রাজধানী মিরপুরে-১২ নম্বর এলাকায় ঝিলকে কেন্দ্র করে চারপাশে গড়ে উঠেছে বস্তি। সোমবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বস্তির পশ্চিম দিকের অংশে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিস এখনও আগুনে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব জানায়নি। তবে শতাধিক ঘর পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বলে জানান স্থানীয়রা। ভর-দুপুরে কীভাবে আগুন লেগে দ্রুত ছড়িয়ে গেলো তার কারণ জানা যায়নি এখন পর্যন্ত। অগ্নিকাণ্ডের সময় লুটপাট হয় বলেও অভিযোগ করেন বস্তির বাসিন্দারা।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, দুপুর প্রায় পৌনে ১টার দিকে ওই বস্তিতে আগুন লাগার খবর আসে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় ফায়ার সার্ভিসের ৮টি ইউনিট সেখানে গিয়ে আগুন নেভায়। ওই ঘটনায় হতাহতের কোনও খবর পাওয়া যায়নি।
ঝিলপাড় বস্তির বয়স ৪০ বছরের বেশি। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা নিম্ন আয়ের মানুষ বংশ পরম্পরায় এখানে বসবাস করছেন। ঝিল ভরাট করে প্রতিবছরই বাড়ানো হয় ঘর। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। প্রতি মাসে এখান থেকে কয়েক কোটি টাকা পায় ক্ষমতাশালী এই চক্র।
এর আগেও বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে এই বস্তিতে। ২০১৯ সালের আগস্টে ঝিলপাড়ের বস্তিতে আগুন লেগে প্রায় ৮০ ভাগ ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সর্বস্ব হারান বস্তির প্রায় ১১ হাজার বাসিন্দা। তবে আবারও ঘর গড়ে তোলা হয় মাটি ফেলে ও ঝিলের ওপর মাচা বেঁধে।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা যায় বস্তির বড় একটি অংশ পুড়ে ছাই হয়ে ঝিলের পানিতে মিশে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীরা জানান, জোহরের আজানের আগে অথবা পরে আগুন লাগে। এই বস্তির প্রায় সবাই নিম্ন আয়ের কর্মজীবী এবং তারা ভাড়া করা ঘরে থাকে। স্থানীয়রা বেশিরভাগই গার্মেন্টস ও বাসাবাড়িতে কাজ করেন বা রিকশা চালান। তাই দুপুরের ওই সময়টায় বস্তিতে মানুষজন কম থাকে। বাসার বাচ্চারা সড়কের ওপরে এসে খেলাধুলা করে।
আগুন লাগার সময়ও বস্তি প্রায় ফাঁকা ছিল। ভেতরে যারা ছিল, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই তারা দ্রুত বের হয়ে যান। এ কারণে কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে রক্ষা করা যায়নি ঘরে থাকা জিনিসপত্র।
ক্ষতিগ্রস্ত জাহানারা বেগম (৫০) বলেন, ‘দুপুরে আমি নামাজ পড়তে দাঁড়াইলে আমার নাতি আইসা আমাকে টাইনা বাইরে নিয়ে আহে। এক কাপড়ে বাইর হইছি। লগে কিছু নিতে পারি নাই। ভোলায় নদীতে ঘর ভাঙার পর এইখানে আইছি। এইটাও পুইড়া গেছে।’
৫০ হাজার টাকা খরচ করে দুটি ঘর তুলেছিলেন মিজান, দুটি ঘরই পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। ভাড়া দিয়ে ঘর তৈরির টাকা আগেই তুলতে পেরেছেন তিনি। তবে ভাড়াটিয়াদের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। মিজান বলেন, আমি এমপি সাহেবের অনুমতি নিয়ে দুইটা ঘর তুলে ভাড়া দেই। আমার ঘরসহ ভাড়াটিয়াদের ঘরের জিনিসপত্র পুড়ে গেছে। এরা কীভাবে আবার নতুন করে জিনিসপত্র জোগাড় করবে সেই চিন্তা করছি।
ঘরের জিনিসপত্র লুট ও পুড়ে নষ্ট হওয়ার কথা জানিয়া সালমা আক্তার বলেন, ‘আমি ডিওএইচএসে কাজ করি। আগুন লাগার খবর শুইনা দৌড়ায়া আসছি। কিছু রাখতে পারি নাই। বের হওয়ার সময় ১৩ হাজার টাকা নিয়া বের হইছিলাম। ওইটাও হারায়া গেছে দৌড়ঝাঁপে।’
বস্তির বাসিন্দারা জানান, অগ্নিকাণ্ডের পরের দিন (মঙ্গলবার) ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে শুকনো খাবার ও কম্বল দেওয়া হয়।
বস্তিতে আগুন লাগার কোনও কারণ এখন পর্যন্ত বের করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। তবে ধারণা করা হচ্ছে, শর্টসার্কিট বা ছোট কোনও আগুনের উৎস থেকে এই ঘটনা ঘটে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রায় দুই ঘণ্টার প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। বস্তির এই অংশের অধিকাংশ বাড়ি পুড়ে পানিতে মিশে গেছে। কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা এখনও নির্ণয় করা হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের কারণ তদন্ত শেষে বলা যাবে।
আরও পড়ুন-
‘চোরাই লাইনের’ কথা ডেসকোকে আগেই জানিয়েছিলেন স্থানীয়রা
চার মৃত্যুর জন্য দায়ী বিদ্যুতের ‘চোরাই লাইন’, ১০ লাখে দফারফার প্রস্তাব!









