বিভিন্ন মানুষের তথ্য দিয়ে সিম কিনে নগদ ও বিকাশে একাউন্ট খুলতো একটি চক্র। সেসব নম্বর থেকে ফোন করে জিনের বাদশা, পুলিশের এসপি, বিকাশ-নগদের কর্মকর্তা পরিচয়ে ‘প্রতারণা’ করে আসছিল চক্রের সদস্যরা। রবি ও সোমবার (২০ ও ২১ আগস্ট) ওই চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থান থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসিন বাংলা ট্রিবিউনকে এসব তথ্য জানান।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন– অনিক (২২), মো. রবিউল হোসেন (২৫), সাব্বির করিম আহাম্মেদ (৩৭), জোবায়ের আলম (৩৬), মোক্তার হোসেন (২৫), অন্তু দে (২২) ও ফজলুল করিম নাহিদ (৩৪)।
তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর কোম্পানির ২১৪টি সিম, একটি ল্যাপটপ, আটটি স্মার্ট ফোন, দুইটি ট্যাব, পাঁচটি বাটন ফোন, নগদ পকেট ডাক্তার লেখা সংবলিত ৫০০টি ডিসকাউন্ট কার্ড, গ্রিন বাংলা আরকেআর লেখা সংবলিত কার্ড, বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তার সিল, ভুয়া পুলিশ কার্ড, ভুয়া সাংবাদিক কার্ড, নগদে লেনদেনের কার্ডসহ বিভিন্ন ব্যক্তির জাতীয় পরিচয় পত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
চক্রটি তিন ধাপে প্রতারণা করতো জানিয়ে ওসি বলেন, ‘ওই চক্র প্রতারণার কাজ করতো তিনটি ধাপে। প্রতিটি ধাপে কাজ করতো আলাদা আলাদা গ্রুপ। প্রথম গ্রুপ বিভিন্ন মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র, আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করতো। তাদের তথ্য দ্বিতীয় গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দিতো। এসব তথ্য দিয়ে সিম কিনে বিকাশ ও নগদ একাউন্ট খোলা হতো। এরপর সেসব সিম উচ্চ মূল্যে বিক্রি করতো তৃতীয় গ্রুপের কাছে। তারা এসব সিম ব্যবহার করে কখনও জিনের বাদশা, কখনও বিকাশ-নগদ এজেন্ট, কখনও বা বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা সেজে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতো। ’
তিনি বলেন, ‘বিকাশের মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগে ২০২২ সালের ৭ সেপ্টেম্বর মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা হয়। সেই মামলা তদন্তে গিয়ে আটক করা হয় অরুণা নামে একজনকে। অরুণা জানান, তিনি ফোন ব্যবহার করেন না। তার কাছে কোনও সিম নেই। বিকাশ কিংবা নগদ একাউন্টও নেই তার। পরে প্রযুক্তির সহায়তায় নিশ্চিত হওয়া যায়, এই ঘটনার সঙ্গে অরুণার যোগসাজশ নেই। কারণ, অরুণা ঢাকায় থাকলেও সিমের অবস্থান রাজশাহীতে।’
ওসি বলেন, ‘সরকার স্বল্পমূল্যে চাল, ডাল, তেল দেবে বলে অরুণাদের বাসায় কয়েকজন লোক যায়। তারা অরুণাসহ অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র, চোখের ছাপ ও আঙুলের ছাপ নেয়। স্বল্পমূল্যে চাল, তেল দেওয়ার নামে অরুণাসহ অনেকের তথ্য হাতিয়ে নেই গ্রেফতার অনিকের গ্রুপ। কেউ যাতে সন্দেহ না করে এজন্য মাঝে মাঝে বিভিন্ন বাসায় আটার প্যাকেট, তেলেরও বোতলও নিয়ে যেতো তারা। সবাই প্রতিষ্ঠানের লোগো সংবলিত একই ধরনের টি-শার্ট পরতো।’
গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে মোহাম্মদ মহসিন বলেন, ‘গ্রেফতার জোবায়ের ও সাব্বির বিকাশের ডিস্ট্রিবিউটর সেলস সুপারভাইজার এবং মোক্তার হোসেন ও অন্তু দে ডিস্ট্রিবিউটর সেলস অফিসার পদে চাকরি করে। তারা নিজেদের কাছে থাকা পাসওয়ার্ড এজেন্টের কাছে দেয়। এতে এজেন্ট সহজেই একাউন্ট খুলতে পারেন। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের বেঁধে দেওয়া মাসিক টার্গেট পূরণের জন্যই ওই চক্রকে সহযোগিতা করতো তারা।’
ওই চক্রের একটি সিমের দাম পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে জানিয়ে ওসি বলেন, ‘যেসব সিম প্রতারণার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হতো তা বিক্রি করা হতো অন্যান্য প্রতারক চক্রের কাছে। চক্রগুলোর কাছে এসব সিমের খুব চাহিদা। তারা এক হাজার থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার টাকায় একেকটি সিম বিক্রি করতো।’
তিনি বলেন, ‘ওইসব সিম দিয়ে কখনও জিনের বাদশা সেজে মানুষকে ফোন দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিতো চক্রটি। কখনও পুলিশের এসপি সেজে মামলা থেকে ছাড়িয়ে দেওয়ার নামে টাকা আত্মসাৎ করতো। বিকাশ কিংবা নগদের কর্মকর্তা সেজেও প্রতারণা করতো তারা।’









