‘আমি ও আমার বন্ধু নাঈম প্রায় প্রতিদিনই বাসে ঘুমাতাম। ওই দিনও কাজ শেষ করে ক্লান্ত ছিলাম। বাসেই শুয়ে পড়ি। আমরা তখন গভীর ঘুমে। হঠাৎ একটা শব্দে ঘুম ভাঙলো। চোখ মেলতেই দেখি আমার শরীরে আগুন। কিছুই বুঝতে পারিনি কীভাবে কী হলো। দেরি না করে জানালার গ্লাস ভেঙে লাফ দিয়ে নিচে পড়ি। তারপর আমি আর কিছুই বলতে পারিনি।’ এই কথাগুলো বলছিলেন অসীম পরিবহনের শ্রমিক রবি।
গত ২৯ অক্টোবর ভোররাত ৩টার দিকে রাজধানীর ডেমরা এলাকায় পার্কিংয়ে থাকা অসীম পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এতে দগ্ধ হন বাসচালকের সহকারী মো. নাঈম (২২) ও রবি (২৫)। ওই সময়ই মৃত্যু হয় নাঈমের। রবি এখন চিকিৎসা নিচ্ছেন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। তার শরীরের প্রায় ১৭ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।
পোড়া শরীর নিয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আক্রান্ত হওয়ার কথা মনে করে রবি শুধুই কাঁদছেন। দুর্বিসহ ওই ঘটনা বর্ণনা করার সময় তিনি বার বার বলছেন, ‘আগুন আমার বন্ধুকে নিয়ে গেলো। এখন আমার কী হবে?’
গত ২৮ অক্টোবর বিএনপির ডাকা মহাসমাবেশের দিন থেকে শুরু করে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ১৫৪টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর। তারা বলছে, এই ১৭ দিনে সবচেয়ে বেশি আগুন দেওয়া হয়েছে ঢাকা সিটিতে। রাজধানীতে দিনে গড়ে ৫টি করে বাস পোড়ানো হয়েছে এই কয়েক দিনে।
বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর হরতাল-অবরোধের মধ্যে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অনেকেই দগ্ধ হয়ে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানান সেখানকার চিকিৎসকরা। এরকম দগ্ধ ছয় জন বর্তমানে সেখানে ভর্তি আছেন। তাদের কেউই শঙ্কামুক্ত নন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৪ নভেম্বর) খোঁজ নিতে গেলে কথা বলেন তাদের কয়েকজন। ভীতিকর, যন্ত্রণাদায়ক, দুঃস্বপ্নের মতো এই ঘটনাগুলোর বর্ণনা দেন তারা।
বিএনপি-জামায়াতের ডাকা দ্বিতীয় দফার ৪৮ ঘণ্টার অবরোধের প্রথম দিন (৫ নভেম্বর) ছিল সেদিন। প্রতিদিনের মতোই ভোরে মেরুল বাড্ডার ভাড়া বাসা থেকে কাজের জন্য বের হয়েছিলেন রমজান পরিবহনের বাসচালক সবুজ মিয়া (৩০)। বাসের মালিক তাকে আগের রাতে সাবধান করেছিলেন সড়কে ঝামেলা দেখলে বের না হতে। কিন্তু নিজের বাস নিয়ে বের হওয়ার আগেই যাত্রী হিসেবে দুর্বৃত্তের আগুনে পুড়তে হলো তাকে।
শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটের বেডে শোয়া সবুজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অসীম পরিবহনের একটি বাসে করে আমার গ্যারেজের কাছাকাছি যাচ্ছিলাম। বাস থেকে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বাসের মাঝখানের সিট থেকে উঠে এসে দরজার পাশে দাঁড়াই। বাসটির দরজার একটু দূরে একজন লোককে দেখতে পাই। বাসের চালকও বিষয়টি লক্ষ্য করছিলেন। চালক ওই লোকটিকে যাত্রী ভেবে বাসটির গতি কমান। আমিও তাই ভেবেছি। বাসটি ঠিক তখন আমার গ্যারেজের পাশে। আমি এক পা বাড়াই নিচে নামার জন্য। তখনই মুখে মাস্ক পরা লোকটি আমাকে টার্গেট করে বোমাটি ছুড়ে মারে। বাসের ভেতরে অনেকে ছিল। কিন্তু পেট্রোল বোমাটি দরজায় ছুড়ে মারায় আমিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তবে গাড়িতে তেমন কোনও আগুন লাগেনি।’
ওই পেট্রোল বোমায় সবুজের শরীরের ২৮ শতাংশ পুড়ে গেছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঘটনার পর আমি কিছুক্ষণ সেখানেই পড়েছিলাম। ভয়ে-আতঙ্কে কেউ আমার পাশে এসে দাঁড়ায়নি। অনেকক্ষণ পর আমার স্ত্রী এসে আরও লোকজনের সহায়তায় আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।’
গত ১১ নভেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ফলপট্টির সামনের সড়কে অনাবিল নামে একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় দগ্ধ হন গার্মেন্টকর্মী মো. হাসান (২৩)। তার শরীর ১১ শতাংশ পুড়ে যায়। বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওইদিন বিকালে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকার বসুন্ধরা শপিং মলে আসছিলাম কিছু কেনাকাটা করার জন্য। দুটি মোবাইল কিনেছিলাম। একটি মোবাইল আমার বন্ধুর ছিল। কাজ শেষ করে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দিতে রাত হয়। হাতিরিঝিল হয়ে রামপুরা গিয়ে অনাবিল নামে একটি বাসে উঠি। বাসটিতে ৩০ থেকে ২৫ জন যাত্রী ছিল। আমি বাসের বাসের মাঝখানের একটি আসনে বসা ছিলাম। পথে বাসটির নিচে হঠাৎ তাপ অনুভব করি। এরপর সেকেন্ডের মধ্যে বাসে আগুন ধরে যায়। তাড়াহুড়ো করে সবাই যে যেভাবে পারে লাফিয়ে নামতে থাকে। আমি তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে দগ্ধ হয়। দুই পায়ে ব্যাথা পাই।’
তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে এমন দৃশ্য দেখি নাই। এ ভয় আমাকে সারাক্ষণ তাড়া করছে।’
হাসানের পাশাপাশি ওই একটি বাসের যাত্রী ছিলেন জব্বার। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তিনি। রিকশা চালিয়ে খরচ মেটানো যাচ্ছিলো না। তাই বড় ভাইয়ের পরামর্শে পরিবারকে পাঠিয়ে দেন নারায়ণগঞ্জে। সারাদিন ঢাকায় রিকশা চালিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে ১১ নভেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার উদ্দেশ্যে অনাবিলের বাসে ওঠেন তিনি। কিন্তু আগুন সন্ত্রাসের কবলে পড়ে এখন জব্বার বিছানায় কাতরাচ্ছেন। তার শরীরের ২০ শতাংশ পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
জব্বারের বড় ভাই জিকরুল ইসলাম জানান, ‘রিকশা চালিয়েও জব্বার ঠিকমতো সংসার চালাতে পারতো না। তাই তার পরিবারকে কাজ দেওয়ার জন্য আমার এখানে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে আসি। সেদিন সারাদিন রিকশা চালিয়ে রাতে পরিবারের কাছে যাওয়ার পথে এই ঘটনা ঘটে। আমরা সবাই খেটে খাওয়া মানুষ। চিকিৎসার জন্য এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে। মানুষের কাছ থেকে হাত পেতে চলতে হচ্ছে।’
গত ৮ নভেম্বর ভোরে গাজীপুরের কালীগঞ্জে একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। ওই ভ্যানে থাকা বিপ্রজীত ভাওয়ালী (২০) ও আনোয়ার (৪৮) দগ্ধ হন। তাদের উদ্ধার করে প্রথমে ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নিয়ে আসা হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে আনোয়ার বাসায় চলে যান। বিপ্রজীত ভাওয়ালী চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে তাকে শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি মেঘনার ফ্রেশ কোম্পানিতে মেকানিক হিসেবে কাজ করি। ওই দিন বগুড়ায় আমাদের কোম্পানির গাড়ির সমস্যা হয়। তাই সেখানে গিয়েছিলাম। সেখানে গাড়ির কাজ শেষ করে একই কোম্পানির একটি কাভার্ডভ্যানে করে ফেরার পথে কালিগঞ্জ এলাকায় ৯ থেকে ১০ জন আমাদের গাড়িটিকে আটকায়। গাড়িতে ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। ওই সময় দরজা লক করা ছিল। আমি দরজা খুলে নিচে নামতে নামতে আমার শরীরে আগুন ধরে যায়।’ বিপ্রজীতের শরীরের ৭ শতাংশ পুড়ে গেছে।
১২ নভেম্বর রাতে দগ্ধ হন বিমানের ক্লিনার মানিক দাস। সেদিন রাজধানীর বনানী এলাকায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি স্টাফ বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। মানিক জানান, রাতে এয়ারপোর্টে ডিউটি শেষে ২০-২৫ জন কর্মী বিমানের স্টাফ বাসে করে বাসায় ফিরছিলেন। এয়ারপোর্ট থেকে বনানীতে ঢোকার সময় জানালা দিয়ে তরল পদার্থ ছুড়ে মারা হয়। এতে গাড়িতে আগুন ধরে যায়। তার ডান হাত ও বাম পা দগ্ধ হয়। পরে ওই বাসে থাকা তপু নামে এক সহকর্মী তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে।
তিনি আরও জানান, এই ঘটনায় ওই বাসে থাকা আরও পাঁচ ছয় জন আহত হয়েছে। তবে কোথায় তাদের চিকিৎসা চলছে তা বলতে পারেননি।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক তরিকুল ইসলাম জানান, পেট্রোলে দগ্ধ হওয়ার কারণে তাদের শরীরে ক্ষতগুলো গভীর। তাদের অনেকেরই অপারেশনের প্রয়োজন হচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকের চামড়া লাগাতে হচ্ছে। আমরা তাদের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, অবরোধের সময় যানবাহনে লাগিয়ে দেওয়া আগুনে দগ্ধ ছয় জনের কেউই এখনও শঙ্কামুক্ত নন। তারা এখনও শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। এখানে দগ্ধ সাত জন ভর্তি ছিলেন। একজন চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। বাকি ছয় জন ভর্তি আছেন। তাদের চিকিৎসা চলছে।
তিনি জানান, কয়েকজনের শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। এর মধ্যে একজনের সর্বোচ্চ ২৮ শতাংশ পুড়ে গেছে। একজন রিকশাচালক আছেন যার দুইটা হাত ও দুইটা পা পুড়ে গেছে। সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত কেউ শঙ্কামুক্ত নন।









