিত থেকে যায়। বিশেষত, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুদের মানসিক নিগ্রহের শিকার হওয়ার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়। উপরন্তু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া পারিবারিক বা সামাজিক পর্যায়ে, অথবা ভিন্ন ধরনের কাঠামোতে যেমন- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আবাসিক ব্যবস্থাপনা, দিবাযত্ন কেন্দ্র, কোচিং সেন্টার ইত্যাদি পর্যায়েও শিশুদের নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি প্রদান ও তাদের সঙ্গে অবমাননাকর আচরণের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু বিষয়টি পর্যবেক্ষণের কোনও ব্যবস্থা নেই। নানা গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, শাস্তি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, বিকাশ ও শিক্ষাকে প্রভাবিত করে এবং তাদের মধ্যে পরিবার ও সমাজের প্রতি অনাস্থা তৈরি করে।
২০১০ সালে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক ) এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড ও সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের (রিট পিটিশন নং ৫৬৮৪/২০১০) প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সব ধরনের শারীরিক শাস্তি অসাংবিধানিক (বিশেষ করে বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ৩১, ৩২, ৩৫ (৫) এর পরিপন্থী ) ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘোষণা করে রায় প্রদান করেন। এ রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১১ ধরনের শারীরিক ও দুই ধরনের মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করতে ২০১১ সালে একটি পরিপত্র জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে, পরিসংখ্যান বলছে— শিশুদের সুরক্ষা প্রদানে শুধু পরিপত্র জারি যথেষ্ট নয়। বিশ্বের ৬৫টি দেশ পরিবারসহ সব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন করেছে। তবে, এখনও বিশ্বের ৮৬ শতাংশ শিশু এধরনের শাস্তি থেকে আইন দ্বারা সুরক্ষিত নয়, যার মধ্যে বাংলাদেশি শিশুরাও রয়েছে।
বাংলাদেশে পরিবার ও শিক্ষক কর্তৃক শিশুদের শাস্তি প্রদানকে স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু শিশুদের সুরক্ষা প্রদান, তাদের পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে, সব ক্ষেত্রে শাস্তি বিলোপ করে আইন প্রণয়ন এবং প্রচলিত আইনের যেসব ধারা শিশুদের শাস্তি প্রদানকে সমর্থন করে, যেমন- দণ্ডবিধির ৮৯ ধারা, এটি পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই সনদের অনুচ্ছেদ ১৯ (শিশুর প্রতি আচরণ) অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র, পিতামাতা, আইনানুগ অভিভাবক বা শিশু পরিচর্যায় নিয়োজিত অন্য কোনও ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায় শিশুকে আঘাত বা অত্যাচার করা যাবে না। অবহেলা বা অমনোযোগী আচরণ, দুর্ব্যবহার এবং যৌন নির্যাতনসহ সব রকমের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন থেকে রক্ষার জন্য যথাযথ আইনানুগ, প্রশাসনিক এবং সামাজিক ব্যবস্থা নেবে৷ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও শিশুদের প্রতি সব ধরনের সহিংসতা নিরসন একটি পূর্বশর্ত।
চাইল্ডস রাইটস অ্যাডভোকেসি কোয়ালিশন ইন বাংলাদেশ-এর প্রত্যাশা শিশুদের সুষ্ঠু বিকাশের গুরুত্ব অনুধাবন করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব ক্ষেত্রে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে রাষ্ট্র সক্রিয়, উদ্যোগী ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে এবং গণসচেতনতা সৃষ্টির জন্য কাজ করতে হবে। একইসঙ্গে, কোয়ালিশন এ বিষয়ে অভিভাবক, শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের সচেতন ও সংবেদনশীল করে তুলতে সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করার এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানাচ্ছে।









