মানুষের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তে ব্যবসা করছে কারা

উদিসা ইসলাম
২৩ আগস্ট ২০২৩, ১০:০০আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৩, ১০:০০

জরুরি রোগী নিয়ে হাসপাতালে রওনা দিতে, কিংবা লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় অ্যাম্বুলেন্স দরকার হলে মৃতের আত্মীয়-স্বজন ভাড়ার পরিমাণ নিয়ে খুব বেশি দরাদরির মানসিক অবস্থায় থাকেন না। এই সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া হাঁকেন অ্যাম্বুলেন্সের চালক ও মালিকরা। সম্প্রতি স্বজনের লাশ ঢাকা থেকে রাজশাহী নিতে লাশবাহী গাড়ির চালকের সঙ্গে একটি পরিবারের ১৬ হাজার টাকায় রফা হয়। রাত ৪টায় রওনা দিয়ে মোহাম্মদপুরে লাশের গোসল সেরে সকাল ১০টায় তারা রাজশাহীতে পৌঁছান। ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বাড়ির সামনে লাশবাহী গাড়িটি অপেক্ষমাণ থাকে দুপুরে জানাজা হবে বলে। জানাজার পর ফ্রিজিং গাড়ির চালক আরও ৬ হাজার টাকা দাবি করেন। কারণ জানতে চাইলে বলেন, গন্তব্যে পৌঁছানোর পরের দুই ঘ্ণ্টার চার্জ এবং পুরো পথই এসি বন্ধ না করে তাপমাত্রা অনেক কমিয়ে মরদেহ সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। এরপর ২২ হাজার টাকা নিয়ে তারা ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়।

পরের বাড়তি ৬ হাজারের বিষয়ে সেই পরিবারটির আগে থেকে জানা ছিল না বা তাদের সঙ্গে এ নিয়ে আগে কোনও কথাও হয়নি গাড়ির চালক বা মালিকের। মানুষের দুর্বল মুহূর্তে এ ধরনের ব্যবসায়ী অবস্থান নিয়ে জানতে চাইলে গাড়ির মালিক ও চালক বলছেন, ‘আমার তো ব্যবসা করি। মানবিক হওয়ার সুযোগ নেই। সবাই দেয়।’  প্রশ্ন হলো, কোন দূরত্বে কত ভাড়া তারা চাইবেন—এর কি কোনও তালিকা নির্ধারণ করে দেওয়া নেই? অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি বলছে, তেমন কোনও নিয়ম নেই। চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনরা বলছেন, সবার আগে দরকার নীতিমালা।

লাশবাহী গাড়ি চলে বেসামাল

কেবল যে ভাড়া চড়া তা-ই নয়। অ্যাম্বুলেন্স চালকরা এত অনিয়ন্ত্রিত গাড়ি চালায় যে প্রায়শ দুর্ঘটনার মুখে পড়তে হয়। সরেজমিন দেখা গেছে, চালকদের বেশিরভাগই তরুণ। কথা হয় শেরেবাংলা নগর এলাকায় চালক শামীমের সঙ্গে। এটাই তার প্রথম কাজ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মালিক দক্ষ চালক নিতে চায় না। আমাকে যে টাকায় পাওয়া যায়, সে টাকায় দক্ষ চালক কোথায় পাবে। অনেকের ঠিকমতো কাগজও নেই। অ্যাম্বুলেন্স আর লাশবাহী গাড়ি থামিয়ে চালকের কাগজপত্র পরীক্ষা করারও সুযোগ নেই। সেই সুযোগটাকেই কাজে লাগানো হয়।

অ্যাম্বুলেন্স আর লাশবাহী গাড়ির মালিকরা দুর্বল মুহূর্তের সুযোগ নিয়ে কম পয়সার অদক্ষতাকে প্রশ্রয় দেন,  উল্লেখ করে উন্নয়নকর্মী, অ্যাক্টিভিস্ট ও লেখক গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘গত ডিসেম্বরে আমার এক ভাই মারা যান ঢাকার কল্যাণপুরের একটি হাসপাতালে। তাকে গোসল করানোর জন্য আল মারকাজুলে নিতে হবে। গাড়ির চালক যখন বললেন, তিনি জায়গাটি চেনেন না। তখন বিষয়টা জানতে চাইলে নতুন ওই চালকটি বলেন, অন্য গাড়ির চালকদের বুক ধুকপুক করলেও অ্যাম্বুলেন্সের ক্ষেত্রে সেই ধুকপুকানি থাকে না।’

এত নির্বিকার হয়ে মানুষের খারাপ সময়ে বেশি টাকা আদায় করা যায় কিনা প্রশ্নে মালিকরা বলছেন, আমাকে যখন আপনি বেঁধে দেবেন না, তখন যেখান থেকে যত আদায় করা যায়, সেটাই তো করবো। চালকরা লাশ নিয়ে যেতে যেতে বিষয়টা তাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তবে বিষয়টা অমানবিক কিনা প্রশ্নে বলেন, ব্যবসা তো ব্যবসাই।

অসহায়ত্বের পরও মেনে নেয় মানুষ

২৫০ শয্যার হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালের ভেতরে অ্যাম্বুলেন্স রেখে ব্যবসা করতে না দেওয়ায় সম্প্রতি জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন সেখানে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয়। ওই ধর্মঘটে জেলার সঙ্গে ঢাকা ও সিলেটসহ সারা দেশের পরিবহন যোগাযোগ বন্ধ থাকে। মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে। এছাড়া কিছু দিন আগে বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতি ছয় দফা দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দেয়। অবিলম্বে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন, দেশের প্রত্যেকটি হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সের পার্কিং সুবিধা চায় তারা। পরবর্তীকালে সরকারের হস্তক্ষেপে তাদের দাবি পূরণের আশ্বাস দিলে ধর্মঘট কর্মসূচি বাতিল করা হয়।

বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. গোলাম মোস্তফা সব অভিযোগ মেনে নিয়ে বলেন, ‘এ জন্যই আমরা একটা নীতিমালা চেয়ে আসছি। এটা হলে ভাড়া নির্ধারণ করা থেকে শুরু করে সেবার মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এখন তো যার যার মতো করে একটা গাড়ি কিনে অ্যাম্বুলেন্স বানিয়ে ফেলছে। এদের অরাজকতা নিয়ে গণমাধ্যমে কথা হলে কিছু দিন চুপ করে থাকে। তারপর আবারও শুরু হয়।’ রোগীর স্বজনদের দুর্বল মুহূর্তের সুযোগ নিয়ে ব্যবসা করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি রোগী মারা গেলে সে সময় পরিবারের মাথা ঠিক থাকে না। তখন দালাল এসে ৮ হাজারের ভাড়া ১০ হাজার নিয়ে ২ হাজার টাকা নিজের কাছে রেখে, একটা ব্যবস্থা করে দেয়।’

গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমার মনে হয় এসব ক্ষেত্রে আমাদের মানবিক হওয়া দরকার, বিবেক থাকা দরকার। সেটা ঠিক করতে রাষ্ট্রের উদ্যোগ দরকার। একটা ভাড়া নির্ধারণ করে দিলে আর কেউ হয়রানির শিকার হবে না।’ তিনি অ্যাম্বুলেন্সকে মাদক চোরাচালানের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার কথাও স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘বিআরটিএ ও স্বাস্থ্য বিভাগ যদি আমাদের গাড়ির কাগজে ‘ভাড়ায় চালানো যাবে না লিখে না দেয়—তাহলে পুলিশের হয়রানিও বন্ধ হয়ে যাবে। কে না জানে, অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ায় চালানো হয়।’

জনস্বাস্থ্যবিদ হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাজটা পরিকল্পিতভাবে না করে অ্যাডহক ভিত্তিতে চালানো হয়। কোথাও কোনও কিছু নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, তখন সেটা সমাধানের পথ খোঁজা শুরু হয়। বেসরকারি খাত নিয়ে সেই একই কথা শতভাগ প্রযোজ্য। সরকারি কোনও ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বেসরকারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইলে, সেটাকে অবশ্যই একটা আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ি কীভাবে চলাচল করবে—তার ভাড়া, তার মান থেকে শুরু করে সবকিছু সরকারকে নির্ধারণ করে দিতে হবে। তা না হলে দরকষাকষির মধ্য দিয়ে মানুষকে হয়রানির মধ্যেই থাকতে হবে। একটু মানসম্পন্ন অ্যাম্বুলেন্সে কী কী থাকতে হবে, তা আছে কিনা, সেটা মনিটরিং না হওয়া মানে রোগীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। ফলে দ্রুত এই ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে আনা দরকার।’

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
নিজের গাড়িবহর থামিয়ে অ্যাম্বুলেন্সকে সাইড দিলেন প্রধানমন্ত্রী
আগুনে পুড়লো হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স
কারাগারে চিকিৎসা ও অ্যাম্বুলেন্স সংকটে বাড়ছে বন্দি মৃত্যু
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক