রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহারে এবং নির্বাচন উত্তর কার্যক্রমে প্রান্তিক মানুষের জন্য কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অন্তর্ভুক্তি ও বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিরা। বৃহস্পতিবার (২১ ডিসেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে)।
এতে বলা হয়, রাজধানীর প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বাস করে প্রায় ২৩ হাজার ২৩৪ জন মানুষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩০ সাল নাগাদ ঢাকা হবে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম মেগাসিটি। কিন্তু বিশ্বের বসবাস অনুপযোগী নগরের তালিকায় ঢাকা অন্যতম, যার অন্যতম কারণ নগরীর বর্জ্য অব্যবস্থাপনা।
লিখিত বক্তব্যে বক্তারা বলেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন তাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা ব্যবহার করে প্রতিদিন উৎপাদিত বর্জ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ সংগ্রহ করতে পারে। অন্যদিকে, নগরে যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা অবশিষ্ট অসংগৃহীত বর্জ্য নগরীর বাতাস, ভূ-উপরিভাগ ও ভূগর্ভস্থ পানি এবং মাটিকে যেমন দূষিত করছে, তেমনই বৃদ্ধি করছে নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং চিকিৎসা খরচ। বিশেষ করে, বয়োবৃদ্ধ ও শিশুদের ক্ষেত্রে শ্বাসতন্ত্রীয় রোগ, হৃদরোগ, ডায়রিয়া, এলার্জিসহ নানা ধরনের চর্মরোগ এবং অপুষ্টিজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে অন্তঃসত্ত্বা মায়েরাও মুখোমুখি হচ্ছেন মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির, যা তাদের গর্ভের শিশুর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
আরও বলা হয়, আমিনবাজার ও মাতুয়াইল ভাগাড় অনেক আগেই তার সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতা অতিক্রম করেছে। ফলে অনিয়ন্ত্রিত খোলা অবস্থায় পড়ে থাকা এই বর্জ্যের পাহাড় নগরের পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্যের জন্য সৃষ্টি করছে মারাত্মক ঝুঁকি। সেইসঙ্গে এই দুর্বল কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির ফলে মিথেন জাতীয় জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী গ্যাসের নির্গমন বৃদ্ধি পেয়ে সামগ্রিকভাবে জীববৈচিত্র্যের জন্য সৃষ্টি করছে চরম বিপর্যয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক দল ও সরকারগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা খুব একটা বিবেচনায় নেয় না। ঢাকা শহর দূষণের দিকে থেকে পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম। আর এর অন্যতম ভুক্তভোগী প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। ঢাকার যেকোনও পর্যায়ের নাগরিকরা যে পরিবেশগত সমস্যায় ভোগে তা বর্ণনাতীত। জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে ঢাকা শহরের প্রান্তিক মানুষেরা সবচেয়ে বেশি প্রান্তিক।’
গবেষক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘ঢাকা শহরের ৭০ শতাংশ বর্জ্য সংগৃহীত হয়, তাহলে বাকি ৩০ শতাংশ বর্জ্য কোথায় যায়? ভারতের ইন্দোর শহর থেকে ১০০ ভাগ বর্জ্য তারা সংগ্রহ ও পৃথকীকরণ করতে পারে, যা একটি দারুণ উদাহরণ। আমরা আমাদের বর্জ্যগুলো কাজে লাগাতে পারি।’
বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের কৃষি জমিতে জৈব উপাদানের পরিমাণ এক শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এটি আমাদের জন্য মারাত্মক উদ্বেগের বিষয়। কৃষি জমির উর্বরতা ফিরিয়ে আনার জন্য কৃষি জমিতে জৈব উপাদান ফিরিয়ে দেওয়ার কোনও বিকল্প নেই। আমরা খুব সহজেই বর্জ্য থেকে সার উৎপাদনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে পারি।’
সংবাদ সম্মেলনে তিনটি সুপারিশ জানানো হয়েছে। এগুলো হলো–সব নগরবাসীর সমান সুযোগ ও অধিকার সমুন্নত রেখে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ উন্নয়নে পরিকল্পিত, সমন্বিত ও টেকসই পয়ঃনিষ্কাশন এবং কঠিন বর্জ্যব্যবস্থাপনা করা; সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরকরণ, চলমান অর্থনীতি প্রবর্তন এবং টেকসই ও মানসম্পন্ন নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ৪-আর কর্মসূচির বাস্তবায়ন করা এবং কমিউনিটি নেতৃত্বাধীন টেকসই কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, ডিজিটাল মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন পরিবেশ অধিদফতরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও বিশিষ্ট পরিবেশবিদ প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান, ডিএসকের কনসোর্ডিয়াম কো-অর্ডিনেটর মো. রকিবুল ইসলাম।









