আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর একাধিক গ্রুপের পর এখন পাহাড়ের নতুন আপদের নাম কুকি-চীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। সশস্ত্র এই সংগঠনের সদস্যরা চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ ও সশস্ত্র হামলাসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে পাহাড়কে অশান্ত করে রেখেছে বলেও তারা দাবি করছে। সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে পার্বত্য জেলা বান্দরবানসহ আশেপাশের এলাকায় পর্যটন ব্যবসাসহ সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জনজীবন হুমকির মুখে রয়েছে। কেএনএফ আলাদা প্রশাসনিক অঞ্চলের স্বীকৃতির দাবি করে আরও এক ধাপ এগিয়ে আছে।
কী চায় কেএনএফ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, বিচ্ছিন্নতাবাদী এই দলটি পার্বত্যাঞ্চলের ৯টি উপজেলা নিয়ে আলাদা প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করতে চায়। বাঘাইছড়ি, জুরাইছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলীকদম নিয়ে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল দাবি করে আসছে। এছাড়াও পাহাড় ও বনাঞ্চল সংরক্ষণের নামে ‘ইনার লাইন পারমিট (আইএলপি)’ প্রণয়ণের দাবিও জানিয়ে আসছে তারা।
নিজেদের আলাদা প্রশাসনিক অঞ্চল দাবি করে কেএনএফ তাদের একটি সামরিক শাখাও খুলেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে তাদের প্রচারণাও রয়েছে জোড়ালোভাবে। তারা এই শাখার নাম দিয়েছে কুকি-চীন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ)। বিভিন্ন সময় তাদের কয়েকজনের সশস্ত্র ছবি ফেসবুক পেজসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় দিয়ে প্রচারণাও অব্যাহত রেখেছে।
স্থানীয়রা জানান, পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনতে সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি-১৯৯৭’ সই হয়, যা ‘শান্তি চুক্তি’ নামে পরিচিত। চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়, যার কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯৯ সালে।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রায় দুই যুগ পর বর্তমানে পাহাড়িদের মধ্যেই চুক্তির পক্ষে-বিপক্ষে পাঁচটি সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এরমধ্যে বান্দরবান-কেন্দ্রিক কেএনএফ এবং এমএনপি সম্প্রতি তাদের তৎপরতা বাড়িয়েছে। এই সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর প্রধান কাজ চাঁদাবাজি। অপহরণ করে পরে মুক্তিপণও আদায় করে তারা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র বলছে, পার্বত্যাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র গ্রুপগুলোর হাতে গত এক দশকে ৪৭২ জন বাঙালি এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ২৩৯ জন অপহৃত হয়েছে। পরে মুক্তিপণ দিলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। গত মার্চে বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে সেনাবাহিনীর টহল দলের ওপর কেএনএফ সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে সেনাবাহিনীর মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিন নিহত হন। আহত হন আরও দুই সেনাসদস্য। গত মে মাসে কেএনএফ-এর সশস্ত্র শাখা কেএনএ-এর হামলায় দুই সেনা সদস্য নিহত হন। সন্ত্রাসীরা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস-আইইডি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় ও অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে। সংঘাতময় পরিস্থিতিতে গত কয়েক মাসে পাঁচ সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। কেএনএফ-এর আট সদস্যসহ নিহত হয়েছেন আরও ১৬ জন। অপহরণের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ২০ জন।
কেএনএফ কারা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো জানাচ্ছে, কেএনএফ সংগঠনটি গড়ে উঠেছে বান্দরবানের রুমা উপজেলায়। স্থানীয় বাসিন্দা নাথান বম এটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে ২০১২ সালে কুকি-চীন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন্স (কেএনডিও) নামে সংগঠন করেন। পরবর্তীকালে ২০১৮ সালে কুকি-চীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) নামে সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করে, যদিও সংগঠনটির লোগোতে প্রতিষ্ঠাকাল উল্লেখ করা আছে ২০০৮ সাল।
শুরুতে সামাজিক আন্দোলনের নামে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার জেএসএস এবং ইউপিডিএফ-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করতো তারা। এছাড়া বম, লুসাই, পাংখো, খিয়াংসহ পিছিয়ে পড়া নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের চাকমা ও মারমাদের ব্যাপক বৈষম্যের প্রতিবাদ নিয়ে তারা কাজ করছিল। গত বছরের শেষের দিকে এসে কেএনএফ আন্ডার গ্রাউন্ডে চলে যায়। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এক পর্যায়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। কেএনএফ-এর সঙ্গে নতুন জঙ্গি গোষ্ঠী ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্কিয়া’র সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো দাবি করে আসছে।
গত ৫ আগস্ট (শনিবার) কেএনএফ তাদের ফেসবুক পেজে হুমকি দিয়ে এক স্ট্যাটাসে বলেছে, সরকারি চাকরি বা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের আশ্বাস দিয়ে কেএনএফ-এর সঙ্গে আর কোনও বৈঠক নয়। বৈঠক হবে কেএনএফ-এর দাবি ও রাজনৈতিক সমাধানের উপায় নিয়ে। অন্যথায়, সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে পাহাড়কে অচল করে দেওয়া হবে।
পাবর্ত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ
পাবর্ত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক মো. শাহজালাল রানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কেএনএফ ও এমএনপির সন্ত্রাসীদের হামলার ভয়ে নিরীহ পাহাড়ি-বাঙালি সবাই আতঙ্কের মধ্যে থাকে। সন্ত্রাসীদের ভয়ে সব উন্নয়নকাজ বন্ধ। কোনও ঠিকাদার কাজ করতে সাহস করছে না। পর্যটন, কৃষিসহ সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
সংগঠনটির সহসভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফের সঙ্গে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে অনলাইন বৈঠক করে সমঝোতার চেষ্টা করছে। কিন্তু কেএনএফ তাদের তৎপরতা বন্ধ করেনি। তাদের হাতে যে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র আছে, সেটা পাহাড়ি-বাঙালি সবার জন্যই বড় হুমকি। তাই অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সমঝোতার বিষয়ে সরকারি বা রাজনৈতিক পদক্ষেপ জরুরি।
শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি
কেএনএফ-এর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ ও সমস্যা সমাধানে সশস্ত্র এই গ্রুপটির সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে। এজন্য গত ২২ জুন বান্দরবানে ১৮ সদস্যের একটি ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি’ গঠন করা হয়। বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা কে আহ্বায়ক ও লালজার বমকে সদস্য সচিব করা হয় শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির। মুখপাত্র করা হয় কমিটির সদস্য কাঞ্চন জয় তঞ্চঙ্গ্যাকে। মুইয়াম বমসহ কেএনএফ-র শীর্ষ কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে দুই দফায় অনলাইন বৈঠক করেছের এই কমিটি। গত ১৯ জুলাই এবং গত ৪ আগস্ট অনলাইনে এ দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আগামীতে তাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করারও চেষ্টা চলছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
কেএনএফ-এর সঙ্গে শান্তি আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি’র মুখপাত্র কাঞ্চন জয় তঞ্চঙ্গ্যা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সন্ত্রাসী হুমকির কারণে বান্দরবানের ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা চলছে। গত জুলাই মাসে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলেও এখনও আতঙ্ক কাটেনি। আমরা চেষ্টা করছি, আলাপ- আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য।
তিনি বলেন, আমরা এখনও তাদের সঙ্গে আলোচনার কোনও বিষয়কে নেগেটিভলি নেইনি। তাদের তো অসীম সমস্যা, অসীম দাবি। যেটা আমাদের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেই দাবি আমরা কিংবা সরকার মানবে না। কখনই মেনে নিতে পারবে না। সেক্ষেত্রে যদি তারা আলোচনায় ছাড় না দেয়, তাহলে তো আর সমঝোতা হবে না। ভুল বোঝাবুঝি হবে। আমরা চাই, এসব ভুল বোঝাবুঝি হওয়ার আগে কিংবা কোনও সংঘাত যাতে না হয়, সেজন্য আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করতে। পাহাড়ে যাতে শান্তি ফিরে আসে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের বান্দরবান জোনের সহকারী পুলিশ সুপার নকিবুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কেএনএফসহ কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হুমকির কারণে পাহাড়ের মানুষ আতঙ্কে আছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা বাণিজ্য। গত ১২ জুলাই থেকে পর্যটকদের যাতায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলেও নানা আশঙ্কায় পর্যটকের সংখ্যা খুবই কম। পরিবহন শ্রমিকরাও নিরাপত্তাহীনতার কারণে পর্যটন স্পটগুলোতে যেতে চায় না। তিনি বলেন, কেএনএফ-এর সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির সদস্যরা আলোচনা করছেন। দেখা যাক কী হয়।









