রাজধানীতে ছিনতাই কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না?

কবির হোসেন
২৭ জুলাই ২০২৩, ১০:০০ আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৩, ১৪:০৭

গত ঈদুল আজহার ছুটিতে ফাঁকা রাজধানীতে হঠাৎ বেড়ে যায় ছিনতাইকারীদের উৎপাত। এসব ছিনতাইকারীর বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযানে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাতেও কমে না তাদের উৎপাত। রাতে কিংবা ভোরে—সুযোগ পেলেই ছুরিকাঘাত করে ব্যক্তির সঙ্গে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয় তারা। জানমাল রক্ষা করতে গিয়ে অনেকে হয়েছেন নিহত, বেশির ভাগই হন আহত।

সম্প্রতি কয়েকটি বড় বড় ছিনতাইয়ের ঘটনায় মানুষের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পুলিশ, গণমাধ্যমকর্মী, প্রকৌশলী ও শিক্ষার্থী—কেউই রেহাই পাননি তাদের হাত থেকে। অনেককেই প্রাণ দিতে হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে ছিনতাই চক্রের অনেক সদস্যকে গ্রেফতার করলেও, সে সময় ছিনতাইকারীরা গা ঢাকা দেয়। কিছুদিন পর তারা আবার সক্রিয় হয়ে শুরু করে ছিনতাই কার্যক্রম।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, গ্রেফতার হলেও উপযুক্ত সাক্ষীর অভাব বা দুর্বল সাক্ষীর কারণে কারাগার থেকে অল্প দিনেই জামিনে বের হয়ে যাচ্ছে ছিনতাইকারীরা। এরপর তারা আবার সক্রিয় হচ্ছে। কেউ কেউ ছিনতাই করে দূর কোনও এলাকায় গা ঢাকা দিয়ে পালিয়ে বেড়ায়।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, চলতি মাসে ১৪ দিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছিনতাই মামলায় ৬৭৯ জনকে গ্রেফতার করেছে ডিএমপি। গ্রেফতার সদস্যদের বিরুদ্ধে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় ৩০৮টি মামলা করা হয়েছে। তবে এত কিছুর পরও রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়া ভাবাচ্ছে সবাইকে।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে তেজগাঁও এলাকায়। এই বিভাগের অধীনে ফার্মগেটে গত ১ জুলাই ছিনতাইকারীদের হামলায় পুলিশ সদস্য মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার নিহত হয়েছেন। ছিনতাইকারীর হাতে নিহত হয়েছেন ধানমন্ডির এক শিক্ষার্থী। হাতিরঝিল এলাকায় ঈদের দিন রাতে এক সাংবাদিক ছিনতাইকারীদের হামলায় আহত হন।

এ ছাড়া এই তালিকায় রয়েছে শাহবাগ, রমনা, মতিঝিল, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, ভাটারা, শেরেবাংলা নগর, কলাবাগান, রামপুরা, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, উত্তরা পশ্চিম ও পল্লবী। এর মধ্যে পান্থপথ, টিএসসি, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল প্রকল্প ও তেজগাঁও রেলওয়ে স্টেশন ছিনতাইয়ের অন্যতম হটস্পট হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

ডিএমপির আরও সূত্র বলছে, রাজধানীতে ছিনতাই ও ডাকাতির সঙ্গে ছয় হাজারের বেশি মানুষ জড়িত। এর মধ্যে ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ১ হাজার ৭৩৭ জন এবং ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ৪ হাজার ৪৬১ জন। ২০২২ সালে রাজধানীতে অন্তত ১ হাজার ৬০৩টি চুরি, ১৪৫টি ছিনতাই ও ২৭টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ঢাকায় ১৯২টি চুরি, ৩৪টি ছিনতাই ও দুটি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে।

গত ১৬ জুলাই রাতে গ্রিন রোডে বাসায় ফেরার পথে মিরপুর রোড-সংলগ্ন শেখ জামাল মাঠের পূর্ব পাশে নার্সারির সামনে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে নিহত হন আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী আদনান সাঈদ রাকিব। এর আগে গত ১ জুলাই ভোররাতে ঈদের ছুটি শেষে রাজধানীতে কর্মস্থলে ফেরার পথে ফার্মগেট এলাকায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে নিহত হন পুলিশ কনস্টেবল মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার। তার এক দিন আগে ৩০ জুন রামপুরায় বিটিভি কার্যালয়ের সামনে রাকিবুল হাসান রানা (৩০) নামে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিককে ছুরিকাঘাত করে ছিনতাইকারীরা।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে র‍্যাব ও পলিশ। ছিনতাই নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে জনগণের নিরাপত্তায় নিয়োজিত এসব সংস্থা।

এ নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক ডিএমপির ঊর্ধ্বতন ও সব কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন যেকোনও মূল্যে ঢাকায় ছিনতাইকারীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে। রাতে পুলিশ টহল বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি।

কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান থাকবে। কোনও অপরাধ পুরোপুরি শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা সম্ভব নয়। তবে আমাদের মূল টার্গেট জনগণের মধ্যে স্বস্তির ভাব আনা। আমরা সেই উদ্দেশ্যেই অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। ঢাকা শহরে যারা পেশাদার ছিনতাইকারী, চোর ও ডাকাতির সঙ্গে জড়িত, তাদের গ্রেফতার করে আইনের হাতে সোপর্দ করতে অভিযান চলমান রয়েছে।

র‍্যাব-১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মোশতাক আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের দায়িত্ব ছিনতাইকারীরা যেন কখনও মাথাছাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। আমরা সেভাবেই কাজ করছি। ছিনতাইকারীদের তৎপরতা খেয়াল করে অভিযান বাড়িয়ে দিচ্ছি। তারপরও যেসব ঘটনা ঘটে, আমরা ছেড়ে দিচ্ছি না। ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযান চলাকালীন তারা গা ঢাকা দেয়। ইদানীং একসঙ্গে অনেক ছিনতাইকারী গ্রেফতারও হয়েছে।

অক্ষমতার কথা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা এসব অপরাধীকে গ্রেফতার করে আইনের কাছে সোপর্দ করি। এখন আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে যদি তারা বের হয়ে যায়, তখন আমাদের কিছু করার থাকে না। ছিনতাইয়ের মামলায় আদালতে যারা সাক্ষী দিতে যায়, তারা যথাযথভাবে সাক্ষী দেয় না। আবার অনেক সময় সাক্ষী অনুপস্থিত থাকে। যে কারণে অপরাধীরা বের হওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়।

মামলা সম্পর্কে লে. কর্নেল মো. মোশতাক আহমেদ বলেন, যিনি মামলা করেন, পরে তিনি আর সেভাবে দৌড়াদৌড়ি করতে চান না। একসময় ক্লান্ত হয়ে যান। কারণ বিচার তো সাক্ষীর ওপর নির্ভর করে। এখন যিনি সাক্ষী দেবেন, তিনি যদি তথ্য গোপন করেন, সব কথা বলতে না চান, তখন তো বিচারপ্রক্রিয়ায় কিছু করার থাকে না। এ কারণে ছিনতাইকারীদের সাহস বেড়ে যায়। তারা বের হয়ে আবার ছিনতাই শুরু করে।

/এনএআর/
সম্পর্কিত
বিয়ের উপহার পছন্দ না হওয়ায় নববধূকে নির্যাতন-হত্যা, আটক স্বামী
সাংবাদিক আলিফ হত্যায় আরও একজন গ্রেফতার, জড়িত ৭ জনের তথ্য পেয়েছে পুলিশ
প্রেম, বিয়ে ও গ্রেফতার: কেন ভেঙেছিল শাকিল-পপি জুটি
সর্বশেষ খবর
চট্টগ্রামের ‘রিপু রজনী’ মণ্ডপে পূজা চেরি
চট্টগ্রামের ‘রিপু রজনী’ মণ্ডপে পূজা চেরি
বিয়ের উপহার পছন্দ না হওয়ায় নববধূকে নির্যাতন-হত্যা, আটক স্বামী
বিয়ের উপহার পছন্দ না হওয়ায় নববধূকে নির্যাতন-হত্যা, আটক স্বামী
আপনি অনেক দুষ্টু, বাপ্পারাজকে ওমর সানী
আপনি অনেক দুষ্টু, বাপ্পারাজকে ওমর সানী
শিরোপার লড়াইয়ে ভারত, আগের হারের প্রতিশোধ নিতে পারবে বাংলাদেশ?
শিরোপার লড়াইয়ে ভারত, আগের হারের প্রতিশোধ নিতে পারবে বাংলাদেশ?
সর্বাধিক পঠিত
পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, দুইপক্ষ এক হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, দুইপক্ষ এক হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
যুদ্ধজাহাজ পাঠালো যুক্তরাষ্ট্র, পাল্টা নৌবাহিনী পাঠিয়েছে চীন: এবার প্রকাশ্যে মুখোমুখি
যুদ্ধজাহাজ পাঠালো যুক্তরাষ্ট্র, পাল্টা নৌবাহিনী পাঠিয়েছে চীন: এবার প্রকাশ্যে মুখোমুখি
পুলিশের সেই অতিরিক্ত ডিআইজিকে নিয়ে যা বললেন জামায়াত আমির
পুলিশের সেই অতিরিক্ত ডিআইজিকে নিয়ে যা বললেন জামায়াত আমির
প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরতে চেয়ে প্রত্যাহার রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার
প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরতে চেয়ে প্রত্যাহার রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার
পে-স্কেল: বেতন-ভাতা নির্ধারণে প্রস্তুতি কতদূর
পে-স্কেল: বেতন-ভাতা নির্ধারণে প্রস্তুতি কতদূর