রাজধানীর গুলশানে বহুল আলোচিত যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কি হত্যার এক দশক পূর্ণ হয়েছে আজ শনিবার (২৯ জুলাই)। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেও মামলার সাক্ষীদের আদালতে হাজির করানো যাচ্ছে না। ফলে আটকে আছে এ মামলার বিচারকাজ।
গুলশানে শপার্স ওয়ার্ল্ড নামে একটি বিপণি বিতানের সামনে ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই রাতে ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই বিপণি বিতানের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওচিত্র দেখে মিল্কির একসময়ের সহযোগী যুবলীগের আরেক নেতা জাহিদ সিদ্দিকী তারেকসহ ভাড়াটে খুনিরা তাকে হত্যা করে বলে নিশ্চিত হয় পুলিশ। ওই ঘটনায় মিল্কির ছোট ভাই রাশেদুল হক খান বাদী হয়ে গুলশান থানায় নাম উল্লেখ করে ১১ জন এবং অজ্ঞাত আরও ৪-৫ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
এ মামলায় সাড়ে চার বছর আগে ঢাকার পঞ্চম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারকাজ শুরু হলে চার জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। পরবর্তীকালে বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের আদেশে ২০২২ সালের ২১ মার্চ মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এ পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে গত এক বছরে মাত্র একজনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে আসছেন না। জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেও সাক্ষীদের খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। ফলে নিয়মিত হচ্ছে না এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ। আর সাক্ষী না আসায় আলোচিত এ হত্যা মামলাটির বিচার কার্যক্রম আটকে রয়েছে।
সর্বশেষ গত ১২ জুলাই এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। এদিনও আদালতে কোনও সাক্ষী উপস্থিত না হওয়ায় আদালত আগামী ১০ অক্টোবর পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেছেন।
আসামি পক্ষের আইনজীবী নূর ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের বিচার ব্যবস্থা যে প্রক্রিয়ার চলে সেক্ষেত্রে শুধু এ মামলায় না, সব মামলার বিচার নিষ্পত্তি করতে গিয়ে সময় লাগছে। তবে দ্রুত নিষ্পত্তি হলে সবার ক্ষেত্রেই তা ভালো হয়। এ মামলায় আমার মক্কেল জাহাঙ্গীর আরেক আসামি সাখাওয়াতের ড্রাইভার ছিল। সে কোনোভাবেই এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না। বিচারক বিষয়টি আমলে নিলে সে খালাস পাবে।’
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ১৫ এপ্রিল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র্যাব-১ সহকারী পরিচালক কাজেমুর রশিদ আদালতে ১১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করতে মূল আসামিদের নাম চার্জশিটে উল্লেখ না করার অভিযোগে ২০১৪ সালের ৯ জুন মামলার বাদী ও নিহত মিল্কির ভাই রাশেদ হক খান মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিকে দায়িত্ব দেওয়ার আবেদন করেন। আদালত ২০১৪ সালের ১৭ জুন আবেদন মঞ্জুর করে সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার (সিআইডি) উত্তম কুমার বিশ্বাস অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। আগের চার্জশিটভুক্ত ১১ আসামির সঙ্গে আরও ৭ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে মোট ১৮ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেন। সেই সঙ্গে ৯ জনকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেন। এছাড়া এ মামলায় সাক্ষী করা হয় ৭৫ জনকে।
২০১৬ সালের ১৪ মে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলার চার্জশিট আমলে নেন। পরে ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকার পঞ্চম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত ১৮ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
মামলার ১৮ আসামি হলেন—সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল, আমিনুল ইসলাম ওরফে হাবিব, সোহেল মাহমুদ ওরফে সোহেল ভূঁইয়া, চুন্নু মিয়া, আরিফ ওরফে আরিফ হোসেন, সাহিদুল ইসলাম, ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ, জাহাঙ্গীর মণ্ডল, ফাহিমা ইসলাম লোপা, রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, শরীফ উদ্দিন চৌধুরী ওরফে পাপ্পু, তুহিন রহমান ফাহিম, সৈয়দ মুজতবা আলী প্রকাশ রুমী, মোহাম্মদ রাশেদ মাহমুদ ওরফে আলী হোসেন রাশেদ ওরফে মাহমুদ, সাইদুল ইসলাম ওরফে নুরুজ্জামান, সুজন হাওলাদার, ডা. দেওয়ান মো. ফরিউদ্দৌলা ওরফে পাপ্পু ও মামুন উর রশীদ। তাদের মধ্যে সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল, ফাহিমা ইসলাম লোপা, শরীফ উদ্দিন চৌধুরী ওরফে পাপ্পু ও সৈয়দ মুজতবা আলী প্রকাশ রুমী পলাতক রয়েছেন। অপর ১৪ আসামি জামিনে রয়েছেন।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল্লাহ আবু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ মামলায় সাক্ষীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও তারা সাক্ষ্য দিতে আসছেন না। আমরা সাক্ষীদের আদালতে হাজিরের চেষ্টা করছি। আশা করছি মামলাটির বিচার কার্যক্রম দ্রুত শেষ করতে পারবো।’
মামলার বাদী মিল্কির ছোট ভাই রাশেদুল হক খানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।









