দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠন হয়েছিল ২০০৪ সালে। দুর্নীতি দমনে গতিশলীতা আনতে ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’কে বিলুপ্ত করে কমিশন গঠন করে সরকার। সাংগঠনিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হলেও দুর্নীতি দমনে তেমন একটা গতি পায়নি সংস্থাটি। মাঝে ওয়ান-ইলেভেন বা ১/১১ এর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিভিন্ন পর্যায়ের দুর্নীতিবাজদের মনে যে ভীতি সৃষ্টি হয়েছিল, সেই ভীতি এখন আর নেই। দুদক অপরাপর সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতোই কাজ করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে কালো টাকার মালিক ও দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে তেমন একটা সক্রিয় হচ্ছে না দুদক।
চলতি বছরে মামলা হয়নি কোনও রাজনীতিকের বিরুদ্ধে
তিন মাস পরপর দুদকের পক্ষ থেকে সংস্থাটির কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি প্রকাশনা বের করা হয়, যার নাম ‘দুদক বার্তা’। এপ্রিল-জুন (২০২৩) সংখ্যার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত কোনও রাজনীতিকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে কোনও মামলা করা হয়নি। জুলাই মাসেও কোনও রাজনীতিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। ‘দুদক বার্তা’র তথ্যমতে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত মোট মামলা করা হয়েছে ৪৮টি। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ১০২ জনকে। আসামিদের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী ৫৭ জন, বেসরকারি চাকরিজীবী ১৫ জন, ব্যবসায়ী ১২ জন, জনপ্রতিনিধি একজন এবং অন্যান্য পেশার ১৬ জন। তাদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত-আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, আত্মসাৎ, মানিলন্ডারিং, ঘুষ লেনদেন, জাল-জালিয়াতি ও মিথ্যা অভিযোগ দায়েরের অভিযোগ রয়েছে। একই অভিযোগে এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত মামলা দায়ের করা হয়েছে ৬১টি। এসব মামলার আসামির সংখ্যা ১২৮ জন। এক্ষেত্রেও সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী রয়েছেন ১২৬ জন। ব্যবসায়ী ৬ জন। অন্যান্য পেশার আসামি আছেন ২৬ জন।
এই ছয় মাসে কোনও রাজনীতিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়নি। তবে অনেক রাজনীতিকের বিরুদ্ধেই অনুসন্ধান ও আগে দায়ের করা মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। এ সময়ে বিকল্প ধারার মহসচিব সাবেক এমপি মেজর অব. এম এ মান্নানের বিরুদ্ধে প্রায় এক ডজন মামলা দায়ের করা হলেও সেটাকে তারা রাজনৈতিক মামলা বলতে নারাজ। দুদক বলছে, তিনি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স করপোরেশন লিমিটেডের (বিআইএফসি) চেয়ারম্যান বা ব্যবসায়ী হিসেবে অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত। সেই হিসেবে ঋণ মঞ্জুর ও বিতরণ দেখিয়ে প্রায় ২০০ কোটি আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ এনে তার বিরুদ্ধে দুদক একাধিক মামলা দায়ের করে। নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের বিষয়েও দুদক কর্মকর্তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয় বলে দাবি করেন। তাকেও দেখানো হয়েছে ব্যবসায়ী হিসেবে।
দুদকে মার্কিন প্রতিনিধি দল
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের বৈশ্বিক দুর্নীতি দমন বিষয়ের সমন্বয়ক রিচার্ড নেফিউর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের একটি মার্কিন প্রতিনিধি দল গত ৬ আগস্ট বিকালে যান দুদকে। তারা দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেনের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, রাজনৈতিক ইস্যু কিংবা নির্বাচন নয়। দুদকের আইন-কানুন ও অর্থপাচার সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন তারা। অর্থপাচার রোধের নতুন কৌশল নিয়েও আলোচনা হয়েছে তাদের সঙ্গে।
দুদকের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, সংস্থাটি দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও মার্কিন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের পর সেই জায়গা থেকে তারা সরে এসেছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে দুদক থেকে সরকার কিংবা বিরোধী দলীয় আর কোনও রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধেই ‘অ্যাকশনে’ যাবে না। যেসব রাজনীতিকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও তদন্ত চলছে— সেগুলো ধীরগতিতে চালানোর নীতিগত সিদ্ধান্তই রয়েছে দুদকের।
যা বললেন দুদক কমিশনার (তদন্ত)
ওয়ান ইলেভেন বা ১/১১ এর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের মতো রাঘব-বোয়াল দুর্নীতিবাজদের মনে আতঙ্ক ধরাতে বর্তমানে দুদক অভিযান চালাবে কিনা, এমন এক প্রশ্নের জবাবে কয়েকদিন আগে দুদকের কমিশনার (তদন্ত) জহুরুল হক বলেন, ‘আপনারা ওয়ান-ইলেভেনের মতো বলছেন কেন? ওয়ান-ইলেভেন ডেমোক্রেসি সিস্টেম না। আমরা তো ডেমোক্রেটিক সিস্টেমে আছি। আমরা ওয়ান- ইলেভেনের মতো হবো না। আইনে যা আছে তার মতো হবো। আইন অনুযায়ী আচরণ করবো।’
তিনি বলেন, ‘তাই বলে আমরা কাউকে ভয় পাচ্ছি বলে মনে করবেন না। আট বছর পর আমরা শেখ আব্দুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছি। আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট অনেকের বিরুদ্ধে তদন্ত করছি। ভয় পাইলাম কোন জায়গায়। তবে আমরা ওয়ান-ইলেভেন হতে চাই না। আমরা ডেমোক্রেটিক হতে চাই। লিগ্যাল হতে চাই। আইন যেভাবে বলে, সেভাবে আমরা আচরণ করছি। এখন আইনের মাধ্যমে কিছু লোক ছাড়া পেয়ে যায়। কারণ, তথ্য পাওয়া যায় না। তথ্য দেন, যদি আমরা গ্রহণ না করি, তখন আপনারা বলবেন। আমরা যে তথ্য পাই, যার বিরুদ্ধে যতটুকু তদন্ত হওয়া উচিতে, সেটুকু আমরা করছি। অনেক বড় বড় কাজ এই কমিশন করেছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ব রেকর্ডও করেছে। তবে সব কিছুতেই সাকসেসফুল হওয়া যায় না। সব কাজেরই কিছু ত্রুটি থাকে। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। সব কাজ সবসময় হয়েছে, বিশ্বের কোথাও এমন নজির নাই। আমরা যতটুকু পারছি— ত্রুটিমুক্ত অবস্থায় কাজ করার চেষ্টা করছি। অনেক রাঘব- বোয়ালকে আমরা ধরেও ফেলেছি।’
দুদক চেয়ারম্যান যা বললেন
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, যারা দুর্নীতিবাজ ও কালো টাকার মালিক, তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেবো। নির্বাচন আসছে বলেই আমরা বাড়তি কিছু করবো সেটা নয়। আমাদের কাজ চলবে। দুর্নীতিবাজ ও কালো টাকার মালিক— যাদের বিষয়ে আমরা তথ্য পাবো ও অভিযোগ আসবে, তাদের বিরুদ্ধে দুদক ব্যবস্থা নেবে।’
সোমবার পড়ুন: নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ৬৪৯৪ মামলা: বিলম্বের কারণ জানালো দুদক
আরও পড়ুর:
সরকারি দফতরের দুর্নীতি তদন্তে দুদকের চিঠি কতটা কার্যকর?
সীমাবদ্ধতা কমিয়ে ক্ষমতা বাড়াতে চায় দুদক
জনস্বার্থবিরোধী কাজ ঠেকাতে যা করে দুদক








