ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। বুধবার (৯ অক্টোবর) সকাল ৯টা ১০ মিনিটে বেলগাছের নিচে ঘট স্থাপন করে ষোড়শ উপাচারে ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভে ষষ্ঠী পূজা শুরু হয়। দেশ ও সারা বিশ্বে অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে শুভ শক্তি ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুর্গার চরণে গন্ধ, পুষ্প, অর্ঘ্য ও বাদ্য দিয়ে প্রার্থনা করা হয় এ সময়। দেবীর পূজায় আজ সকাল থেকে চন্ডিপাঠে মুখরিত রয়েছে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির।
দেবী আসার ঘণ্টা বেজে যায় মহালয়ার দিন থেকেই। সনাতন ধর্মমতে, যা কিছু দুঃখ-কষ্টের বিষয়, যেমন-বাধাবিঘ্ন, ভয়, দুঃখ-শোক, জ্বালা-যন্ত্রণা এসব থেকে ভক্তকে রক্ষা করেন দেবী দুর্গা। শাস্ত্রকাররা দুর্গা নামের অর্থ করেছেন– দুঃখের দ্বারা যাকে লাভ করা যায়, তিনিই দুর্গা। দেবী দুঃখ দিয়ে মানুষের সহ্য ক্ষমতা পরীক্ষা করেন। তখন মানুষ অস্থির না হয়ে তাকে ডাকলেই তিনি তার কষ্ট দূর করেন। এ বছর ভক্তদের কষ্ট দূর করতে দেবী দুর্গা এসেছেন দোলায় চেপে, আর দশমীর দিন বিদায় নেবেন ঘটকে (ঘোড়ায়) চড়ে।
হিন্দু পুরাণ মতে, দুর্গাপূজার সঠিক সময় বসন্তকাল; কিন্তু বিপাকে পড়ে রামচন্দ্র, রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি সে পর্যন্ত অপেক্ষা না করে শরতেই দেবীকে অসময়ে জাগিয়ে পূজা করেন। সেই থেকে অকালবোধন হওয়া সত্ত্বেও শরৎকালেই দুর্গাপূজার প্রচলন হয়ে যায়। মঙ্গলবার (৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বোধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ উদযাপিত হচ্ছে ষষ্ঠী।
বোধন মানে জাগ্রত করা বা জাগানো। বোধন হয় বেল গাছের তলায়। দেবতারাও বেল গাছের তলায় বোধন করেছিলেন, এ গাছের অন্য নাম শ্রীবৃক্ষ। শ্রী অর্থ সম্পদ বা সৌন্দর্য। তাই পুরোহিতরা সম্পদ বা সৌন্দর্য বা সংসারের উন্নতির জন্য, জ্ঞান-ভক্তি লাভের জন্য বেল গাছের মূলে দুর্গাপূজার বোধন করেন। বোধনে ঘট স্থাপন করা হয়। ঘট হলো হৃদয়ের প্রতীক। ঘটের জলে যেমন প্রতিবিম্ব পড়ে, সে রকম ভক্তের হৃদয়েও মায়ের ভাব বা স্বরূপের ধারণা হয়। সেই ধারণা অনুযায়ী প্রতিমা তৈরি হয়।
ষষ্ঠী পূজার আনুষ্ঠানিকতা প্রসঙ্গে রমনা কালীমন্দিরের প্রধান পুরোহিত হরি চাঁদ চক্রবর্তী জানান, ষষ্ঠী পূজায় বিল্ব বৃক্ষের (বেলগাছ) নিচে মাকে ষষ্ঠাধী কল্পারম্ভ, ষষ্ঠীবিহিত পূজা করা হয়। এর মাধ্যমে মন্দিরের আঙ্গিনায় স্থাপন করা হয় মাকে। পরদিন বিল্ব বৃক্ষের নিচে মাকে স্নান করে মন্দিরে স্থাপন করা হবে।
ষষ্ঠী পূজা সম্পন্নের মাধ্যমে দুর্গাপূজা শুরু হয় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘মায়ের কাছে আমাদের প্রার্থনা, মা তুমি বিশ্বের সব জীবকে শান্তি দাও। সবাইকে তুমি ভালো রাখো, সুস্থ রাখো।’
ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রধান পুরোহিত রঞ্জিত চক্রবর্তী বলেন, ‘বিল্ববৃক্ষ মহাদেবের ভীষণ প্রিয়, পদ্মযোনি ব্রহ্মাও বিল্ববৃক্ষে দেবীকে প্রথম দর্শন করেন। তাই দেবীকে বিল্ববৃক্ষতলেই আবাহন করা হয়। বিল্ববৃক্ষতলে দেবী আবাহনের মধ্যে সংকল্প করেন ভক্তরা, দশমী পর্যন্ত যথাবিধ উপায়ে মায়ের পূজা করবো।’
বোধনের পর খুলে দেওয়া হয় মণ্ডপ। এর মাধ্যমে দেবী জেগে উঠেন আর তাতে দর্শন করা যায় দেবীর। শাস্ত্রমতে মহাসপ্তমীতে ষোড়শ উপাচারে (ষোল উপাদানে) দেবীর পূজা হবে। সকালে ত্রিনয়নী দেবী দুর্গার চক্ষুদান করা হবে। একইসঙ্গে দেবীকে আসন, বস্ত্র, নৈবেদ্য, স্নানীয়, পুষ্পমাল্য, চন্দন, ধূপ ও দীপ দিয়ে পূজা করবেন ভক্তরা। এ সময় পূজারীরা মায়ের সামনে বসে তার মুখ দর্শন করবেন।
মহালয়াতেই দেবী আগমনের ঘণ্টা বাজে আর বিজয়া দশমী দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর দিন। এই দিনটি শেষ হয় মহা-আরতির মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার সব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এছাড়া আগামী ১০ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১১ অক্টোবর মহাঅষ্টমী, ১২ অক্টোবর মহানবমী। তবে পঞ্জিকা মতে, ১২ অক্টোবর মহানবমী পূজার পরই দশমী বিহিত পূজা অনুষ্ঠিত হবে। ১৩ অক্টোবর বিজয়া দশমী উদযাপন করা হবে। সেদিন বিকালে বিজয়ার শোভাযাত্রা বের হবে।









