২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে দলের কর্মী-সমর্থক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এদিন পুলিশ বক্সে ভাঙচুর, গাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করা হয়। পরদিন ২৯ অক্টোবর দলটির পক্ষ থেকে দেওয়া হয় হরতাল। সেদিনও ঘটে একই ধরনের ঘটনা। এক দিন বিরতি দিয়ে মঙ্গলবার (৩১ অক্টোবর) থেকে দেওয়া হয় দেশব্যাপী টানা তিন দিনের অবরোধ কর্মসূচি। অবরোধের প্রথম দিনেই পিকেটিং ও বিভিন্ন জায়গায় চোরাগোপ্তা হামলা ও বাসে আগুন দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো বলছে, এসব ঘটনা তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। চোরাগোপ্তা হামলা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, ২৮ অক্টোবর থেকে ৩১ অক্টোবর সন্ধ্যা পর্যন্ত চার দিনে সারা দেশে প্রায় ৫০টির বেশি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৩০টির বেশি ঘটনা ঘটে রাজধানীতে। এ সময় ফায়ার সার্ভিসের পানির গাড়িও ভাঙচুরের মুখে পড়ে, আগুন দেয় উচ্ছৃঙ্খল জনতা। এতে ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা ও চালক আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, বিশেষ করে গণপরিবহনকে কেন্দ্র করে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে ভাঙচুর এবং আগুন দেওয়ার ঘটনা শঙ্কার সৃষ্টি করেছে, জনমনে ভীতির সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা সড়কে তাদের মালিকানাধীন গাড়িগুলো বের করতে শঙ্কায় রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন সড়কে দায়িত্ব পালন করলেও এর মাঝেই ঘটছে বাস, পিকআপে আগুনের ঘটনা।
পুলিশ সদর দফতর সূত্র বলছে, অবরোধ চলাকালীন যানবাহন, যাত্রী এবং বিভিন্ন স্থাপনার নিরাপত্তার বিষয়ে আরও তৎপর থাকতে বলা হয়েছে। চলাচলরত যানবাহনগুলোয় কোনও ধরনের অপকর্ম করতে পারে, এমন ব্যক্তি বা কোনও বিষয় নজরে এলে সঙ্গে সঙ্গে ৯৯৯-এ ফোন করার জন্য বলা হয়েছে। নগরবাসী কিংবা চলাচলরত যাত্রী নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে আরও সচেতন হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজ করতে বলা হয়েছে। জনসম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে নির্বাচনকেন্দ্রিক যে ধরনের চোরাগোপ্তা কিংবা হামলার ঘটনা ঘটিয়েছিল বিএনপি-সহ তাদের অঙ্গসংগঠন, তারই পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে ২০২৩ সালে। রাজনৈতিক দলগুলোকে সহিংসতার পথ পরিহার করে গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে অহিংস আন্দোলন পরিচালনা করার কথা বিভিন্ন সময় বলা হয়। কিন্তু সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে সমাবেশ কিংবা হরতাল বা অবরোধ যে কর্মসূচি ঘোষণা করা হোক না কেন, সেই কর্মসূচিকে ঘিরে সহিংস হয়ে উঠছে বিএনপি এবং অন্য রাজনৈতিক দল।
গাড়ি পোড়ানো কিংবা হামলার ঘটনাগুলো কাদের নির্দেশে হচ্ছে, কারা এসব ঘটনা ঘটানোর মদত দিচ্ছে, আর্থিক সাপোর্ট কারা দিচ্ছে, এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে এরই মধ্যে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। যাদেরই নাশকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া যাবে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে বলে জানান তারা।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এরই মধ্যে গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। আবার অনেকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। এমন একাধিক ব্যক্তিকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হয়েছে, যারা আগেও রাজধানীতে বিভিন্ন বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। আগেও তাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। জামিনে এসে আবারও একই ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। তাদের বিষয়গুলো আরো গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে থাকার চেষ্টা করলেও তাদের অবস্থান চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
এ ছাড়া ভেস্ট পরে সাংবাদিক কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সেজে নাম ব্যবহার করে যারা আগুন লাগার ঘটনা ঘটাচ্ছে, এসব বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স ড. খ. মহিদ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, একজন নিরীহ মানুষ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। তার ওপর কোনও কিছু নিক্ষেপ করা, এ ধরনের জঘন্য কাজ কোনও রাজনৈতিক দল করতে পারে, এটা আমার বিশ্বাস হয় না। কেউ যদি চোরাগোপ্তা হামলার অপচেষ্টা অব্যাহত রাখে, তা আমরা প্রতিহত করবো, আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না। গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।









